জাপান ও ভারতীয় ফুটবল: আলোকবর্ষ দূরত্ব

শুভ্র মুখোপাধ্যায়
জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া সাংবাদিক, কলকাতা, ভারত
প্রকাশিত: ০৫ জুলাই ২০১৯, ১৬:১১
আপডেট: ০৫ জুলাই ২০১৯, ১৬:১১

নয় নয় করে তাও ১১-১২ বছর হয়ে গেল। সেদিনের সেই আফসোস এখনও যায়নি। দুই হাত দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ব্রাজিলীয় কিংবদন্তি জিকো। দাঁড়িয়ে রয়েছেন জাপান রিজার্ভ বেঞ্চের সামনে। আমরা হাতে গোনা কয়েকজন কলকাতার সাংবাদিক। ভারত-জাপান প্রি-ওয়ার্ল্ড কাপ ম্যাচ শেষ হয়েছে কিছূক্ষণ আগে যুবভারতীতে। জিকো একেবারে নাগালের মধ্যে, বয়স অনেক কম হওয়ায় আমার উদ্দীপনাও বেশি, এত সামনে থেকেও জিকোর সঙ্গে একটা ছবি তুলতে পারব না, হয় নাকি! তুলতেই হবে, ব্যস, ফটোগ্রাফারের খোঁজ শুরু, তখন স্মার্টফোন কারোর কাছে থাকলে তাকে অন্য গ্রহের মনে হতো, সেলফি তোলার হিড়িকও ছিল না। ছবি তুলতে গেলে দরকার একজন ফটোগ্রাফারের, যাও বা ময়দানের সেই সময়ের এক অভিজ্ঞ চিত্রসাংবাদিককে পেলাম, তিনি জুম আর অ্যাপার্চার ঠিক করতে করতে জিকো যুবভারতীর টানেল দিয়ে জাপান ড্রেসিংরুমে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আজও মনে হয়, সেই অভিজ্ঞ ফটোগ্রাফারের কমজোরি রিফ্লেক্সই আমাদের সেই সময়ের ভারতীয় ফুটবলের আসল চিত্র!

সেই জিকোকে তারপরেও দু’বার সামনে থেকে দেখেছি, একবার আইএসএলের ম্যাচে গোয়া এফসি-র কোচিং করানোর সময়, আর একবার সাও পাওলো মিডিয়া সেন্টারে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, সেবার আর ওই ফটো তোলার উদগ্র বাসনা তাড়া করেনি। কথায় আছে না, সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়, না হলে আর...। জিকো দিয়ে লেখাটা শুরু করার একটাই মানে, জাপান ফুটবল নিয়ে কিছু বলব বলে। জিকো ও জাপান, দুটি কিন্তু পরিপূরক। কেউ হয়তো ভাববেন, জিকোর সঙ্গে জাপানের কী সাদৃশ্য। ভুল ভাবা হবে, কারণ জিকো খেলা থেকে অবসর নিয়ে প্রথম যে জাপানে জে লিগ হয়েছিল, সেই লিগের তারকা ফুটবলার ছিলেন। পরে আবার জাপানের কোচ হিসেবে যে চার বছর ছিলেন, তা সোনায় মোড়া। তিনিই প্রথম জাপানের ফুটবল মডেলকে পালটে দিয়েছিলেন। কর্তাদের বলে দিয়েছিলেন, ‘আমার কাজ করতে দিন, নাক গলাবেন না, আমি আপনাদের দেশের ফুটবল মানচিত্রকে বদলে দেবো।’ দিয়েওছিলেন। বেশ মনে আছে, কলকাতায় যুবভারতীতে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচটির কথা, প্রথমার্ধে একটি গোল দিয়েছিল জাপান, আমরা যখন তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে শুরু করেছি, ব্যস, জাপান গোল দিতে শুরু করল। ম্যাচটি খেলেছিল জল-কুমির খেলার ঢঙে। বিরতির পরে চার গোল খেয়েছিলেন ভারতীয় ফুটবলাররা। জাপান জিতেছিল সম্ভবত ৫-০গোলে। বিপক্ষকে ম্যাচে বুঝতেই দিল না তাদের দলের গভীরতা। ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষকে শেষ করে দিলো, একেবারে সাইলেন্ট কিলারের ঢঙে।

ফরাসী কোচ রুনো মেটসুর হাত ধরে যেমন সেনেগাল ফুটবলের উত্থান ঘটেছে, তেমনি জাপানের ফুটবলের সূর্যোদয় ঘটেছিল জিকোর হাত ধরেই। লেখাটা লেখার আগে বেশ কিছুক্ষণ বসেছিলাম, মনটা খচখচ করছিল, মনে হচ্ছিল জাপান নিয়ে লিখে কী হবে, তারা তো রাশিয়া বিশ্বকাপের শেষ আটেই যেতে পারল না। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়েছে, এই জাপান নিয়ে যদি না লিখি, সাংবাদিক হিসেবে নিজের কাজ সম্পূর্ণ হবে না। সত্যিই বেলজিয়ামের কাছে হয়তো তারা হেরেছে, কিন্তু সেদিন যেভাবে খেলেছে, তাতে এশিয়াবাসীর ‘দিল’ জিতে নিয়েছে। জাপানের খেলা দেখে বারবার মনে পড়ছিল রবি ঠাকুরের জাপান নিয়ে লেখা বই ‘জাপান যাত্রী’র সেই লাইনটির কথা; যেখানে বিশ্বকবি লিখেছিলেন, ‘এশিয়ার মধ্যে জাপানই প্রথম অনুভব করেছিল যে, ইউরোপের শক্তিকে পাল্লা দিতে হলে অকুতোভয় শক্তি দ্বারা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে, না হলে ইউরোপের চাকার নীচে চাপা পড়তে হবে।’

রবি ঠাকুরের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আমার মুখে ঠিক সাজে না। বরং আমার মনে হয়, জাপানের মানুষদের জীবনযাত্রা তাদের যাবতীয় উন্নতির সোপান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। জাপানে ‘কারোশি’ নামে অধিক প্রচলিত একটি শব্দ রয়েছে, যার অর্থ ওভারটাইমের হতশ্রী রূপ, অর্থাৎ অতিরিক্ত কাজের চাপে মৃত্যু। জাপানে ফি বছর গড়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এই কাজের চাপে। তারা সারাক্ষণ দৌড়চ্ছে, আর অহেতুক কাজ না শেষ করতে পারার টেনশনে ভুগছেন। সবসময় মনে হয়, এই বুঝি কাজটা শেষ করতে পারব না। সেই কারণে তাদের ঘুম খুব কম। না হলে সারা বিশ্বে কোনো দেশে রয়েছে অফিসে গিয়ে ঘুমোনোর নিয়ম রয়েছে, জাপানে রয়েছে। অত্যাধিক কাজের চাপে যদি চোখ কোনো সময় বুজে আসে কারো, তা হলে সেই অফিসের বস সেই কর্মীকে কিছু বলবেন না। সেই আধিকারিক ধরেই নেবেন আমার এই কাজপাগল কর্মীটি কাজের চাপে ঘুমোনোর ফুরসতই পায়নি। জাপানের শেষ ম্যাচ বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলা দেখে সেটাই যেন মনে হয়েছে বারবার। যে দল একটা সময় ২-০ গোলে জিতছে, সবাই যখন মনে করছে, ড্যাঙ ড্যাঙ করে জাপান শেষ আটে চলে যাবে, সেই সময় সারাদিনে কাজের ধকলে চোখ বুজে আসতেই বেলজিয়াম তিন গোল করে ম্যাচ জিতে নিলো। জাপানের যখন ঘুম ভাঙল, সেইসময় দেখা গেছে হ্যাজার্ড, লুকাকুরা ম্যাচ জিতে নিয়েছেন।

জাপানের ফুটবলারদের মুখটা দেখে সবার খুব কষ্ট হয়েছে। যে দলটি দুটি শক্তিশালী দলকে হারিয়ে স্বপ্ন দেখাতে পারে, তাদের হার এত করুণ হবে ভাবা যায়নি। তারা হয়তো হেরেছে, কিন্তু হেরেও হৃদয় জিতে নিয়েছেন আকিরো নিশিনোর ছেলেরা। আবার এও ভেবেছি জাপান যদি পারে, জাপান যদি এতটা আসতে পারে, আমরা ভারতীয়রা কেন পারি না? কেন আমরা ইজরায়েল, কুয়েতকে হারালে মনে করি আমাদের স্বপ্ন সফল হয়েছে। কেন আমরা সেই কুয়োর ব্যাঙ হয়েই থেকে গেলাম। তার জন্য একটি গল্প বললে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। আরও পরিষ্কার হবে কেন জাপান পারে, আমরা পারি না। জাপানে একটি অঘোষিত নিয়ম রয়েছে। যদি তাদের দেশে কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় হয়, তা হলে দলমত নির্বিশেষে তারা সমাজের উন্নতিকল্পে কাজ করবে। সে যদি কোনো মাফিয়া গোষ্ঠী হয়, তারাও। এমনই এক মাফিয়াদের সংগঠন ‘ইয়াকুজা’—সুনামিতে আর ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত জাপানের মানুষদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার মহান কাজটি করেছিল সুনিপুণভাবে। এমনও হয়েছে, দেশের সরকার, তাদের সেনারা পৌঁছতে পারেনি সেই ভয়াবহ অঞ্চলগুলোতে, কিন্তু সেই মাফিয়া গোষ্ঠীর লোকেরা পৌঁছে দুঃসহ মানুষদের পাশে দাঁড়াতে পেরেছিল। ওই সংগঠনের সংঘবদ্ধতা ও পেশাদারিত্বে মুগ্ধ হয়েছিল সরকার ও সাধারণ মানুষও।

এটাই জাপান। আক্রান্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমাজবিরোধীদের সংগঠনও পাশে এসে যায়। আর আমাদের দেশে সব পরিস্থিতিতে রাজনীতি করেই আমাদের সব শেষ হয়েছে। সবেতে রাজনীতি, খেলার মাঠে, অফিসে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সরকারি দপ্তর, আর কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়েও। সেখানেও কোন দল কী পরিস্থিতিতে ত্রাণ দেবে, সেই নিয়ে কত না নাটক। আমাদের দেশের ফুটবল কর্তারাই চান না ভারত এগিয়ে যাক। তারা বরং চান প্রতিবছর ফিফা সভাপতির আমন্ত্রণে কোনো নৈশভোজে অংশগ্রহণ, আর হাসিমুখে করমর্দন, তা হলেই স্বপ্নপূরণ। বাকি কী হলো, গেল, তাতে কিছুই যায় আসে না। যেভাবে অনুর্ধ্ব ১৭যুব বিশ্বকাপ আয়োজন করে বিশ্বকাপে খেলেছি, সিনিয়র বিশ্বকাপ ওভাবে খেলা যাবে না, সেটি নিশ্চিত।

তা হলে কীভাবে সম্ভব জাপানকে মডেল করা? একটাই উপায়, পরিকাঠামো ঢেলে সাজানোর পাশে জিকোর মতো কোনো কিংবদন্তীকে নিয়ে এসে সফল রূপায়ণ। সেখানেও আবার সমস্যা। জিকোর স্বাধীনতা মেনে নিয়েছিলেন জাপান ফুটবল কর্তারা। কিন্তু জিকোর মতো কেউ যদি ভারতীয় কর্তাদের স্বাধীনতা দেওয়ার কথা বলেন, তা হলে শূন্যতেই সব শেষ! কারণ তারা মনে করেন, ভারতীয় ফুটবলের শেষ কথা কর্তারা বলবেন, কোনো কোচ নন! ফলে যা হওয়ার তাই হবে, জাপানকে দেখে আমরা নাচব ঠিকই, কিন্তু তাদের মডেল করার স্বপ্ন—দূর, দূর, অনেক আলোকবর্ষের পথ!

আরো পড়ুন