(প্রিয়.কম) মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানের প্রেক্ষিতে প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা ইতোমধ্যে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। তারা মুখোমুখি হচ্ছেন অবর্ণনীয় সব অভিজ্ঞতার। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে পৌঁছালেও শরণার্থী ক্যাম্পে কাটাতে হচ্ছে মানবেতর জীবন। যেখানে জীবনের কোনো গন্তব্য নেই। এরপরও পালিয়ে আসছেন রোহিঙ্গারা বাঁচার আশায়। তেমনি একজন নাছিমা খাতুন (৬০)। তিনি গত সপ্তাহে পালিয়ে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। পালিয়ে আসার কারণ, পরিস্থিতি এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেছেন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা সঙ্গে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অবর্ণনীয় অত্যাচারের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে গিয়ে নাছিমা খাতুন বলেন, ‘আমার নাম নাছিমা খাতুন এবং আমার বয়স ৬০ বছর। আমরা খুব শান্তিতে জীবনযাপন করছিলাম সংকটের উদ্ভব হওয়ার আগেও। আমার স্বামী ছিলেন জেলে। আমাদের তিনটি কন্যা রয়েছে। আমাদের জীবনের সবকিছু ভালোভাবেই চলছিল। যদিও আমরা মাঝেমধ্যে কিছুটা সেনাবাহিনীর অত্যাচারের সম্মুখীন হতাম, কিন্তু তা সত্বেও কখনও খাদ্য ও আশ্রয়ের সমস্যায় পড়তাম না।’

২৪ আগস্ট রাতে রাখাইন রাজ্যে একযোগে প্রায় ৩০টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনাচৌকিতে হামলা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ‘জাতিগত নির্মূল’ অভিযান শুরু করে দেশটির নিরাপত্তাবাহিনী। এ প্রসঙ্গে নাছিমা খাতুন বলেন, ‘যখন সেনাবাহিনীর লোকজন আমাদের গ্রামে গুলি করা শুরু করলো, আমরা লক্ষ্যহীনভাবে ছুটতে শুরু করলাম। জঙ্গলের মধ্যে লুকানো অবস্থায় একজনের কাছে শুনতে পেলাম আমার স্বামী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তখন আমি অত্যন্ত অসহায় এবং ভয় অনুভব করছিলাম।’ 

স্বামী হরানোর পর পালিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিতে আর দেরি হয়নি নাছিমার। তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীর লোকজন পুরো গ্রাম দখলে নিয়ে নিলে আমি আর স্বামীর মরদেহ ফিরিয়ে আনতে পারিনি। আমাদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশের দিকে পালিয়ে আসতে হয়েছিল।’

পালিয়ে আসার সময় বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার সম্মুখিন হয়েছেন তারা। এ সম্পর্কে নাছিমা বলেন, ‘আমি পালিয়ে এসেছি আমার কন্যাদের ও গ্রামের কিছু প্রতিবেশীদের সঙ্গে। আমরা আমাদের সঙ্গে খাবার বা পানীয় কিছুই আনতে পারিনি। পথে আমরা যা পেয়েছি, তাই খেয়েছি। একদিন, আমরা একটি পরিত্যক্ত দোকানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। সেখান থেকে বেশ কিছু খাবার আমরা চুরি করি। দীর্ঘ ১০ দিনের ভ্রমণের এগুলোই ছিল একমাত্র খাবার। আমরা খুবই ক্ষুধার্ত ছিলাম।’ 

দেশ ছাড়ার বেদনা নাছিমাকে গ্রাস করেছে ঠিকই কিন্তু প্রাণ বাঁচানোর তাগিদেই বাংলাদেশে পাড়ি দিয়েছেন তিনি এবং তার প্রতিবেশীরা। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি পুরো পথ জুড়েই কেঁদেছি আর কেঁদেছি। আমার অবস্থা দেখে প্রতিবেশীরা করুণাবশত বাংলাদেশে পার হওয়ার সময় বোট (ইঞ্জিন চালিত নৌকা) ভাড়া পরিশোধ করে। আমি ভেঙে পড়েছিলাম যে, আমাকে মিয়ানমার ছাড়তে হচ্ছে। আমি আমার স্বামীকে হারিয়েছি, আমার ঘর, জমি এবং যা ছিল সবই হারিয়েছি।’

শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় পেয়েছেন তিনি। কিন্তু এটা কখনো ভবিষ্যৎ মনে হয় না নাছিমা খাতুনের কাছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে কোনোমতে আশ্রয়ের হয়েছে শরণার্থী ক্যাম্পে। স্থানীয় বাংলাদেশিরা আমাদেরকে খাবার দিয়ে সাহায্য করছেন। কিন্তু এখানে অর্থ রোজগার করার মতো কোনো সুযোগ আমার নেই। এখানে আমাদের জন্য কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। যদি আমাদের হাতে কোনো অর্থ না থাকে তবে আমাদের ভবিষ্যৎ বলতে কি আদৌ কিছু থাকবে।’

নাছিমার শরণার্থী শিবিরে থাকার কোনো ইচ্ছে নেই। এমনকি অন্যান্যদের নেই বললেই চলে। দেশে ফিরে যেতে চাইলে যে তা খুব সহজ হবে না, এ কথা তিনি জানেন। বাস্তবতার প্রেক্ষিত বিবেচনায় এনে নাছিমা বলেন, ‘এখানে অবস্থান করা প্রত্যেকেই মিয়ানমার ফিরে যেতে চায়। কিন্তু এটা যে কখনো সম্ভব হবে, তা আমি মনে করি না। সেটা (মিয়ানমার) কখনও আমাদের জন্য পুনরায় নিরাপদ স্থান হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমরা যদি সেখানে ফিরে যাই, তবে হয় অত্যাচারের শিকার হব, নয়তো খুন হয়ে যাব। আমি বিশ্বাস করি বিশ্ব আমাদের এ পরিস্থিতি দেখছে। আমাদের দুঃখের এবং মৃত্যুর গল্পগুলোও কারও কাছে আর অজানা নয়।’ 

সূত্র: আল জাজিরা

প্রিয় সংবাদ/শান্ত