রোহিঙ্গাদের সঙ্গে অমানবিক জাতিগত বৈষম্য করেছে মিয়ানমার: অ্যামনেস্টি

(প্রিয়.কম) রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার সরকারের চালানো বৈষম্য ও নিপীড়নকে ‘অমানবিক জাতিগত বৈষম্য’ বলে অভিহিত করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। ২১ নভেম্বর মঙ্গলবার সংগঠনটির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়। 

সংগঠনটির সিনিয়র ডিরেক্টর ফর রিচার্স আনা নেইসতাত বলেছেন, ‘অমানবিক জাতিগত বৈষম্যের মাধ্যম মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও পুরুষদের বিচ্ছিন্নকরণ ও ভয়প্রদর্শন করছে।’

দুই বছর ধরে অনুসন্ধান চালানোর ভিত্তিতে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে সংগঠনটি বলছে, ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাখাইনের রোহিঙ্গাদের ফাঁদে ফেলা হয়েছে। বৈষম্যকে করা হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক।’

গত ২৫ আগস্ট ওই রাজ্যে সেনা অভিযান শুরুর পর এখন পর্যন্ত ছয় লাখ ২১ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। আর এই ভয়াবহ অভিযানের জন্য যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীই দায়ী, তা উঠে এসেছে পালিয়ে আসা প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য ও স্যাটেলাইট চিত্রে। স্যাটেলাইটে ধারণকৃত ছবিতে দেখা গেছে, কয়েকশত গ্রামের চিহ্ন পর্যন্ত মুছে ফেলা হয়েছে। জাতিসংঘ এই অভিযানকে ‘জাতিগত নিধন’ বলে মন্তব্য করেছে।

অ্যামনেস্টি এই সংকটের গোড়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখতে পায়, ২০১২ সাল থেকেই পদ্ধতিগতভাবে এই বিচ্ছিন্নকরণ চলছে। ওই সময় স্থানীয় বৌদ্ধ ও মুসলমানদের মধ্যে রাখাইনের কয়েকটি এলাকায় রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হয়। রাখাইন ছাড়াও পুরো দেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যাগুরু।

নিসতাত বলেন, রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিদিনই ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। আর তাদের ওপর চালানো নিপীড়ন কেবল মনোযোগ কেড়েছে সম্প্রতি।

অ্যামনেস্টি বলছে, এখনও বেশ কিছু রোহিঙ্গা রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় রয়ে গেছে। তাদের সংখ্যা প্রায় দশ লাখ। আর তারা রাজ্যের রাজধানী সিত্তির আশেপাশের বিভিন্ন ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

রোহিঙ্গাদের বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী বলে বিবেচনা করা হয়।

প্রসঙ্গত, গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিধন অভিযান শুরুর পর প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশেপালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৬ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসার এ ধারা অব্যাহত থাকলে শরণার্থীর সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।

এ নিয়ে বেশ কিছু এরিয়াল ফুটেজ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। সেখানে দেখা গেছে, উখিয়ার পালংখালির কাছে নাফ নদী পার হয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় জাতিসংঘ বলছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে জাতিগত নিধনে নেমেছে। 

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া এসব রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৯০ ভাগই হলো নারী, শিশু ও বৃদ্ধ।

জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মতে, পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে শিশু রয়েছে শতকরা ৬০ ভাগ। এর মধ্যে ১১শ’র বেশি রোহিঙ্গা শিশু পরিবার ছাড়া অচেনাদের সঙ্গে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। আর এসব শিশুর চোখের সামনেই তাদের বাবা-মাকে গুলি ও জবাই করে হত্যা, মা-বোনদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ঘর-বাড়িতে আগুন দেওয়াসহ ইতিহাসের নৃশংসতম ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে মিয়ানমারের সেনারা।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের দেওয়া সর্বশেষ প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের স্পষ্ট প্রমাণ হাজির করেছে।

সংস্থাটি বলছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দী, স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি-ভিডিও এবং সব ধরনের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ উপসংহারে উপনীত হওয়া যায় যে, ‘রাখাইনে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ চালানো হয়েছে এবং এটি মানবতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অপরাধ।’

এদিকে অভিযানের নামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী খুন, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, কুপিয়ে হত্যাসহ বর্বরতার চূড়ান্ত সীমাও অতিক্রম করেছে বলে অভিযোগ করেছে নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংস্থাটি বলেছে, ইতোমধ্যে প্রায় ২৮৮টি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

সংস্থাটি আরও জানায়, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে।

প্রিয় সংবাদ/শান্ত