লাকী আখন্দ, বাংলাদেশের অন্যতম সেরা সুরকার, সঙ্গীতপরিচালক ও গায়ক। ছবি: শামছুল হক রিপন

গানে সামাজিক সমস্যার কথা নেই বলে আক্ষেপ ছিল লাকী আখন্দের

মিঠু হালদার
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭ জুন ২০১৯, ১৫:২৪
আপডেট: ০৭ জুন ২০১৯, ১৫:২৪

(প্রিয়.কম) ১৯৫৬ সালের ৭ জুন ঢাকায় জন্ম নেন বাংলা গানের কিংবদন্তি সুরকার শিল্পী লাকী আখন্দ। মুক্তিযোদ্ধা এ শিল্পীর ৬৪তম জন্মদিন আজ। পুরান ঢাকার এক সংগীতানুরাগী পরিবারে জন্ম তার। তিন ভাই জলি, হ্যাপি ও লাকীর সংগীতের প্রতি অনুরাগ পারিবারিকভাবেই। পাঁচ বছর বয়সে বাবা আবদুল আলী আখন্দের হাত ধরে সংগীত শিক্ষায় হাতেখড়ি তার।

তার সময়ে তিনি ছিলেন অন্যদের চেয়ে আলাদা। সুরকার হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন। প্রয়াত কিংবদন্তি এই শিল্পীর জন্মদিনে তাকে স্মরণ করে পুরানো একটি লেখার কিছু অংশ নতুন করে প্রকাশ করা হলো। ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে জুনের এক ঝরঝরিয়ে রোদ পড়া দুপুরে (৯ জুন) প্রিয়.কমের এই প্রতিবেদকের মুখোমুখি হয়েছিলেন লাকী আখন্দ।

পুরান ঢাকার আরমানিটোলা ঠিক গির্জার কাছেই। এক রংচটা ভবন, বুক চিতিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, এই ভবনের একটি কক্ষেই তৈরি হয়েছে ‘এই নীল মণিহার’, ‘মামনিয়া’, ‘আগে যদি জানতাম’, ‘হৃদয় আমার’, ‘সুমনা’র মতো গান। শিল্পীর দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী বাসাটি খুঁজে পাওয়া গেল সহজেই। ভবনের নিচে এক দোকানিকে জিজ্ঞাসা করতেই, পাশে বাঁকানো সিঁড়ি বেয়ে লাকী আখন্দের বাসায় যাওয়ার পথটা দেখিয়ে দিলেন।

সফট-মেলোডি, মেলো-রক, হার্ড-রক যে ধরনের গানেই হাত দিয়েছেন সেটাই হয়ে উঠেছে অতুলনীয়। ১৯৮৪ সালে সারগামের ব্যানারে প্রকাশ পায় শিল্পী লাকী আখন্দের প্রথম একক অ্যালবাম ‘লাকী আখন্দ’।

কলিংবেল চাপতেই দরজা খুলে দিলেন শিল্পী নিজে। পরনে শাদা পাজামা আর ফতুয়া। ঠোঁটে সুমিষ্ট হাসি। সেই হাসি ছড়িয়ে পড়ছে সারা মুখে। তখন দীর্ঘদিন অসুস্থ থেকে কিছুটা সুস্থ হয়ে সদ্য গানের ভুবনে ফিরেছেন।

আট মাস পর কি-বোর্ডের ধুলা সরিয়েছেন। আবারও হাত রেখেছেন কি-বোর্ডে। আপন ভুবনে ফিরে লাকী আখন্দ কয়েকটি রবীন্দ্রসংগীতের জন্য নতুন করে সংগীতায়োজন করছেন। ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’ গানটির সংগীতায়োজন শেষ করেছেন কিছুদিন আগে। আলাপচারিতার সময়টাতে করছিলেন ‘তুমি কোন কাননের ফুল কোন গগনের তারা’র সংগীতায়োজন।

ড. আনিসুজ্জামানের ওপর নির্মিত একটি ডকুমেন্টারির জন্যই গানগুলো নতুন করে করছিলেন। এসব গানে লাকী আখন্দ নিজে কণ্ঠ দিয়েছিলেন। এ ছাড়া ‘প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন’ গানটিরও কাজ চলছিল।

চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার পরই নতুন প্রসঙ্গ বাতলে দিলেন তিনি। কিছু ব্যতিক্রম নতুন লিরিক হাতে পেয়েছিলেন। গত ৪০-৫০ বছর একই ধরনের লিরিক তাকে ব্যথিত করে তুলছিল বলে জানিয়েছিলেন। এ নিয়ে দুঃখও ছিল তার। বললেন, ‘দুঃখের গান করতে করতে আমি নিজেও অ্যাবনরমাল হয়ে গেছি। এত দুঃখ রাখব কোথায় বলো? (এ সময় তিনি হেসে উঠলেন)।’

আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘আমরা কেন সোশ্যাল সমস্যাগুলো গানের মধ্য দিয়ে তুলে ধরছি না?’ এই শিল্পী জানিয়েছিলেন, এখনকার বেশির ভাগ গানেই ছন্দ নেই। নেই নতুনত্বও। একই ছাঁচে গড়া।

নতুন জীবন পেয়ে শ্রোতা-ভক্তদের জন্য আরও কিছু সৃষ্টি করে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। লাকী আখন্দ বলেছিলেন, ‘কোনো গান তৈরির আগে তাকে সতর্ক হতে হবে। গানটি শোনার পর শ্রোতাদের মনে একধরনের কৌতূহল কিংবা আওয়াজ থাকবে। সে কারণেই পুনরায় আমার পৃথিবীতে আসা। স্রষ্টা আমাকে আবার ফেরত পাঠিয়েছেন। বলতে পারেন কবরের দ্বারপ্রান্ত থেকে। তাই আমার জীবনের সেরা কাজটি করেই কবরে যেতে হবে।’

আর নতুন শিল্পীদের গান নিজের পছন্দ-অপছন্দের কথা বলেছিলেন এভাবে, ‘নতুন অনেক শিল্পী ভালো করছেন। কিন্তু তারা ফ্রন্টে আসতে পারছেন না। অনেকে এলোমেলো পথে পা বাড়িয়ে চলছেন। ভালো কাজ করলে পুরস্কার নাই, প্রশংসা নাই; তাই অনেকেই খেই হারিয়ে ফেলছেন। আর তাদের পেছেনে নতুন পথ বাতলে দেওয়ার লোকের বড়ই অভাব; যা একটা ইন্ডাস্ট্রির জন্যে মোটেই ভালো বিষয় নয়।’

দীর্ঘ সংগীতজীবনে টিভি কিংবা বেতার অনুষ্ঠানে অনেক গান গেয়েছিলেন লাকি আখন্দ। কিন্তু ‘লবিং’ করে গান গাওয়ার যে বিষয়, জীবনে একবারের জন্যেও তা মেনে নিতে পারেননি। বর্তমান সময়ে অনুষ্ঠান প্রযোজক আর শিল্পীদের মধ্যে অন্য একধরনের লবিং আছে; যা নিয়ে তার মন খারাপ হতো বলে জানিয়েছিলেন তিনি।

লাকী আখন্দ বললেন, ‘এখন তো শিল্পীর অভাব নেই। আর আমাদের এখানে কিছু শিল্পী আছে, যারা দেহের বিনিময়েও গান গায়, আরও উপরে উঠতে চায়। কলকাতায় দেখেছি যেটা চায়ের দামে। তবে টুকটাক আছে, যারা এ ধরনের কাজ করে না, এটা টিভি কিংবা রেডিও, যে মাধ্যমের কথাই বলেন না কেন। অনুষ্ঠান প্রযোজক এদিক-ওদিক হয়ে যায়। সেক্স্যুয়াল বিষয়গুলো তখন সামনে চলে আসে। তবে আর্ট-কালচারে এ ধরনের বিভাজন কিংবা প্রাকৃতিক বিপর্যয় থাকবেই।’

অসন্তুষ্ট ছিলেন রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়েও। এ নিয়ে তার বক্তব্য ছিল, ‘বাংলাদেশে এ বিষয়টা বহুদিন ধরেই চলছে। এটি আন্তজার্তিক একটি চক্রান্ত। ছোটবেলায় কম বুঝতাম। এখন পরিষ্কার বুঝি। কারা করছে, কেন করছে তাও বুঝি। দেশের মানুষ যদি দেশকে ভালোবাসতে না পারে, তাদেরকে বুঝাতে হবে কেন দেশকে ভালোবাসতে হবে।’

প্রিয় বিনোদন/রুহুল

আরো পড়ুন