ছবি সংগৃহীত

যৌথ প্রযোজনায় কতটুকু লাভবান হচ্ছে বাংলাদেশ?

mithu haldar
লেখক
প্রকাশিত: ১১ মার্চ ২০১৬, ১৫:৩১
আপডেট: ১১ মার্চ ২০১৬, ১৫:৩১

ছবি:সংগৃহীত।

(প্রিয়.কম) বাংলা সিনেমার ‘মানোন্নয়নের’ জন্য বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মাণ করলেও বিতর্ক ছাড়ছে না বিষয়টিকে ঘিরে। চলচ্চিত্র অঙ্গনে এই বিষয়কে নিয়ে নানা রকমের আলোচনা কিংবা ‘গুঞ্জন’ ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে। চলচ্চিত্র শিল্পের একপক্ষের দাবি যৌথপ্রযোজনা বাংলা সিনেমার জন্য দরকারি, অন্যপক্ষের মন্তব্য এতে আমরা ‘শিল্পগুণের’ নিজস্বতা হারাচ্ছি। সব মিলে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন, যৌথ প্রযোজনায় কতটুকু লাভবান হচ্ছে বাংলাদেশ?

১৯৭৩ সাল থেকে যৌথ প্রযোজনার সিনেমা নির্মাণ শুরু হলেও এর নীতিমালা প্রণীত হয় ১৯৮৬ সালে। সেই নীতিমালার সংশোধিত রূপ প্রকাশ পায় ২০১২ তে এসে। তবে নীতিমালা নিয়েও সমসাময়িক অনেক প্রশ্ন রয়েই গেছে এই শিল্প মহলে।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ‘ধীরে বহে মেঘনা’র পর যৌথ প্রযোজনার চল শুরু হয়। ১৯৭৩ সালে থেকে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, তুরস্ক, শ্রীলংকার সঙ্গে যৌথভাবে সিনেমা নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ। ১৯৭৬ সালের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে ক্রমেই পুঁজি সঙ্কটের মুখোমুখি হতে থাকে ঢাকাই সিনেমার প্রযোজকরা। সে সময়ে বাংলাদেশে আসতে শুরু করেন ভারত-নেপাল-পাকিস্তান-শ্রীলংকা-তুরস্কের চলচ্চিত্র প্রযোজকরা। ১৯৭৬ সাল ১৯৮৩ সাল অবধি কোনো যৌথ প্রযোজনার সিনেমা নির্মিত হয়নি। তবে বিদেশি প্রযোজকদের ‘আনাগোনায় বেশ মুখরিত’ হয়ে ওঠে চলচ্চিত্রাঙ্গন।

এরপর আবার ২০১৪ সালে বাংলাদেশের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে যৌথপ্রযোজনায় চলচ্চিত্র নির্মিত হলে বিষয়টি আবার আলোচনার ‘টক অব দ্য টপিকে’ পরিণত হয়। দুই দেশের মধ্যে যৌথ প্রযোজনার কথা বলা হলেও মূলত কলকাতার সঙ্গেই বাংলাদেশের কিছু নির্মাতা মিলেমিশে যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মাণ করছেন।
কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশি নির্মাতারা কাজের ক্ষেত্রে কতটুকু মেধা প্রয়োগ করার সুযোগ পান? এ বিষয়ে কয়েকজন পরিচালক মন্তব্য করতে রাজি না হলেও কথা হয়েছে যৌথ প্রযোজনায় কাজ করছেন জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীর সঙ্গে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া ও কলকাতার এসকে মুভিজের সাথে মিলিত হয়ে যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মাণ শুরু করে। এ প্রতিষ্ঠান থেকে একে একে নির্মিত হয় ‘রোমিও জুলিয়েট’, ‘আশিকী’, ‘অগ্নি-২’, ‘অঙ্গার’ এবং সর্বশেষ ‘হিরো-৪২০’। এছাড়া কিবরিয়া ফিল্মস নামের আরও একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বিদ্যা সিনহা মিম ও কলকাতার সোহমকে নিয়ে নির্মাণ করে ‘ব্ল্যাক’ নামের একটি ছবি।

যৌথ প্রযোজনায় এসব ছবি নির্মিত হলেও এ ছবির কোনোটিরই কলকাতার প্রচারণায় বাংলাদেশের নাম ব্যবহার করা হয়নি এমন অভিযোগ করা হয়। ব্ল্যাক নিয়ে অবশ্য বাংলাদেশের প্রযোজক কলকাতার আদালতে আইনি লড়াই করলেও তিনি হেরে যান। শুধু তাই নয়, জাজ থেকে নির্মিত ছবিগুলোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশেও ব্যাপক আকারে তথ্য গোপন করা হয়েছে। এমন অভিযোগ নানা সময়ে উঠেছে।

গত দুই বছরে যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত সিনেমার ‘বিশ্লেষণ’ করলে এমন অভিযোগের বিষয়গুলো আরও খোলাসা হবে। সেসব ছবিতে নামমাত্র বাংলাদেশের একজন কিংবা দু’জন অভিনয় শিল্পী নেওয়া হলেও বেশিরভাগ শিল্পীই কলকাতার। আর বাংলাদেশের সঙ্গে ‘প্রতারণার’ এই সুযোগটা তৈরি করে দিচ্ছে এদেশেরই কয়েকজন ‘অসাধু’ নির্মাতা ও প্রযোজক।

এ প্রসঙ্গে নাম না প্রকাশ করার শর্তে দেশীয় কয়েকজন চলচ্চিত্র নির্মাতা বলেন, ‘যৌথ প্রযোজনার আড়ালে মূলত বাংলাদেশের সিনেমা শিল্পকে ‘ধ্বংস’ করে ভারতীয় তথা কলকাতার চলচ্চিত্রের বাজার চাঙা করে দিতেই এমন আয়োজন চলছে।’

সম্প্রতি বাংলাদেশের জনপ্রিয় নির্মাতা মোস্তফা সারওয়ার ফারুকী রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলে একটি ছবির মহরত অনুষ্ঠানে যৌথ প্রযোজনা নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি বহুদিন ধরে একটি কথা নানাভাবে বলার চেষ্টার করছি। যার ঠিক ব্যাখ্যা খুব অল্প হয়েছে। অপব্যাখ্যা বেশি হয়েছে। আমি মনে করি বাস্তবতা হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায় আপনি যদি সিনেমা নির্মাণ করতে চান তাহলে বাংলা ছাড়াও অন্যান্য যেসব ভাষা রয়েছে এই ভাষাগুলোর মধ্যে, যেমন আমি বাংলা ভাষার কথা যদি ধরি, তাহলে পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে প্রচুর মানুষ বাংলায় কথা বলে। এখানে একটি কমন মার্কেট দরকার।’

তিনি আরো বলেন, ‘আর কমন মার্কেটের একটি মাত্র সমাধান আমি সব সময় দেখি এবং সব সময় যেটা বলেছি তা হলো যৌথ প্রযোজনায় সিনেমা নির্মাণ। সিনেমা বিনিময় কোনো টেকসই পদ্ধতি নয়। কর কাঠামো ঠিক না করে, নীতিমালা ঠিক না হলে সিনেমা আমাদানি-রপ্তানী করাও টেকসই না। একমাত্র টেকসই পদ্ধতি হচ্ছে যৌথ প্রযোজনা।’

সম্প্রতি বড় বাজেটের যৌথ প্রযোজনার একটি ছবিতে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন শাকিব খান। এ বিষয়ে বেশ কিছু দিন আগে তার বক্তব্য ছিল ‘যৌথ প্রযোজনাতে যে খুব লাভ হবে দুদেশের ইন্ডাস্ট্রির, আমি তা মনে করি না।’ তবে সম্প্রতি যৌথ প্রযোজনার একটি ছবিতে তিনি যুক্ত হওয়ার পর পাল্টে গেছে তার সুর।

যৌথ প্রযোজনার নতুন ছবি ‘শিকারি’ ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পরে বলেছেন, ‘শিল্পী সমিতির সভাপতি হিসেবে আমার বক্তৃতায় যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা হলো সিনেমার বিনিময় নয়। আমি সিনেমা বিনিময়ের সব সময় ঘোরবিরোধী ছিলাম। এখনও আমি চাই না সিনেমা বিনিময় হোক। আমি সব সময় কিন্তু চেয়েছি যৌথ প্রযোজনা হোক।’

এখন যৌথ প্রোযোজনা সম্পর্কে শাকিবের ব্যাখ্যা, ‘কারণ যৌথ প্রযোজনার একটি সুবিধা হচ্ছে, এখানকার প্রযোজক ও ঐখানকার প্রযোজক মিলে টাকাটা কিন্তু ওয়ান প্লাস ওয়ান ইকুয়াল টু টু হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে একটি বড় বাজেটের সিনেমা তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এবং একটি বড় বাজেটের সিনেমা কিন্তু এখানকার বা ঐখানকার প্রযোজক কারো গায়েই লাগছেনা।’

তিনি আরও বলেন, ‘নিয়ম দেখার জন্য একটি কমিটি রয়েছে। কিছুদিন আগেও যৌথ প্রযোজনার অনেকগুলো সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। কাজেই সেই কমিটি তো নিয়মকানুন দেখেই সিনেমাগুলো সেন্সর দিয়েছে। আর যদি কোনো নিয়মকানুন সেখানে না মানা হয়ে থাকে তাহলে আমার মনে হয় এ প্রশ্নটা যৌথ প্রযোজনা সংশ্লিষ্ট সরকারি নীতি নির্ধারকদেরই করাই উচিত।’

অপরদিকে ঢাকাই সিনেমায় ২০১৪ সালের পর যৌথ প্রযোজনার বেশকিছু ছবিতে অভিনয় করেছেন মাহিয়া মাহি। এ বিষয়ে তার বক্তব্য হলো, ‘যৌথ প্রযোজনার ছবিতে কাজ করে তেমন আনন্দ পাওয়া যায় না। কারণ, কলকাতার মানুষদের মধ্যে আন্তরিকতা কম। বাংলাদেশের মানুষের আন্তরিকতা তাদের চেয়ে অনেক বেশি। তাই তাদের সাথে কাজ করেছি কিন্তু স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করিনি।’

এদিকে বাংলাদেশে যৌথ প্রযোজনার প্রতিষ্ঠান, যারা বর্তমান সময়ে যৌথ প্রযোজনায় বেশ সরব। তা হলো  জাজ মাল্টিমিডিয়া। যৌথ প্রযোজনায় বাংলাদেশের জন্য কতটুকু লাভবান হচ্ছে এমন প্রশ্নের বিষয়ে জাজ মাল্টিমিডিয়ার সত্বাধীকারী আব্দুল আজিজের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে তিনি এখন চীনে রয়েছেন। এরপর তার সাথে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো প্রতিউত্তর দেননি।