বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি

খালেদার প্যারোল নিয়ে কেন এত বিতণ্ডা?

প্রিয় ডেস্ক
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ২০ এপ্রিল ২০১৯, ২২:২১
আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০১৯, ২২:২১

(প্রিয়.কম) বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি নিয়ে গত কিছুদিন ধরে দেশের প্রধান দুই দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে চলছে অভিযোগ আর পাল্টা-অভিযোগ। দেশের প্রধান দুই দলের নেতাদের মধ্যে চলছে কথার লড়াই। তাদের মধ্যে সরকারি দল বলছে, খালেদা জিয়া নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে প্যারোলে মুুক্তির জন্য আবেদন করলে আদালত বিষয়টি বিবেচনা করে দেখতে পারে। অন্যদিকে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বলছে, খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন করবেন না। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তি পাবেন। ‍প্যারোল নিয়ে দুই দলের মতভেদ কর্মীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে।

গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিচারিক আদালত খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর সাজা দেয়। এরপর ওই রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে হাইকোর্টে আপিল করেন খালেদার আইনজীবীরা। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার সাজা বৃদ্ধির আবেদন (রিভিশন) করে দুদুক। দুদুকের আবেদন গ্রহণ করে খালেদা জিয়ার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল আবেদন করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা, যা শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ।

এ ছাড়া গত ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় বিচারিক আদালত খালেদা জিয়াকে সাত বছরের সাজা দেয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে হাইকোর্টে আপিল করেন তার আইনজীবীরা। এটিও শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ।

খালেদা জিয়ার প্যারোল নিয়ে যেভাবে আলোচনার সূত্রপাত

গত ৬ এপ্রিল, শনিবার দুপুরে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে বাহাদুরাবাদ ঘাট নৌ থানা উদ্বোধনকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, ‘কারাবন্দী খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি পেতে হলে একটি সুনির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে আবেদন করতে হবে। কিন্তু এ ধরনের কোনো আবেদন এখনো আসেনি। আবেদন পেলে মুক্তির বিষয়ে চিন্তা করবে সরকার।’

এরপর সম্প্রতি দেশের একটি প্রভাবশালী ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে দিনক্ষণ উল্লেখ করে বলা হয়, প্যারোলে মুক্তি নিয়ে লন্ডন যেতে পারেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

এ বিষয়ে গত ১৮ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার শেখ হাসিনার ব্রুনাই সফর উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার লন্ডনে যাওয়ার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে কোনো তথ্য নেই।

প্যারোলে মুক্ত হয়ে লন্ডন যাওয়ার বিষয়ে ব্রিটিশ দূতাবাস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কিছু জানিয়েছে কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে কিছু জানি না।’

এরপরও প্রতিদিনই খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি নিয়ে গণমাধ্যমে বড় দুই দলের নেতাদের বাহাস অব্যাহত রয়েছে। 

খালেদা জিয়া গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাবন্দী হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময় বিএনপির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন, বিবৃতি, অবস্থান কর্মসূচি, কালো পতাকা প্রদর্শন, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘদিন খালেদার মুক্তির দাবিতে রাজপথে বিএনপিকে সেভাবে দেখা যায়নি। এ নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভিন্ন সময় প্রচণ্ড ক্ষোভও দেখা যাচ্ছে। তোপের মুখে পড়তে হয়েছে সিনিয়র নেতাদের। তবে সম্প্রতি খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি সামনে এলে বিএনপির নেতাকর্মীরা বিষয়টিতে সোচ্চার হন। তাদের নানামূখী তৎপরতাও চোখে পড়ার মতো লক্ষ করা যায়। 

দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা তাদের সব কর্মসূচিতে বিষয়টি নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বক্তব্যের বিপরীতে পাল্টা বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়, গত ১৪ এপ্রিল, পয়লা বৈশাখের দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়নজরুল ইসলাম খান। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা তারা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার বিষয়ে কথা বলেন। প্যারোলে মুক্তি এবং বিএনপির এমপিরা সংসদে যোগ দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। তবে খালেদা জিয়া এসব ব্যাপারে ইতিবাচক কোনো ইঙ্গিত দেননি; বরং ভিন্নমত পোষণ করেছেন।

দলের চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা শেষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর খালেদার প্যারোলে মুক্তির কথা নাকচ করে দিয়ে গণমাধ্যমকে বলেছেন, চিকিৎসার জন্য প্যারোলের সিদ্ধান্ত খালেদা জিয়া দেননি। এ নিয়ে কোনো আলোচনাও হয়নি। 

দলের আরেকটি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে দলীয় নেতাদের উদ্দেশে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেছেন, ‘আমি কেন প্যারোলে মুক্তি নেব? আমি তো আইনি প্রক্রিয়ায় জামিন পাওয়ার অধিকার রাখি।’ সে সময় তিনি আরও বলেন, ‘আমাকে দেওয়া মামলাগুলোর সাজা তো এখনো চূড়ান্ত নয়। সাজার বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে আদালতে আপিল করা আছে। জামিনে মুক্তি নিয়েও মামলাগুলো মোকাবিলা করতে পারি। প্যারোলে মুক্তি নেব কেন?’

খালেদার প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত ১৬ এপ্রিল জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (একাংশ) বার্ষিক সাধারণ সভায় বলেন, ‘প্যারোলের মুক্তির বিষয়টি নিয়ে রাজনীতিতে যে আলোচনা চলছে, সেটা তার এবং তার পরিবারের বিষয়।’

এর আগে গত মঙ্গলবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমি খুব পরিষ্কার করে বলতে চাই, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি নিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। তিনি এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কিন্তু তাকে নিয়ে ভিত্তিহীন খবর ছড়ানো হচ্ছে।’

এদিকে ২০ এপ্রিল, শনিবার আওয়ামী লীগ সভাপতি ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে সম্পাদকমণ্ডলীর সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের যগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, ‘একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মুক্তি কেবল আইনি প্রক্রিয়া অথবা রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার পর যদি তিনি ক্ষমা করেন তাহলে হতে পারে।’

হানিফ আরও বলেন, ‘আমরা বারবার বলেছি খালেদা জিয়া আদালতের দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। রাজনৈতিক কোনো কারণে তিনি কারাগারে না। দুর্নীতির অভিযোগে ওয়ান ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মামলা হয়েছিল। সেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকে দণ্ড দিয়েছে। তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি হিসেবে কারাগারে রয়েছেন। একজন দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদির মুক্তির বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে। এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

আবার ২০ এপ্রিল, শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ জাতীয় দলের উদ্যোগে আয়োজিত খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা বেগম জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি চাই, কোনো শর্ত দিয়ে আমরা মুক্তি চাইনি। আমরা কখনো বলি নাই যেকোনো মূল্যে আমরা তার মুক্তি চাই। অথচ তার মুক্তি নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক অনুষ্ঠানে ১৯ এপ্রিল, শুক্রবার আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার জামিনে সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাধীন। এ কারণেই দুর্নীতিবাজদের বিচার হচ্ছে।’

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘খালেদা জিয়া এতিমের টাকা আত্মসাৎ করায় নিম্ন আদালত সাজা দিয়েছেন। তিনি উচ্চ আদালতে আপিল করেন। আপিলে ৫ থেকে বাড়িয়ে ১০ বছরের সাজা হয়েছে। দেশে আইনের শাসন আছে বলেই এসব দুর্নীতিবাজদের সাজা হয়েছে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভাপতি আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০ এপ্রিল, শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার কারাবরণের বিষয়টি রাজনৈতিক। এখানে আইনি কোনো বিষয় নেই। দেশ ও দেশের বাইরে এটি এখন পরিষ্কার।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি খালেদা জিয়ার কথা বলছি না, কোনো জনপ্রিয় দলের চেয়ারপারসনের কথা বলছি না। বলছি একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, মানবিক অধিকারের কথা। অধিকারের বিবেচনায় উনার জামিন হওয়ার কথা। তিনি যেখানে সাধারণভাবে জামিন পাওয়ার যোগ্য, সেখানে প্যারোলের প্রশ্ন কেন আসছে, সেটা আমার বোধগম্য নয়।’

১৯ এপ্রিল রাজধানীর শিল্পকলায় এক অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, সরকার এমন কোনো বেকায়দায় নেই যে আদালতে দণ্ডিত কারাবন্দী বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্তি দিতে হবে।’ 

প্যারোল ইস্যুর সঙ্গে আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই জানিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান বলেন, ‘আন্দোলন চলছে। অপেক্ষা করতে হবে গণ-অভ্যুত্থানের জন্য। যেহেতু গণতন্ত্র, আইনের শাসন নেই, অভ্যুত্থানের জন্য জনগণ অপেক্ষা করছে। সেটা দিনক্ষণ ঠিক করে হবে না। কবে হবে বলা মুশকিল। তবে হবে। কারণ সব কন্ডিশন হওয়ার মতো অবস্থায় চলে এসেছে।’

এসব বিষয় নিয়ে বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশে গেলে তার এবং বিএনপির রাজনীতির এখানেই সমাপ্তি ঘটবে। আবার অনেকে এর সঙ্গে ভিন্ন মতও প্রকাশ করছেন।

সাংবাদিক ও বিশ্লেষক বিভুরঞ্জন সরকার বলেছেন, ‘বিএনপি নেতারা প্যারোলের বিষয়টি অস্বীকার করছেন। বলছেন, প্যারোল নয়, খালেদা জিয়াকে জামিনে মুক্তি দিতে হবে। কিন্তু সরকার কেন বিএনপির আবদার মানবে? সরকার তো কোনো দিক দিয়েই কোনো চাপে নেই।’

‘তা ছাড়া বিএনপি কখনোই সরকারের কাছ থেকে কোনো দাবি আদায় করতে পারেনি। বিএনপি আন্দোলনের দল নয়। এটা এখন বিএনপিও বোঝে। বিএনপিতে গরম কথা বলার লোকের অভাব না থাকলেও রাজপথে নেমে আন্দোলন করার লোকের প্রচণ্ড অভাব। তাই বেগম জিয়ার মুক্তির দাবিতে ঘোষিত কর্মসূচিতেও দলের সবাই উপস্থিত থাকেন না, অংশ নেন না।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেছেন, প্যারোলে মুক্তি নিলে সেটা বিএনপির জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না।

তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া প্যারোলে গেলে তো উনার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের এখানেই সমাপ্তি ঘটবে। আর বিএনপি সম্পূর্ণভাবে নেতৃত্বহীন হয়ে যাবে। কারণ খালেদা জিয়াই তো বিএনপির জন্য ঐক্যের প্রতীক।’

আইন কী বলে

আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন: সাজাপ্রাপ্ত আসামির প্যারোলে মুক্তি সম্ভব কি না এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন একটি জাতীয় দৈনিককে বলেন, ‘বিশেষ ক্ষেত্রে সাজাপ্রাপ্ত আসামি, কয়েদি ও হাজতিকে সরকার প্যারোলে মুক্তি দিতে পারে। সেটি হতে পারে চিকিৎসার জন্য বা জানাজায় অংশ নিতে। সাজাপ্রাপ্ত হলে প্যারোলে মুক্তি হবে না—এ বক্তব্য সঠিক নয়। কারাবন্দী বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্ত হবেন কি না, সেটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার।’

সরকারকেও প্যারোলে মুক্তির সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথমে সময় একটা বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু পরে প্রয়োজনে তা বৃদ্ধি করা যায়। তিনি বলেন, ‘আমি একসময় ম্যাডাম খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির কথাটা বলেছিলাম। তখন বিএনপি হাইকমান্ড এটিকে সহজভাবে নেয়নি। তারা মনে করেছিলেন এটি বিএনপির রাজনীতিতে পরাজয় হবে।’

ড. শাহদীন মালিক: বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক এ প্রসঙ্গে ওই জাতীয় দৈনিকটিকে বলেন, ‘জেলকোড অনুযায়ী, কোনো আসামিকে প্যারোলে মুক্তি দেয়ার বিধান নেই। প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত। সরকার ইচ্ছা করলে কাউকে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্যারোলে মুক্তি দিতে পারে। এর আগে সেনাসমর্থিত সরকারের সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয়েছিল।’

বর্তমান সরকার চাইলে খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি দিতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পুরো বিষয়টি নির্ভর করে দু’পক্ষের সমঝোতার ওপর। বিএনপি খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি নিশ্চিত করতে চাইলে তাদেরও কিছু ছাড় দিতে হবে।’

জানা গেছে, প্যারোলে মুক্তি ছাড়া এখনই জামিনে মুক্তি পেতে হলে খালেদা জিয়াকে অন্তত চারটি মামলায় জামিন নিতে হবে। এর মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা ছাড়া বাকি মামলা দুটি ধর্মীয় উসকানি ও মানহানির। এ দুই মামলায় সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। ধর্মীয় উসকানির মামলায় ওয়ারেন্টসহ জামিন শুনানির জন্য ২৪ এপ্রিল দিন ধার্য রয়েছে। আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তির মামলায় ৩০ এপ্রিল প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।

প্যারোল ও জামিনের মধ্যে পার্থক্য কী?

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বিবিসি বাংলাকে প্যারোল এবং জামিনের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্যের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, প্যারোল ও জামিনের মধ্যে মোটাদাগে চারটি পার্থক্য রয়েছে। সেগুলো হলো—

১. আবেদনের শর্ত: জামিন হলো কেউ যদি মামলার আসামি হয়ে থাকেন বা আসামি হয়ে আটক হয়ে থাকেন তখন তিনি আদালতে জামিনের আবেদন করতে পারবেন। অন্যদিকে প্যারোল তখনই দেওয়া হয় যখন আসামি ইতোমধ্যেই আটক হয়ে কারাগারে আছেন কিন্তু বাইরে এমন কিছু ঘটল যাতে তিনি বিধি মোতাবেক প্যারোল আবেদনের যোগ্য হন তাহলে তিনি আবেদন করতে পারেন।

২. অনুমোদন: জামিন হয় আদালতের নির্দেশে, কিন্তু প্যারোল হয় প্রশাসনিক আদেশে।

৩. জিম্মা: জামিন পাওয়া ব্যক্তি বাইরে স্বাধীন থাকবেন। তিনি কোনো আদালত বা পুলিশের জিম্মায় থাকবেন না। অপরদিকে প্যারোল পাওয়া ব্যক্তি পুরো সময় পুলিশের তত্ত্বাবধানে থাকেন।

৪. হাজিরা ও জেল: জামিনে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তি নির্ধারিত দিনে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী হাজিরা দেন। আর প্যারোল পাওয়া ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময় পর পুলিশ কারাগারে নিয়ে আসবে।

উদাহরণ দিয়ে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘ধরুন নিকটাত্মীয় কেউ মারা গেলে একজন বন্দী প্যারোলে মুক্তির আবেদন জানাতে পারেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনুমোদন করলে তিনি একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়ে বাইরে যাবেন, কিন্তু পুরো সময় তিনি পুলিশের কাস্টডিউতে [জিম্মায়] থাকবেন। পুলিশ তাকে স্কট করে রাখবে।’

যেকোনো বন্দী প্যারোল পেতে পারে?

মনজিল মোরসেদ জানান, যেকোনো ধরনের বন্দী, কয়েদি বা হাজতিই প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিবেচিত হতে পারেন।

‘তিনি [কোনো ব্যক্তি] যে অপরাধের কারণে বা যে ধরন বা মেয়াদের শাস্তি ভোগরতই থাকুন না কেন, সুনির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে পারেন প্যারোলে মুক্তির জন্য। ‘মন্ত্রণালয় দূরত্ব ও স্থান বিবেচনা করে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তার আবেদন মঞ্জুর করতে পারেন’, বলেন মনজিল মোরসেদ।

যেকোনো মেয়াদের বন্দী প্যারোলের সুযোগ পেতে পারে?

মনজিল মোরসেদ জানান, সাজাপ্রাপ্ত হোক আর না হোক, আটক আছেন এমন যে কেউ এমন আবেদন করতে পারেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।

প্যারোলের কোনো নির্দিষ্ট সময় আছে?

একজন আবেদনকারী কত সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি পাবেন—সেটা নির্ভর করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সরকারের ওপর।

প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে যত নীতিমালা

কোন বন্দী প্যারোল পাবেন এবং প্যারোলের আওতায় তার সময়কাল কীভাবে দেখা হবে—তা নিয়ে একটি নীতিমালা আছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের।

এ নীতিমালা অনুযায়ী, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট প্যারোল মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হবেন। এ নীতিতে থাকা অন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—

১. নিরাপত্তা ও দূরত্ব বিবেচনা করে প্যারোল মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ সময় নির্ধারণ করে দেবে।

২. নিকট আত্মীয় যেমন বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, সন্তান, আপন ভাই-বোন মারা গেলে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যায়।

৩. আদালতের আদেশ বা সরকারের বিশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনসাপেক্ষে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাবে।

৪. প্যারোলে মুক্তি পেলেও সার্বক্ষণিক পুলিশ পাহারায় থাকতে হবে।

৫. কারাগারের ফটক থেকে প্যারোলে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিকে পুলিশ বুঝে নেওয়ার পর নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই কারাগারে ফেরত দিতে হবে।

প্রিয় সংবাদ/কামরুল/আজাদ চৌধুরী

আরো পড়ুন