প্রতীকী ছবি

অ্যাপের মাধ্যমে কল সেবা: কী ভাবছেন খাত সংশ্লিষ্টরা

রাকিবুল হাসান
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৯ মার্চ ২০১৯, ১৪:৫৭
আপডেট: ২৯ মার্চ ২০১৯, ১৪:৫৭

(প্রিয়.কম) দেশে পরিধি বাড়ছে ইন্টারনেট প্রটোকল টেলিফোন সার্ভিস প্রোভাইডারদের (আইপিটিএসপি) অ্যাপের মাধ্যমে ভয়েস কল সেবাদানের। ফলে অ্যাপের মাধ্যমে মাসে মাসে কথা বলার মিনিটের হিসাবও বেড়ে যাচ্ছে। অ্যাপের মাধ্যমে কল করার এই সেবাকে নিজেদের জন্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন টেলিকম অপারেটররা। বিপরীতে আইপিটিএসপি অপারেটররা বলছেন, এই সেবা টেলিকম অপারেটরদের ঝুঁকি নয়, সহযোগিতা করবে।

সম্প্রতি ১৪টি শর্তের বিপরীতে দেশব্যাপী লাইসেন্সভুক্ত আইপিটিএসপি অপারেটরদের অ্যাপের মাধ্যমে ভয়েস কল সেবাদানের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। বিটিআরসির এমন সিদ্ধান্ত ভাবিয়ে তুলেছে মোবাইল অপারেটরদের।

দেশে থাকা আইপিটিএসপি এবং মোবাইল অপারেটরদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এমন ভাবনার কথা জানা যায়।

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট ৪১টি প্রতিষ্ঠানের আইপিটিএসপি লাইসেন্স রয়েছে। এর মধ্যে দেশব্যাপী সেবাদানের লাইসেন্স রয়েছে ৩৩ প্রতিষ্ঠানের এবং পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে অ্যাপের ভয়েস কল সেবাদানের অনুমোদন দিয়েছে বিটিআরসি। গত বছরের ডিসেম্বরে বিডিকম অনলাইন লিমিটেড, আম্বার আইটি লিমিটেড, মেট্রোনেট বাংলাদেশ, লিংক থ্রি টেকনোলজিস ও চলতি মাসে আইসিসি কমিউনিকেশনস লিমিটেড অনুমোদন পায়।

মোবাইল অপারেটরগুলোর দাবি, বর্তমানে ভয়েস কলের বাজার নিম্নমুখী। প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় বড় বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। এর মাঝখানে আইপিটিএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে ভয়েস কলে লোকসানে থাকতে হতে পারে তাদের।

তারা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার এ সিদ্ধান্তের ফলে এখন অ্যাপের মাধ্যমেই মোবাইল ফোনে ভয়েস কল করার সুবিধা পাবেন গ্রাহকেরা। হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবারের মতো ওভার দ্য টপ (ওটিটি) সেবার কারণে গত কয়েকবছর ধরে মোবাইল ফোনের ভয়েস কলের পরিমাণ নিম্নমুখী, যদিও এ সেবাগুলো শুধু অ্যাপভিত্তিক কলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

মোবাইল অপারেটরগুলোর দাবি, আইপিটিএসপির মাধ্যমে এখন মোবাইল ফোনে কল করার সুবিধা দেওয়া হলে তা স্বাভাবিকভাবেই মোবাইল অপারেটরদের ভয়েস কল রেভিনিউয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

দেশের শীর্ষ এক মোবাইল অপারেটর জানিয়েছে, মোবাইল ফোনের ভয়েস কল সেবার মানদণ্ড (কিউওএস) আছে, কিন্তু আইপিটিএসপি বা ওটিটি ভয়েস কলের কোনো কিউওএস নেই। এর ফলে গ্রাহকেরা কী মানের সেবা পাবেন, সেটির কোনো নিশ্চয়তা এখানে নেই।

অপারেটরটির দাবি, মোবাইল অপারেটররা হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে নেটওয়ার্ক তৈরি করে। আবার থ্রিজি, ফোরজি, ফাইভজির মতো নতুন প্রযুক্তির জন্যও তাদের বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়। এত অর্থ ব্যয়ে তৈরি নেটওয়ার্কের সঙ্গে সেবা প্রদানের জন্য মোবাইল ফোন অপারেটরদের বেতার তরঙ্গ, লাইসেন্স ফি, গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিত (কেওয়াইসি) করতেও বিনিয়োগ করতে হয়। এসবের কোনোকিছু না করেই আইপিটিএসপি অপারেটরদের এভাবে ভয়েস কল সেবা প্রদানের সুযোগ দেওয়া হলে তা বাজারব্যবস্থায় অসম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করবে। বাজারে এ ধরনের অসম অবস্থা থাকলে ফাইভজির মতো ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা তাদের জন্য কঠিন হবে।

এর ফলে মোবাইল অপারেটরদের ডমেসটিক ভয়েস কল ব্যবসায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। শুধু তাই নয়, ভয়েস কল থেকে অপারেটরদের আয় কমে গেলে তা সরকারের রাজস্ব আয়েও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছে তারা।

দেশের আইএসপি অপারেটররাই মূলত আইপিটিএসপি সেবা প্রদানের লাইসেন্স পেয়েছে। লাইসেন্সের শর্ত অনুসারে, তাদের সেবার প্রকৃতি ফিক্সড আইপিভিত্তিক (ইন্টারনেট প্রটোকল) হওয়ার কথা থাকলেও আইপিটিএসপির মাধ্যমে তারা ডাইন্যামিক আইপি তৈরির মাধ্যমে সেবা দিতে পারবে, যা নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও জানায় একটি মোবাইল অপারেটর।

অপরদিকে আইপিটিএসপি অপারেটরদের দাবি, তারা বাজারে না থাকলেও ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা ভাইবারের মতো সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে ইতোমধ্যে ভয়েস কল কমে যাওয়ার রিক্স রয়েছে মোবাইল অপারেটরদের। ফলে তাদের এই অ্যাপ মোবাইল অপারেটরদের ডাটা সার্ভিস বিক্রিতে সহায়ক হবে।

অ্যাপের মাধ্যমে ভয়েস সেবা দিতে যাচ্ছে—এমন একটি আইপিটিএসপি অপারেটরের নীতিনির্ধারকের মতে, বর্তমানে হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, মেসেঞ্জারের মাধ্যমে কল করা যাচ্ছে। ফলে কল কমে যাওয়ার ঝুঁকি ইতোমধ্যে অপারেটরগুলোর মধ্যে রয়েছে।

তিনি বলেন, ইন্টারন্যাশনাল ট্রেন্ডের দিকে দেখলে দেখা যাবে, ভয়েস কল নিচের দিকে নামছে আর ডাটা সার্ভিস উপরের দিকে যাচ্ছে বা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে টেলিকম অপারেটরগুলো তাদের ইনফ্রাসট্রেকচার পরিবর্তন করে ফেলছে।

তার মতে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেন্ডকে ফলো করে থ্রিজি থেকে ফোরজিতে চলে আসছে মোবাইল অপারেটরগুলো। অর্থাৎ তাদের যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হচ্ছে। এখন ফাইভজি আসার পথে অর্থাৎ সবাই ডাটা সার্ভিসের দিকে নজর দিচ্ছে। এখন যদি কোনো অ্যাপ্লিকেশনই না থাকে তাহলে ডাটা সার্ভিস দিয়ে কি হবে?

ডাটা সার্ভিসকে আরও ভায়োবল করতে গেলে এই ধরনের অ্যাপভিত্তিক সার্ভিসের প্রয়োজন বলে মনে করছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা।

তাদের মতে, আইপিটিএসপি অপারেটরদের বিজনেস থ্রেট ভাবার সুযোগ নেই। কারণ টেলিকম অপারেটরদের যে নতুন বিজনেস পরিকল্পনা আসছে সেগুলোর সহায়ক হিসেবে কাজ করবে এই অ্যাপ্লিকেশনগুলো।

সমাধানের পথ হিসেবে একটি মোবাইল অপারেটর জানিয়েছে, আইপিটিএসপি অপারেটররা মোবাইল অপারেটরদের অবকাঠামো ব্যবহার করে এ সেবা দেবে, তাই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে।

অপরদিকে আইপিটিএসপি একটি অপারেটর জানিয়েছে, এই খাতে লেভেল প্লেইং ফিল্ডের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে অপর একটি আইপিটিএসপি অপারেটর জানিয়েছে, তাদের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য ৫ কোটি টাকা জামানতের বিষয়টি শিথিল করা প্রয়োজন। কারণ আইপিটিএসপি গাইডলাইনের ২ অনুচ্ছেদে এই খাতে তরুণ উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে এগিয়ে আসার কথা বলা হলেও ৫ কোটি টাকা জামানতের বিষয়টি অনেক উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন হতে পারে।

এদিকে আইপিটিএসপি অপারেটর ও মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে চলমান এই সংকট দূর করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে কিনা জানতে বিটিআরসি চেয়ারম্যান জহুরুল হকের সঙ্গে কয়েকদিন মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। তিনি প্রতিবারই ব্যস্ত রয়েছেন জানিয়ে আর কোনো কথা বলেননি।

প্রিয় প্রযুক্তি/রিমন

আরো পড়ুন