(প্রিয়.কম) মিয়ানমারে কর্মরত দুই রয়টার্স সাংবাদিকের খোঁজ মিলেছে। মঙ্গলবার রাতে পুলিশের আট ব্যাটালিয়নের আমন্ত্রণে নৈশভোজে অংশ নিতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন তারা।

বুধবার রাতে বুধবার দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয় ও অং সান সু চির মুখপাত্র দুই সাংবাদিক ওয়া লন ও কিঁয় সোয়েকে আটকের খবর নিশ্চিত করেন। এই ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর আগে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দুই সাংবাদিককে আটক করে কারাদণ্ড দিয়েছিলো মিয়ানমার।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ওই দুই সাংবাদিক রাখাইনের রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের নিয়ে বিরুদ্ধে সিনাবাহিনীর অভিযানের তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। গত ২৫ আগস্ট এই অভিযান শুরুর পর সাড়ে ছয় লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রতিবেশি বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।

রযটার্স জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে তাদের গাড়িচালক মাঁয়োথান্ট তুন দুই সাংবাদিককে নিয়ে পুলিশের আট ব্যাটালিয়নের কম্পাউন্ডে নামিয়ে দেন। দুই পুলিশ কর্মকর্তা তাদের সঙ্গে নিয়ে কাছাকাছি একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেতে যান। ওই রাতে ওই সাংবাদিকরা আর গাড়িতে ফেরেননি। সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল নাা তাদের।

বুধবার দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পাতায় এক বিবৃতিতে হাতকড়া পরা দুই সাংবাদিকের ছবি দিয়ে জানানো হয়, তাদের ছাড়াও ওই দুই পুলিশ সদস্যকে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আইন ভঙ্গের অভিযোগে আটক করা হয়েছে। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন যুগে ১৯২৩ সালে তৈরি এই আইনে দোষী সাব্যস্ত হলে ১৪ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে তাদের।

বিবৃতিতে বলা হয়, বিদেশি মিডয়াকে সরবরাহের জন্য অবৈধভাবে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন তারা। তাদের ইয়াঙ্গুনের সীমান্ত এলাকার একটি স্টেশনে রাখা হয়েছে।

রয়টার্স প্রেসিডেন্ট ও এডিটর ই্ন চীফ স্টিফেন জে. এডলার বলেন, ‘রয়াটার্সের সাংবাদিক ওয়া লন ও কিঁয় সোয়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুর আন্তর্জাতিক গুরুত্ব তুলে ধরছিলেন। আর আজ আমরা জানতে পারলাম, কাজের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণেই তাদের আটক করা হয়েছে। আমরা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর এই নগ্ন আক্রমণে ক্ষুব্ধ। কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানাবো তাড়াতাড়ি তাদের ছেড়ে দেন।’

অং সান সু চির মুখপাত্র জাও তায় বলেন, ‘শুধু আপনার রিপোর্টার নয়, আমাদের দুই পুলিশ সদস্যও এই মামলায় জড়িত।’

ওয়াশিংটনের স্টেট ডিপার্টমেন্টও বিষয়টি কঠোর নজরদারিতে রেখেছে। মুখপাত্র হেথার নাওয়ার্ট বলেন, মিয়ানমারে মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্কট মার্শাল বুধবার দুই সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। মনে হচ্ছে এবিষয়ে তারা একেবারে অসচেতন ছিলেন।

হেথার নাওয়ার্ট বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের নিরাপত্তাও সুরক্ষার বিষয়ে যত্নবান। আর তারা শুধুমাত্র তাদের কাজ করছিলেন। একারণে আমরা বিষয়টিতে মনোযোগ রেখেছি।’ 

মিয়ানমারের মার্কিন দূতাবাসের অফিসিয়াল ফেসবুক পাতায়ও এ বিষয়ে এক বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘আমরা রয়টার্সের দুই সাংবাদিকে আটকের বিষয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। পুলিশ কর্মকর্তরাই ইয়াঙ্গুনে তাদের রাতের খাবারের দাওয়াত দিয়েছিলেন।’ 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিশন থেকেও উদ্বেগের স্বর তোলা হয়েছে। বলা হয়েছে, ইইউ প্রতিনিধিরা এই ঘটনা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে আহবান জানাবো তারা যেন এই সাংবাদিকদের অধিকারের পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়। যেকোন গণতন্ত্রেরই পূর্বশর্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা।

নিউইয়র্কভিত্তিক কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টও ওই সাংবাদিকদের দ্রুত মুক্তির দাবি করেছে।

চার শব্দের মেসেজ

ওয়া লন ২০১৬ সালের জুনে রয়টার্সে যোগ দেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খবর সরবরাহ করেছেন।

সেনাবাহিনীর ভূমি দখল আর জানুয়ারিতে ক্ষমতাসীন দলের আইনজীবী কো নি হত্যার বিষয়েও রিপোর্ট লিখেছেন তিনি। চলতি বছরে তিনি যৌথভাবে মর্যাদাপূর্ণ এশিয়ার প্রকাশক সোসাইটি থেকে পুরস্কার লাভ করেছেন। রোহিঙ্গা ইস্যু কাভার করায় এই সম্মান পান তিনি।

এর আগে তিনি মিয়ানমার টাইমসের হয়ে দেশটির ঐতিহাসিক ২০১৫ সালের গণতান্ত্রিক নির্বাচন কাভার করেন। তার আগে কাজ করে আসা সাপ্তাহিক পিউপিল এজ পত্রিকায় ওয়া লনের সম্পাদক ছিলেন মিয়ানমারের বর্তমান তথ্যমন্ত্রী পে মিন্ট।

কিঁয় সোয়ে ও রাখাইনের রাজধানী সিত্তির বৌদ্ধ ধর্মালম্বী নাগরিক। তিনি এ বছরের সেপ্টেম্বরে রয়টার্সে যোগ দেন। তিনি গত ২৫ আগস্ট শুরু হওয়া সেনা অভিযানের প্রভাব নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতেন। 

রয়টার্সে যোগ দেওয়ার আগে রাখাইন ইস্যুতে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত স্থানীয় পত্রিকা রুট ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির হয়ে কাজ করতেন তিনি।

‘আমি গ্রেফতার হয়েছি’- আই হ্যাভ বিন অ্যারেস্টেড চার শব্দের এই এসএমএসটি ওয়া লন মিয়ানমারে তার ব্যুরো প্রধান এন্টোনি স্লোদকোভস্কিকে মঙ্গলবার রাতে পাঠান। এরপরই বন্ধ হয়ে যায় তার ফোন।

২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পর রয়টার্সের সহকর্মীরা ইয়াঙ্গুনে তাদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করেন। তিন পুলিশ স্টেশন ঘুরে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে দুই সাংবাদিকে সঙ্গে কী ঘটেছে তা জানার চেষ্টা করেন। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

এর আগে গত ২৯ অক্টোবর মিয়ানমারের পার্লামেন্ট ভবনের ওপর ড্রোন উড়িয়ে ছবি তোলায় আটক করা হয় তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম টিআরটির  দুই সাংবাদিকসহ চারজনকে। আটক দুই বিদেশি নাগরিক ছিলেন সিঙ্গাপুরের নাগরিক ল হোন মেং ও মালয়েশীয় নাগরিক মোক চোয়। দশ দিনের পুলিশি হেফাজতের পর ১০ নভেম্বর তাদের আদালতে তোলা হলে তাদের দুই মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।