‘দুই মাসের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু’

(প্রিয়.কম) আগামী দুই মাসের মধ্যে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।

২৩ নভেম্বর বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের রাজধানী নেইপিদোয় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা চুক্তি সই হয়। চুক্তি সইয়ের পর পরাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্য জানিয়েছেন।

স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি’র বৈঠক শুরু হয়। প্রায় ৪৫ মিনিট তারা বৈঠকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকের পর সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়।

‘রাখাইন রাজ্যের বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রত্যাবাসন’ শীর্ষক এই সমঝোতা চুক্তিতে মাহমুদ আলী ও মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কার্যালয়ের মন্ত্রী কিয়াউ ভিন্ট সোয়ে স্বাক্ষর করেছেন।

গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিধন অভিযান শুরুর পর প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৬ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসার এ ধারা অব্যাহত থাকলে শরণার্থীর সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।

তাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে সমঝোতা চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলোচনা শেষে জানিয়েছিলেন, সমঝোতা চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের বোঝা এবং শিগগিরই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে হবে।

এর আগে মঙ্গলবার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরাতে বাংলাদেশের সঙ্গে চলমান আলোচনায় চলতি সপ্তাহেই ‘নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন’ শীর্ষক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের আশা প্রকাশ করেন অং সানি সু চি। ওই সময় তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের ফেরাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে বুধবার এবং বৃহস্পতিবারও আলোচনা চলবে। ফিরতে চাওয়া রোহিঙ্গাদের আবেদন প্রক্রিয়া ঠিক করতে দুই দেশের কর্মকর্তারা গত মাস থেকেই আলোচনা চালাচ্ছেন।

এদিন এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার সরকারের চালানো বৈষম্য ও নিপীড়নকে ‘অমানবিক জাতিগত বৈষম্য’ বলে অভিহিত করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। 

আগস্টের পর নির্যাতনের শিকার হয়ে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বেশ কিছু এরিয়াল ফুটেজ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। সেখানে দেখা গেছে, উখিয়ার পালংখালির কাছে নাফ নদী পার হয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় জাতিসংঘ বলছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে জাতিগত নিধনে নেমেছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া এসব রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৯০ ভাগই হলো নারী, শিশু ও বৃদ্ধ।

জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মতে, পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে শিশু রয়েছে শতকরা ৬০ ভাগ। এর মধ্যে ১১শ’র বেশি রোহিঙ্গা শিশু পরিবার ছাড়া অচেনাদের সঙ্গে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। আর এসব শিশুর চোখের সামনেই তাদের বাবা-মাকে গুলি ও জবাই করে হত্যা, মা-বোনদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ঘর-বাড়িতে আগুন দেওয়াসহ ইতিহাসের নৃশংসতম ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে মিয়ানমারের সেনারা।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের দেওয়া সর্বশেষ প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের স্পষ্ট প্রমাণ হাজির করেছে।

সংস্থাটি বলছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দী, স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি-ভিডিও এবং সব ধরনের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ উপসংহারে উপনীত হওয়া যায় যে, ‘রাখাইনে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ চালানো হয়েছে এবং এটি মানবতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অপরাধ।’

এদিকে অভিযানের নামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী খুন, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, কুপিয়ে হত্যাসহ বর্বরতার চূড়ান্ত সীমাও অতিক্রম করেছে বলে অভিযোগ করেছে নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংস্থাটি বলেছে, ইতোমধ্যে প্রায় ২৮৮টি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

সংস্থাটি আরও জানায়, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে।

মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ওই এলাকায় জাতিগত নিধনের জন্য দেশটির সেনাবাহিনীকে অভিযুক্ত করেছে। সারাবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের কথা বরাবর অস্বীকার করে আসছিল মিয়ানমার। আর সেনাবাহিনীর নিধনযজ্ঞের বিষয়ে চুপ থাকায় বিশ্বব্যাপী সমালোচিত হচ্ছেন সু চি। অভিযোগ উঠেছে সেনা কর্মকর্তাদের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।

জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা ও দেশের প্রতিবাদের মুখে মিয়ানমার মুখ খুলতে বাধ্য হয়। তারই ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু হয়।

প্রিয় সংবাদ/রিমন