তিনটি রাস্তায় রিকশা চলাচল করতে দেওয়া হবে না, ঘোষণার পর রিকশাচালকরা সড়ক অবরোধ করেন। ছবি: সংগৃহীত

রিকশা আর গরিব বাদ, ঢাকা হোক কোটিপতিদের শহর

কাকন রেজা
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক
প্রকাশিত: ১৫ জুলাই ২০১৯, ১৪:১৯
আপডেট: ১৫ জুলাই ২০১৯, ১৪:১৯

ঢাকার কয়েকটি রাস্তায় রিকশা তুলে দেওয়া হবে। ঘোষণা হয়ে গেছে। এর আগেও রিকশা নিষিদ্ধ হয়েছে বিভিন্ন রাস্তায়। আচ্ছা, যেসব রাস্তায় আগে রিকশা বন্ধ করা হয়েছে, সেসব রাস্তায় যানজট কি কমেছে? দশ মিনিটের রাস্তা কি দশ মিনিটেই যাওয়া যাচ্ছে? যাচ্ছে না। ভালো করে হিসাব করে দেখুন, যোগফল পুরোটাই অশ্বডিম্ব। সুতরাং অহেতুক ইচ্ছা হলো, একটা কিছু করে ফেললাম। ইচ্ছা হলো বলে ফেললাম, রিকশা যারা চালান, তারা গ্রামে গিয়ে ধান কাটুক। মানুষকে সম্মান না করেন, উপহাস করার অধিকার আপনাকে কেউ দেয়নি। ধানের দাম কত খেয়াল আছে? কৃষকদের কাছ থেকে কি ধান কিনছে খাদ্য অধিদফতর? খাদ্যগুদামে কাদের ধান ঢুকছে খোঁজ কি রাখেন ভাইজান? বলে ফেললেন, আর ভাবলেন, জয় করে ফেলেছি। মানুষ কী বলে একটু রাস্তায় নেমে শুনুন। কাজে দেবে। পাশের তোষামোদকারীদের কাছ থেকে কানটা সরান। না হলে, সত্য না শোনার রোগ বাসা বাঁধবে। যা নিজদের জন্যই ক্ষতিকর ভাইজান।

বাইশ পরিবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এত দিনে ঘোষিত লক্ষাধিক হলেও অঘোষিত অন্তত আরো লাখখানেক কোটিপতি বানিয়েছি। এসব কোটিপতিসহ আধা কোটিপতি মিলিয়ে ঢাকা শহরে নব্যধনীদের না হলেও অর্ধকোটি গাড়ি রয়েছে। বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানো, বউদের পার্লার, শালীদের বনমালী খুঁজতেই দিনব্যাপী রাস্তায় জট লাগিয়ে রাখে এসব গাড়ি। সকালে অভিজাত স্কুলগুলোর সামনে বোঝা যায় জট কাকে বলে।

কেনরে ভাই, কথায় কথায় দেশকে সিঙ্গাপুর, কানাডা, লস এঞ্জেলস বানিয়ে ফেলছেন, তো তাদের একটু ফলো করেন না কেন। স্কুল বাস বাধ্যতামূলক করে দিন। একটি স্কুলের সামনে হাজারও গাড়ির যানজট না বাধিয়ে দশ-বিশটা স্কুল বাস দিয়ে দিন না। একটু সাম্যের গান গান। রাজা অধিশ্বর হওয়া বাদ দেন। নিজের বাচ্চাটাকে অন্যদের সাথে মিলেমিশে স্কুলে যেতে দিন। রাস্তার যানজটও কমবে, আপনার বাচ্চার মনের অহংকারও কমবে। অন্তত তারা রিফাত খুনের ফারাজী ব্রাদার হবে না।

গরিব রিকশাওয়ালাদের সাথে রাগ দেখিয়ে লাভ কী! ওদের রুটি-রোজগার নিয়ে কেন তামাশা করা। কদিন আগে দেখলাম আরেক জিনিস। জায়গায় জায়গায় ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা। আরে যে দেশে খেলাপি ঋণের হার দশ বছরে বাইশ হাজার কোটি টাকা থেকে এক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছে। যে দেশে মাথা পিছু ঋণের হার কখনো বলা হয় সতেরো, কখনো চল্লিশ বা কখনো ষাট হাজার, সেই দেশকে যারা ভিক্ষুকমুক্ত করার মশক করেন, তাদের ‘বলিহারি’ বলা ছাড়া আর কি কোনো উপায় আছে! অনেক জেলায় দেখেছি, কয়েকজনকে ধরে দুটো ভ্যান, চারটি বুট পালিশের বাক্স ধরিয়ে দিয়ে রীতিমত উৎসব করা হয়েছে। ‘ভিক্ষুকমুক্তি’র উৎসব। যাতে খাজনার চেয়ে বাজনা পড়ে গেছে বেশি। বড় কর্তারা আসবেন, মঞ্চ হবে। ব্যানার তো থাকবেই। একটু খানা-খাদ্য না হলে কি চলে। স্কুলের মেয়েদের নাচ-গান না থাকলে তো এলাকার মান ইজ্জত গেল। কিন্তু তারপর, ‘যেই লাউ সেই কদু’। খোঁজ নিয়ে দেখুন তো, ওই এলাকায় ওই মানুষদের ভিক্ষার অভাব দূর হয়েছে কি?

কূটনৈতিক এলাকায় ভিক্ষাবৃত্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে অনেক আগেই। যাতে বিদেশিরা আমাদের দরিদ্র চেহারাটা না দেখেন। তারা যেন দেখেন হাতিরঝিলের বাতি। গুলশান, বনানী, বারিধারার নব্য কোটিপতিদের জশনে-জলুস। দেশ তো উন্নতির চরম শিখরে। নইলে, অডি, ল্যাম্বারগিনির মতন গাড়ি চলে কি করে। আতিপাতিরাও ঢাকার রাস্তায় হ্যারিয়ারে ঝড় তুলে যায়। সোজা কথা নাকি, উন্নতি না হলে এটা কি সম্ভব। তাই কূটনৈতিক এলাকায় ভিক্ষাবৃত্তি নিষিদ্ধ।

এসব এলাকায় রিকশাও নিষিদ্ধ। কারণ রিকশা চালায় গরিবেরা। চড়ে নিম্নমধ্যবিত্তরা। প্রায় সিঙ্গাপুর হয়ে যাওয়া একটি দেশে এমনটা ইজ্জতে লাগে না! কানাডা, লস এঞ্জেলসে কি রিকশা আছে? তাহলে ঢাকার কূটনৈতিক এলাকায় থাকে কি করে? আর ঢাকাতেই বা থাকার যুক্তি কি? সবচেয়ে ভালো হয় ঢাকা থেকে গরিব মানুষগুলো বের করে দিলে। ঢাকা শুধু কোটিপতিদের শহর থাকুক। বিদেশ থেকে মানুষ এসে টাসকি খেয়ে যাক। দেখুক কী বিস্ময়কর উন্নতি করেছি আমরা!

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]

আরো পড়ুন