রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে জাতিসংঘের বিশেষ দূত

(প্রিয়.কম) মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাদের গণহত্যা-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগসহ অমানবিক নির্যাতন থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি দেখতে সফরের দ্বিতীয় দিনে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থার বিশেষ দূত ইয়াং হি লি।

২১ জানুয়ারি রোববার সকাল ১০টার দিকে তিনি উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছেন বলে জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব শোয়েব আব্দুল্লাহ।

তিনি বলেন, সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ইয়াং হি লি বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিভিন্ন ব্লক পরিদর্শন এবং তাদের কাছ থেকে নানা তথ্য সংগ্রহ করেন। সেসময় তিনি আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম ) ও জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরসহ বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমও পরিদর্শন করেন। পরে তিনি কুতুপালং ক্যাম্প পরিদর্শনে  যান।

শোয়েব আব্দুল্লাহ বলেন, ‘পরিদর্শনকালে ইয়াং হি লি সেখানে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়েও কথা বলেন। রোহিঙ্গারা তার কাছে মিয়ানমারে সংঘটিত নির্যাতন-নিপীড়নের বর্ণনা তুলে ধরেন।’

সেসময় তার সঙ্গে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও ইউএনএইচসিআরসহ ক্যাম্পে নিয়োজিত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

শত কিলোমিটার দুর্গম পথ পেড়িয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে রোহিঙ্গারা। ছবি: ফোকাস বাংলা

শত কিলোমিটার দুর্গম পথ পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে রোহিঙ্গারা। ছবি: ফোকাস বাংলা

এর আগে শনিবার ইয়াং হি লি টেকনাফের নয়াপাড়া, দমদমিয়া ও রইক্ষ্যং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। সেসময় তিনি টেকনাফ ন্যাচার পার্কের অভ্যর্থনা কেন্দ্রে ১০ জন রোহিঙ্গার (১০ জন পুরুষ ও ১০ জন নারী) সঙ্গে কথা বলেন।

এর আগে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থার বিশেষ দূত ইয়াং হি লি গত ১৭ জানুয়ারি বুধবার রাতে ঢাকায় পৌঁছান এবং শুক্রবার দুপুরে তিনি কক্সবাজার আসেন। চলতি মাসে তার মিয়ানমার সফরের কথা থাকলেও সেদেশের নিষেধাজ্ঞার কারণে তিনি মিয়ানমারের পরিবর্তে বাংলাদেশে সফরে আসেন। এবার সাত দিনের সফরের ৫ দিন বাংলাদেশে অবস্থান করবেন এবং ২৪ জানুয়ারি বুধবার বাংলাদেশ ত্যাগ করে থাইল্যান্ড সফরে যাবেন। 

 গেল বছরের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন অভিযান শুরু হওয়ার পর প্রাণ বাঁচাতে প্রায় ছয় লাখ ৭২ হাজার মানুষ পালিয়ে এসে বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার টেকনাফ ও উখিয়ার শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে; যাদের ৯০ শতাংশই নারী-শিশু ও বৃদ্ধ।

ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, শরণার্থী শিবিরে বর্তমানে ৪ লাখ ৫০ রোহিঙ্গা শিশু রয়েছে; যার মধ্যে ২ লাখ ৭০ হাজারই নতুন। এ সব শিশুর মধ্যে আবার অভিভাবকহীন ৩৬ হাজার ৩৭৩ শিশুও রয়েছে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে অন্তত ৫০ হাজার অন্তঃসত্ত্বা নারী রয়েছেন। পালিয়ে আসা শিশু শরণার্থীদের বাইরেও প্রতিদিন যোগ হচ্ছে প্রায় ১০০ নবজাতক। 

নদীপথ পেরিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ। ছবি: ফোকাস বাংলা

নদীপথ পেরিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ। ছবি: ফোকাস বাংলা

বর্বর ওই অভিযানে দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নির্বিচার গণহত্যা-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, রাখাইনে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ চালানো হয়েছে এবং এটি মানবতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অপরাধ

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা জেইদ আল রাদ আল হুসেইন বলেছেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হয়তো গণহত্যার মতো অপরাধ সংঘটিত করেছে। এর আগে তিনি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চালানো সহিংসতাকে ‘জাতিগত নির্মূল’ অভিযানের জ্বলন্ত উদাহারণ (টেক্সটবুক এক্সাম্পল অব এথনিক ক্লিনজিং) বলে বর্ণনা করেছিলেন।

প্যারিসভিত্তিক মানবিক সাহায্য সংস্থা মেডিসিনস স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) জানায়, আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইনে সহিসংতা ছড়িয়ে পড়ার এক মাসেই হত্যার শিকার হয়েছিলেন কমপক্ষে ৬ হাজার ৭০০ রোহিঙ্গা নাগরিক

বার্তা সংস্থা এপি জানায়,  মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সংঘবদ্ধ ও পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণকরেছে। এদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশের বয়স ১৮-এর নিচে। সবচেয়ে ছোটজনের বয়স ছিল নয় বছর।

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ স্যাটেলাইটে তোলা ছবি বিশ্লেষণের পর জানায়, ২৫ অগাস্ট সেনা অভিযান শুরু হওয়ার পর রাখাইনে মোট ৩৫৪টি গ্রাম আংশিক বা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে

প্রিয় সংবাদ/শান্ত