(প্রিয়.কম) মঙ্গলবার মধ্যরাত। গুলশানে অবস্থিত এলএম এরিকসন বাংলাদেশ লিমিটেডের কার্যালয়ে গিয়ে হাজির হই কয়েকজন সাংবাদিক। নিচের ফ্লোরে দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা কর্মীরা জানালেন পুলিশের অনুমতি ছাড়া বহিরাগত কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন না। অনেক অনুরোধ করেও ভেতরে প্রবেশের অনুমতি মিলল না। ফলে বাধ্য হয়ে ভবনটির তৃতীয় তলায় গণঅনশন করা কর্মীদের ফোন করে নিচে আসতে অনুরোধ করি। 

সাংবাদিক এসেছেন জেনে এরিকসন এমপ্লয়ীজ ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান আনন্দ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানসহ বেশ কয়েকজন নিচে নেমে আসলেন। তাদের কারও কারও গলায় ‘দাবিনামা’ ঝুলছে। ফ্যাকাসে চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছে না। চোখে চোখ রাখলেই যেন কান্না করে দেবেন। 

তবে তাদের মধ্যে একজন কর্মী হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। তার কান্না দেখে উপস্থিত অন্যদের চোখেও জল চলে আসে। তিনি নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে সাংবাদিকদের মাধ্যমে সরকারের কাছে দাবি জানান যেন তাদের ব্যাপারে একটি ইতিবাচক সমাধান হয়। চাকরিতে পুনরায় যোগদান বা চাকরি করতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা দেওয়ার দাবি জানান তিনি। 

এরিকসনের বর্তমান পরিস্থিতি জানতে চাইলে লুৎফর রহমান আনন্দ প্রিয়.কম-কে বলেন, সোমবার সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া এই গণঅনশনে ৬২ জন কর্মী অংশ নিলেও নিয়মিতভাবে সেখানে থাকছেন ৫০ জন কর্মী। ইতোমধ্যে মঙ্গলবার দুপুরে এরিকসনের ফিল্ড সার্ভিসিং ইঞ্জিনিয়ার বিভাগের কর্মী জাকারিয়া জামান ও শফিকুর রহমান অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের গুলশান-২ এলাকায় অবস্থিত শাহাবুদ্দিন মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। আরও দুইজন কর্মী গুরুত্বর অসুস্থ অবস্থাতেই গণঅনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। 

গণঅনশন চালিয়ে যাচ্ছেন এরিকসন কর্মীরা। ছবি: প্রিয়.কম

লুৎফর রহমানের সাথে আরও কয়েকজন কর্মী গলা মিলিয়ে বললেন, আমাদের হঠাৎ করে এখন কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা যাবই বা কেন? এখানে আমাদের অনেক ন্যায্য অধিকার রয়েছে। আমরা অসুস্থ হয়ে মরে যাব; কিন্তু গণঅনশন থেকে পিছ-পা হবো না। আমাদের বৃদ্ধ অসুস্থ বাবা-মা কিংবা সন্তানের দিকে তাকালে সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে যাই। তাই দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে এরিকসনের গণঅনশনে অংশ নিয়েছি। 

কর্মীরা জানালেন, গণঅনশনে অংশ নেওয়া কর্মীদের সাথে মঙ্গলবার স্কাইপিতে কথা বলার জন্য রাজি হন এরিকসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। অজ্ঞাত স্থান থেকে এরিকসন বাংলাদেশের এক্টিং কান্ট্রি ডিরেকটর আবদুস সালামসহ মোট তিনজন শীর্ষ কর্মকর্তা স্কাইপিতে অংশ নিয়ে কর্মীদের গণঅনশন বন্ধ করে বাসায় বসে কাজ করার অনুরোধ করেন। কর্তারা জানান, খুব দ্রুত তাদের বিষয়ে একটি সমাধান হবে। তবে এর আগেও তারা দুইবার একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কারণে এবার কর্মীরা তাদের কথায় গলেননি। 

কর্মীরা জানালেন, সুইডেনভিত্তিক বহুজাতিক এই কোম্পানিটিতে গণঅনশনের বিষয়টি শুরু হওয়ার পরদিন মঙ্গলবার সকালে ডিজিএফআই (ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স) ও এনএসআই (জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা) থেকে লোক এসেছিল। তারা কর্মীদের খোঁজ খবর নিয়েছেন। 

এরিকসনের মূল ফটকে প্রবেশের আগেই চোখে পড়বে এই চিত্র। ছবি: প্রিয়.কম

প্রতিষ্ঠানটির নিচ তলায় ঘুরে দেখা গেল, এরিকসনের বিশাল বড় ব্যানারের ওপর কর্মীদের নানান দাবীর পক্ষে স্লোগান লেখা রয়েছে। সাদা কাগজে লেখা স্লোগানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ফলো লেবার ল’, ‘নো মোর টার্মিনেশন’, ‘স্টপ টার্মিনেশন’, ‘ফাইট ফর রাইটস’, ‘ডিক্লিয়ার ভিআরএস’, ‘ইলিগ্যাল টার্মিনেশন ইজ নট একসেপ্টেবল’ ইত্যাদি। 

প্রসঙ্গত, গত ১৮ আগস্ট বিনা নোটিশে এবং কোনোরকম বাড়তি সুবিধা ছাড়াই ই-মেইলের মাধ্যমে প্রায় ৬২ জন কর্মীকে চাকরিচ্যুত করে এরিকসন বাংলাদেশ। যার মধ্যে ৫০ জনই আবেদনকৃত এরিকসন এমপ্লজীজ ইউনিয়নের সদস্য। কর্মীদের দাবি, যদি চাকরিচ্যুত করতেই হয় তবে টেলিকম অপারেটরদের মতো তাদেরকেও স্বেচ্ছায় অবসর প্রকল্পের আওতায় (ভলেন্টারি রিটায়ারমেন্ট স্কিমে - ভিআরএস) সুবিধা দিতে হবে। 

প্রিয় টেক/আশরাফ