কামরুজ্জামান কামু। ছবি: শামছুল হক রিপন

‘ছবিটা অলরেডি আমার এক যুগ খেয়ে ফেলেছে’

মিঠু হালদার
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৩০ মে ২০১৯, ২০:১৫
আপডেট: ৩০ মে ২০১৯, ২০:১৫

(প্রিয়.কম) ‘দ্য ডিরেক্টর’ ছবিটার যে অ্যাপ্রোচ, যে ভঙ্গি, সেটা হয়তো চলমান প্রতিষ্ঠান কিংবা ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে ম্যাচ করেনি, যার ফলে দেশের হল মালিকরা ছবিটি প্রদর্শন করতে চাননি। প্রিয়.কমের সঙ্গে আলাপকালে এমনটাই জানিয়েছেন ছবিটির নির্মিতা কামরুজ্জামান কামু।

বহু জটিলতা শেষে ইউটিউবে ছবিটি মুক্তি পেতে যাচ্ছে। প্রায় সাত বছর আগে নির্মিত ছবিটির মুক্তি ছাড়াও বেশ কিছু বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি।

প্রিয়.কম: আপনি তো কবি, গণমাধ্যমেও চাকরি করেছেন, গান লিখেছেন, সমাদৃত হয়েছেন। একটা সময় গিয়ে আপনাকে অভিনয়েও দেখা মিলেছে। তারপর নির্মাণে জড়িয়েছেন। নির্মাণের ভূতটা কীভাবে আপনাকে চেপে ধরল?

কামরুজ্জামান কামু: আমি চাইছি আসলে একটা পেশা; আমার গুণটাকে আর্টের কোন শাখাটাতে ব্যবহার করলে সেটা পেশা হয়ে উঠতে পারে। একটা সময় গিয়ে আমার কাছে মনে হইছে, ফিল্মে যেহেতু পুঁজির যোগ আছে, এই সেক্টরে আমি জীবিকার জন্য কাজ করব, বিষয়টা এইরকম।

প্রিয়.কম: নির্মাণ করতে গিয়ে আপনি কী কোনো নির্মাতার কাজ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন?

কামরুজ্জামান কামু: আমি বিভিন্ন সময়ে কাজ করেছি মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, নুরুল আলম আতিকের সঙ্গে। ফলে আমি যেহেতু সিনেমার লোক নই আগে থেকে, ফলে তাদের প্রভাব আমার ওপর থাকতে পারে। আর কাজটি ঠিক কীভাবে করে, সেটা আমি কিন্তু তাদের দেখেই শিখেছি।

প্রিয়.কম: আপনার নির্মিত চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিরেক্টর’ ২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সেন্সর বোর্ডে জমা পড়ে। প্রায় এক বছর পর ছাড়পত্র পায়। বেশ ঝক্কির মধ্য দিয়ে গিয়ে সিনেমাটি দর্শকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে। আসছে ঈদে ছবিটি রিলিজ পাচ্ছে। এতটা সময় নিলেন কেন?

কামরুজ্জামান কামু: আমি একবার ভাবছিলাম ছবিটা আর রিলিজই দেবো না। কিন্তু আমার ভেতরে একটা দায় সবসময় কাজ করত, যেহেতু ছবিটা আমি বানাইছি, মানুষকে দেখানোর দরকার আছে। ঈদ যখন আসলো, এটা তো মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব। হুট করেই মাথায় আসলো যে, ঈদে আমি ছবিটা ইউটিউবে মুক্তি দিয়ে দিই না কেন। যেই ভাবলাম সঙ্গে সঙ্গেই ঘোষণা দিয়ে দিলাম।

প্রিয়.কম: ছবিটি হলে মুক্তি না দিয়ে কেন ইউটিউব চ্যানেলে মুক্তি দিচ্ছেন?

কামরুজ্জামান কামু: কারণ আমি অন্য মাধ্যমগুলোতে একটু ফেলও করেছি। তাদের সঙ্গে আমার ছবিটা ম্যাচ করেনি। আমার ছবিটার যে অ্যাপ্রোচ, যে ভঙ্গি, সেটা হয়তো চলমান প্রতিষ্ঠান কিংবা ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে ম্যাচ করেনি। যে কারণে সেসব জায়গায় আমার ছবিটা দেখানো সম্ভব হয়নি। ফলে আমাকে ইউটিউবকে বেছে নিয়ে হয়েছে। এতে করে বলতে পারছি, একযোগে সারা বিশ্বে ছবিটি মুক্তি দিচ্ছি।

আমি দু-চারটা হলে মুক্তি দিলে, সেই ছোট অঞ্চলের দর্শক পাইতাম। কিন্ত এখন আমার ছবিটা সারা পৃথিবীর দর্শকই দেখতে পারবে। যারা জানে, এটা তাদের জন্য দেখতে দারুণ একটা সুবিধা হবে। যে যেখানেই থাকুক না কেন।

প্রিয়.কম: সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়ার পদক্ষেপে ঠিক কোন ধরনের সংকটের সম্মুখীন হয়েছিলেন?

কামরুজ্জামান কামু: সংকটটা হলো যে, এই ছবিটা যে হলে চলতে পারে, এইটা ভাবা ডিস্ট্রিবিউটরদের জন্য কঠিন ছিল। কারণ তারা তো ফরমেটেড ছবি চালিয়ে অভ্যস্ত। কিন্তু আমার ছবিটা তো তাদের ফরমেটের বাইরে। যার কারণে তারা বিষয়টা আর সামনে এগুতে চায়নি। এটা তো ট্রাডিশনাল ছবি না। ফরমেট ভেঙেচুড়ে করা নতুন একটা জিনিস। এটা দেখে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারে নাই, ছবিটা হলে চলতে পারে।

প্রিয়.কম: এখন তো দেশের নানান জায়গায় একটু সময় নিয়ে চাইলেই বিকল্প উপায়ে সিনেমা প্রদর্শন করা যায়, আপনি সে পথে হাঁটলেন না কেন?

কামরুজ্জামান কামু: কারণ এই ছবিটা অলরেডি আমার জীবনের এক যুগ খেয়ে ফেলেছে। আমি নিজেও এটা দর্শককে দেখিয়ে এটা থেকে বের হয়ে নতুন একটা প্রজেক্ট ধরব। এখন যদি আমি এই প্রজেক্টটা নিয়ে সারা দেশে ঘুরতে থাকি, তাহলে আরও দু-এক বছর চলে যাবে। তাহলে জীবন থেকে আরও সময় চলে যাবে। আমি এটা আর করতে চাই না। এটা আমি মুক্তি দিয়ে দ্রুত নতুন প্রজেক্টে হাত দেবো।

প্রিয়.কম: আপনার ছবিটি থেকে ২০ সেকেন্ডের একটি ফুটেজ বাদ দিয়ে সেন্সর বোর্ড ছাড়পত্র দিয়েছে। কী ছিল ওই ২০ সেকেন্ডে? যা বাদ দিতে হলো?

কামরুজ্জামান কামু: যেহেতু আমি ছবিটি হলে রিলিজ দিচ্ছি না, তাই সেন্সর সার্টিফিকেটের তেমন কোনো দাম নেই। তারা যে কাটটা দিছিল তারা মনে করেছে, এটা চলমান প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যায় না বা আঘাত করে বা কিছু। সে রকম একটা জায়গায় তারা কাট দিছিল। সেই কাটটা আমি আর মেনে চলি নাই। তাই অনলাইনে যখন ছবিটি মুক্তি দেবো, সেটা আনকাট দেবো। অনলাইনে তো আর সেন্সরের বিষয়টা নেই।

প্রিয়.কম: একজন কবির সিনেমা বানানোর স্ট্রাগলটা কেমন?

কামরুজ্জামান কামু: মেকিংয়ের ক্ষেত্রে আমার একটা স্ট্রাগল ছিল। কারণ আমি সিনেমার লোক নই। আমি বন্ধুদের সেটে গিয়ে টুকটাক যা দেখেছি, তারই আলোকে আমি নিজেও বানানো শুরু করে দিয়েছি। এটা পরিকল্পিত ছবি নয়। আমি স্টোরিটা আগে ঠিক করে নিছি, তারপর শুট করেছি, বিষয়টা এমন নয়। আমি শুট করতে করতেই এ ছবিটা দাঁড়াইছে। এরপর একটা সময় গিয়ে দেখলাম বাংলা সিনেমার যে ফ্লেভার, সেই ফিলটা এই গল্পে পাচ্ছিলাম, তারপর ফের আবার শুট করেছি। এরকম করে করে বানাতে বানাতে এটা ছবি হয়ে উঠেছে। বানাতে বানাতে আমিও ছবির প্রধান একটা চরিত্রে অভিনয় করতে বাধ্য হয়েছি।

প্রিয়.কম: প্রধান একটি চরিত্রে অভিনয় আবার ডিরেকশনও দিয়েছেন। কাজটা তো বেশ কঠিন ছিল। কীভাবে সব সামলে নিলেন?

কামরুজ্জামান কামু: এ ছবির অনেক ফ্রেম, অনেক কিছুই আমার মনের মতো করে করতেও পারি নাই। তারপরও আশা করি দর্শক সেটা ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। প্রথমত এটা আমার প্রথম ছবি, দ্বিতীয়ত আমি ক্যামেরার সামনে। খুব কম সময়ের মধ্যেই শুটিং আমাকে শেষ করতে হয়েছে। টাকা-পয়সা সেভাবে ছিল না। এটা খুবই স্বল্প বাজেটের ছবি। কিন্তু সময় অনেক বেশি লেগেছে।

সব মিলে একধরনের জটিল পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হইছে। ভিডিওগ্রাফি ও কম্পোজিশন নিয়ে অনেকেরই অনেক প্রশ্ন থাকতে পারে। তবে আমি যৌক্তিক সমালোচনা চাই। দর্শক দেখুক এবং কথা বলুক। আমি সে সমালোচনাগুলো সাদরে গ্রহণ করব। পরবর্তী ছবি নির্মাণের ক্ষেত্রে সে বিষয়গুলো মাথায় রেখে কাজ করতে চেষ্টা করব।

প্রিয়.কম: ছবিটি মুক্তির আগেই তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। এই ছবির অভিনেত্রী চিত্রনায়িকা পপি দাবি করেছেন, এটি সিনেমা নয়, টেলিছবি। তাকে যখন কাস্ট করা হয়েছিল, তখন তাকে বলা হয়েছিল, এটি টেলিফিল্ম। বিষয়টা কী সত্য?

কামরুজ্জামান কামু: পপিকে আমি বলেছিলাম, এটা ডিজিটাল ছবি। সে হয়তো এটা বুঝতে ভুল করে থাকতে পারে। সে কম সময় শুটিং করছে এখানে। এফডিসিতে যতদিন ধরে সময় নিয়ে একটা ছবি তৈরি হয়, আমার তৈরি ছবিটা ঠিক ততদিন ধরে তৈরি হয়নি। সেটা সবাই জানে। যার কারণে কম সময়ে আমাকে কাজ করতে হয়েছে। এটা কিন্তু নায়ক-নায়িকা নির্ভরও ছবি নয়। দুই-তিন মাস শিডিউল লাগবে নায়িকার তাও নয়। দু-তিন দিনে কীভাবে শেষ হলো, এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নাই। এখানে সবাই প্রধান চরিত্র। যার কারণে সবাইকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রিয়.কম: ছবিটি নির্মাণের পর প্রায় ৭ বছর পেরিয়ে গেছে। আপনার কী মনে হয়, যে উদ্দেশ্য নিয়ে ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন এই সময়ে সেটিকে কতটা ছুঁতে পারবে ছবিটি?

কামরুজ্জামান কামু: আমার উদ্দেশ্য ছিল, ছবিটি নির্মাণ করে দর্শকদের কাছে পৌঁছানো। কারণ একটা সময় গিয়ে আমার মনে হয়েছে, ছবিটি আর শেষ করতে পারব না। ছবি হিট করবে কি না, চলবে কি না, এসব মাথায় ছিল না। কারণ ছবিটা শেষ করতে না পারলে আমি নিজের কাছে নিজে পরাজিত হয়ে যাব। আমি যেহেতু ছবিটা শেষ করতে পারছি, সেন্সর বোর্ডের সার্টিফিকেটে পেয়েছি এমনকি এখন মুক্তি পাচ্ছে, এই পর্যন্ত আসাই এ ছবির জন্য একটা সাফল্য।

দুর্বল কিসিমের লোক হলে অনেক আগেই এ ছবি ছেড়ে অন্য কাজে ইনভলব হয়ে যেতাম। এটা থেকে আমার একটা কাজে লেগে থাকার শক্তি সম্পর্কেও জানা যাবে। আমি শেষ দেখে ছাড়তে চাইছি। আমার যা দেখছি মনে হচ্ছে, দর্শকই ছবিটাকে জনপ্রিয় করে দেবেন। আমি হয়তো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবো। কিন্তু যত বেশি দর্শক ছবিটা দেখবে আমি ততই আনন্দিত হবো।

প্রিয়.কম: সম্প্রতি ‘ভাই ব্রাদার এক্সপ্রেস’ স্লোগানকে প্রতিপাদ্য রেখে নির্মিত ‘দ্য অরিজিনাল আর্টিস্ট’ নাটকে প্রধান একটি চরিত্রে আপনাকে দেখা গেছে। কাজটি বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। অভিনয়ে নিয়মিত হন না কেন?

কামরুজ্জামান কামু: আমি চাইছিলাম অভিনয়ে নিয়মিত হতে, কিন্তু সে রকম গল্প নিয়ে কেউ আমার কাছে আসে নাই। ভালো চরিত্র, ভালো গল্প নিয়ে আসে নাই। আমি কবি বলে হয়তো অনেকে আমাকে বলতে দ্বিধান্বিত হয়। আমি কাজটা করব কি না, এরকম বিষয়ও থাকতে পারে।

প্রিয়.কম: নতুন একটি সিনেমা নির্মাণের কথা বলেছিলেন, কিন্তু সে বিষয়ে নতুন কোনো আপডেট আছে?

কামরুজ্জামান কামু: বর্তমান ছবিটা ছাড়ার পরে আমার মধ্যে নতুন ছবির প্রেরণাটা কাজ করবে। আমি কবিতার ক্ষেত্রেও দেখেছি, আমার যখন বই হওয়ার মতো কবিতা জমে যায়, তখন আমার নতুন কবিতা আর লেখা হতে থাকে না। যেই না বইটা বের করে দিই, তখন তো আর কবির থাকে না, তখন সেটা জনগণের হয়ে যায়, পাঠকের হয়ে যায়। তখন কবি হিসেবে আমি দেখি আমার ঘর শূন্য।

তখন আবার আমার নতুন কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা তৈরি হয়। আশা করতেছি আমার ছবিটার বেলায়ও তাই হবে। মুক্তির পর আমার ঘর শূন্য হবে, সেই ঘরকে আবার ভরানোর জন্য আমি নতুন করে ছবি তৈরির কাজে নামব।

প্রিয় বিনোদন/রিমন

আরো পড়ুন