‘সুচির অনুমতি নিয়েই রোহিঙ্গা নির্যাতন করা হয়েছে’

(প্রিয়.কম) মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচির অনুমতিতেই সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার জেইদ আল রাদ আল হুসেইন। এ ঘটনায় মিয়ানমারের নেতাদের একসময় আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। 

সংবাদমাধ্যম বিবিসি-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে জেইদ আল রাদ আল হুসেইন বলেন, ‘অভিযানের ভয়াবহতা আর বিস্তৃতিতে এটা স্পষ্ট যে এত বড় অভিযান চালানো হয়েছে, যা অবশ্যই দেশটির উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই হয়েছে।’

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘বর্বর এ অভিযানের দায়ে মিয়ানমারের নেতাদের একসময়ে গণহত্যার অভিযোগের মুখোমুখি হতে হবে।’ যদিও রাখাইনে গণহত্যা বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেননি দেশটির রাষ্ট্রীয় উপদেষ্ট সুচি। 

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তার এ মন্তব্যের পরিপেক্ষিতে বিবিসির সংবাদদাতা জাস্টিন রোল্যাট বলেন, ‘গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারের নেতাদের ভবিষ্যতে বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, এই বক্তব্যকে হেলাফেলা করার সুযোগ নেই।’ 

জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রধান জেইদ আল রাদ আল হুসেইন। ছবি: সংগৃহীত

জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রধান জেইদ আল রাদ আল হুসেইন। ছবি: সংগৃহীত

এর আগে গত ৫ ডিসেম্বর জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের এক জরুরি অধিবেশনের ভাষণে জেইদ আল রাদ আল হুসেইন বলেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হয়ত গণহত্যার মতো অপরাধ সংঘটিত করেছে। তা ছাড়া তিনিই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চালানো সহিংসতাকে ‘জাতিগত নির্মূল’ অভিযানের জ্বলন্ত উদাহারণ (টেক্সটবুক এক্সাম্পল অব এথনিক ক্লিনজিং) বলে বর্ণনা করেছিলেন। 

কিন্তু জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনারের এই বক্তব্যের পর মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচির বিরুদ্ধে বিচারের জন্য কী অভিযোগ আনা যেতে পারে? এ প্রশ্নের জবাবে জাস্টিন রোল্যাট বলেন, মিয়ানমারে সত্যিই গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে কিনা, তা প্রমাণের দায়িত্ব জেইদ আল রাদ আল হুসেইনের নয়। কিন্তু তিনি আন্তর্জাতিক একটি তদন্ত চাইতে পারেন।

প্রাণ বাঁচাতে হাজার মাইল পেরিয়ে আসছে রোহিঙ্গারা। ছবি: ফোকাস বাংলা

প্রাণ বাঁচাতে হাজার মাইল পেরিয়ে আসছে রোহিঙ্গারা। ছবি: ফোকাস বাংলা

সুচি বা মিয়ানমারের নেতাদের বিচাররের বিষয়ে মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার বলেন, সেটা অবশ্যই খুব কঠিন হবে। কারণ কেউ যদি গণহত্যা চালানোর পরিকল্পনা করলে তা কাগজে কলমে প্রমাণ রাখে না। হয়তো এ অভিযানের মৌখিক নির্দেশনার প্রমাণও পাওয়া যাবে না। তবে এতে আমি আশ্চর্য হব না, রাখাইনে প্রকৃতপক্ষে কী হয়েছে, ভবিষ্যতে আদালত যদি তা খতিয়ে দেখার আদেশ দেন।’ 

এদিকে গত ১৭ ডিসেম্বর রোববার যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক প্রতিবেদনে জানায়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পরিচালিত সেনা অভিযানে গত দুই মাস নৃশংস ও নজিরবিহীন সহিংসতা চালানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ সময় নতুন করে আরও ৪০টি গ্রাম ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে গত ২৫ অগাস্ট সেনা অভিযান শুরু হওয়ার পর রাখাইনে মোট ৩৫৪টি গ্রাম আংশিক বা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে

বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ। ছবি: ফোকাস বাংলা

নদীপথ পেরিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ। ছবি: ফোকাস বাংলা

এর মাত্র তিন দিন আগে গত ১৪ ডিসেম্বর প্যারিস ভিত্তিক মানবিক সাহায্য সংস্থা মেডিসিনস স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে পরিচালিত এক জরিপে পর জানায়, মিয়ানমারে ২৫ আগস্ট থেকে ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই মারা গেছেন নয় হাজার রোহিঙ্গা। এদের মধ্যে ‘সবচেয়ে রক্ষণশীল মুল্যায়নে’ও দেখা গেছে ছয় হাজার ৭০০ জন হত্যার শিকার হয়েছে। আর হত্যার শিকার হওয়া এ সব রোহিঙ্গাদের মধ্যে পাঁচ অথবা তারও চেয়ে কম বয়সী অন্তত ৭৩০ জন শিশু রয়েছে। 

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন অভিযান শুরু হওয়ার পর প্রাণ বাঁচাতে প্রায় ছয় লাখ ৫৫ হাজার মানুষ পালিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার টেকনাফ ও উখিয়ায় গড়ে তোলা শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে; যাদের ৯০ শতাংশই নারী-শিশু ও বৃদ্ধ।

ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, রোহিঙ্গা শিবিরে বর্তমানে ৪ লাখ ৫০ শিশু রয়েছে; যার মধ্যে ২ লাখ ৭০ হাজারই নতুন। এসব শিশুর মধ্যে আবার অভিভাবকহীন ৩৬ হাজার ৩৭৩ শিশুও রয়েছে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে অন্তত ৫০ হাজার অন্তঃসত্ত্বা নারী রয়েছেন। পালিয়ে আসা শিশু শরণার্থীদের বাইরেও প্রতিদিন যোগ হচ্ছে প্রায় ১০০ নবজাতক

পালিয়ে আসা সাড়ে ছয় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী শরনার্থী শিবির। ছবি: ফোকাস বাংলা 

পালিয়ে আসা সাড়ে ছয় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী আশ্রয় শিবির। ছবি: ফোকাস বাংলা

বর্বর ওই অভিযানে দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নির্বিচার গণহত্যা-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, রাখাইনে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ চালানো হয়েছে এবং এটি মানবতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অপরাধ

প্রিয় সংবাদ/শান্ত