দলের ৬ষ্ঠ কাউন্সিলে বক্তব্য রাখছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ছবি: সংগৃহীত

অনিশ্চিত বিএনপির ৭ম জাতীয় কাউন্সিল

মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০১৯, ১৬:১১
আপডেট: ১৬ জুলাই ২০১৯, ১৬:১১

(প্রিয়.কম) সবচেয়ে কঠিন প্রতিকূল রাজনৈতিক সময় পার করছে বিএনপি। দীর্ঘ একযুগ ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সব স্তরের নেতাকর্মীদের ঘাড়ে এখন মামলার পাহাড়। দলটির দাবি, ক্ষমতার বাইরে থাকার পাশাপাশি চরমভাবে সংকুচিত তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকার। মিথ্যা ও সাজানো মামলায় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দী, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও অবস্থান করতে হচ্ছে দেশের বাইরে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সঠিক ও কার্যকর সিদ্ধান্তের জন্য হিমশিম খাচ্ছে বিএনপির নেতৃত্ব।

সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে, তারপরও খালেদা জিয়া মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত দলটির ৭ম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে দল পুনগর্ঠনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ফের রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে নামার প্রস্তুতি হিসেবে সাংগঠনিক সফর ও পর্যায়ক্রমে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে সমাবেশ এবং ঢাকায় একটি মহাসমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আসছে ১৮ জুলাই বরিশালে একটি সমাবেশ করতে যাচ্ছে বিএনপি। 

বিএনপি নেতাদের ভাষ্য, খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী রেখে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং পরবর্তীতে নির্বাচনের ফলাফল বর্জন করে সংসদে শপথ নেওয়ার সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি তৃণমূল নেতাকর্মীরা খানিকটা হতাশ। ফলে এই মুহূর্তে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সৃষ্ট হতাশা কাটিয়ে দলের প্রতি আস্থা ফেরানো এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ফের রাজপথে লড়াই সংগ্রামে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেই বিভাগীয় সমাবেশের মধ্যে দিয়ে সাংগঠনিক সফর শুরু করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে আর যাই হোক বিএনপির ৭ম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে না, এটা প্রায় নিশ্চিত। তাকে কারান্তরীণ রেখে কাউন্সিল করার উদ্যোগ হবে দলটির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। পক্ষান্তরে সরকারও ভাববে যে, বিএনপিতে খালেদা জিয়ার প্রয়োজনীয়তা শেষ। তখন খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে তাদের আরও সহজ হয়ে দাঁড়াবে। দলটির একাধিক দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে এমনটাই আলোচনায় উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রিয়.কমকে বলেন, ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। তাই চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারান্তরীণ রেখে দলের পরবর্তী কাউন্সিল হতেও পারে, আবার না-ও হতে পারে। সবকিছুই সার্বিক রাজনৈতিক পরিবেশ পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে এসেছি, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবে না বিএনপি। পরবর্তীতে বলেছি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেব না, একইসঙ্গে বলেছি খালেদা জিয়া মুক্তি না পেলে খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে যাব না। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়ে গেল, খালেদা জিয়াও মুক্তি পেল না। তারপরও আমরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। তাই কখন কি হয় সেটা আগাম বলাটা সমীচীন নয়। তা ছাড়া দলীয় সিদ্ধান্ত সবসময় সবাইকে অবহিত করতে হবে, সেটাও সঠিক নয়।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘টিকে থাকতে গেলে রাজনীতি ছাড়া আর তো কোনো উপায় নেই। একটু সময় লাগবে, এই আর কি!’

বিএনপির কাউন্সিলের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দল গঠনের পর থেকে কখনো সময়মতো কাউন্সিলের আয়োজন করতে পারেনি দলটি। ৭ম কাউন্সিলের নির্ধারিত সময় পার হলেও বিএনপি এখনও তা করতে পারেনি। এমনকি কাউন্সিল করার সম্ভাব্য দিনক্ষণও বলতে পারছেন না দলটির নেতারা। তারা মনে করছেন, দলীয় প্রধান কারাগারে থাকায় সহসাই দলের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলের নির্বাহী কমিটির মেয়াদ তিন বছর। দলটির সর্বশেষ ষষ্ঠ কাউন্সিল হয়েছিল নির্ধারিত সময়ের ছয় বছর পরে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর দলের পুনর্গঠনের বিষয়টি আসার পরে নেতাকর্মীদের আশা ছিল এবার হয়তো নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত কাউন্সিল নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।

দলটির প্রথম কাউন্সিল হয় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বরে। ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী হন প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব। দ্বিতীয় কাউন্সিল হয় চার বছর পর ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সেই কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও মহাসচিব হন যথাক্রমে সাবেক বিচারপতি আবদুস সাত্তার ও ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী। সাত বছর পর ১৯৮৯ সালের মার্চে হয় তৃতীয় কাউন্সিল। ওই কাউন্সিলে খালেদা জিয়া চেয়ারপারসন এবং সালাম তালুকদার মহাসচিব হন। এরপর চার বছর বিরতি দিয়ে ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে চতুর্থ কাউন্সিলে খালেদা জিয়া চেয়ারপারসন এবং আবদুল মান্নান ভূঁইয়া মহাসচিব হন। এরপর ১৬ বছর পর ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর পঞ্চম কাউন্সিলে খালেদা জিয়া চেয়ারপারসন এবং খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মহাসচিব হন। এর ৬ বছর পর ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলটির ষষ্ঠ কাউন্সিলে তৃতীয়বার খালেদা জিয়া চেয়ারপারসন এবং ভারপ্রাপ্ত থেকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিব প্রিয়.কমকে জানান, ঘুরে দাঁড়ানোর কৌশল নির্ধারণ করতে না পারায় সংকটের আবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে বিএনপি। পর পর তিনটি নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর দলটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশ নাজুক অবস্থায় পড়েছে। অথচ এমন অবস্থায়ও করণীয় নির্ধারণ করা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কীভাবে নতুন কর্মকৌশল তৈরি করা হবে তা নিয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। বরং ঐক্যবদ্ধ থাকার বদলে দলটির উপরি কাঠামোতে কিছুটা সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। দল পরিচালনার পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

দুর্নীতি মামলায় সাজা হওয়ায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে আছেন চেয়ারপারসন। তার অনুপস্থিতিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান হাল ধরলেও প্রায় দেড় বছরে দলের রাজনৈতিক অর্জন নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি পুনর্গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের দাবি উঠেছে দলের ভেতর থেকেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও কৌশলগত কারণে, বিশেষ করে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে শিগগির কাউন্সিল করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত একাধিক নেতা।

একাধিক নেতা জানান, দল পরিচালনায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের পরামর্শ নেওয়া হলেও নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বিএনপি চলছিল যৌথ নেতৃত্বে। তারেক রহমানের সঙ্গে পরামর্শ করে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বৈঠক করে সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন। কিন্তু সম্প্রতি কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তারেক রহমানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দলের মধ্যম সারির কিছু নেতার সঙ্গে ইদানীং স্কাইপের মাধ্যমে কথা বলছেন তিনি। ওই সব ঘটনায় বেশির ভাগ সিনিয়র নেতার সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হচ্ছে বলে অনেকে মনে করছেন। পাশাপাশি তারেক রহমান যাদের কাছে টানছেন তারা দলের মধ্যে নিজেদের ক্ষমতাবান ভাবতে শুরু করেছেন। সার্বিকভাবে এতে বিএনপিতে বিভেদ তৈরি হচ্ছে, যা নির্বাচনের আগে ছিল না।

দলের সপ্তম কাউন্সিল প্রসঙ্গে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু প্রিয়.কমকে বলেন, ‘দলের পুনর্গঠন ও চেয়ারপারসনের মুক্তির প্রতি এই মুহূর্তে দলের নজর। দেশনেত্রী কারামুক্ত হলেই সম্ভবত দলীয় কাউন্সিলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।’

প্রিয় সংবাদ/রিমন

আরো পড়ুন