(প্রিয়.কম) বিশ্বব্যাপি আলোচনার ঝড় উঠেছে। বিশ্বমিডিয়ার টক অব দ্য উইক এখন এই বিষয়টি। কি সেই বিষয়? বিষয়টি হলো- ৪৭ বছরের ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটছে সিঙ্গাপুরে। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর বিশ্বের উন্নয়নশীল অন্যতম রাষ্ট্র সিঙ্গাপুরে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন একজন মুসলিম নারী। প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট, সেই সঙ্গে প্রথম মুসলিম নারী রাষ্ট্রপতি। হালিমা ইয়াকুব- তার পুরো নাম হালিমা বিনতে ইয়াকুব।

দীর্ঘদিন যাবত সিঙ্গাপুরে অবস্থানকারী এবং সিঙ্গাপুরের রাজনীতির সাথে বহুকাল ধরে জড়িত এই নারীকে নিয়ে কূটনৈতিকপাড়াসহ বিশ্বমোঘলদের টেবিল এখন আলোচনামূখর। প্রশ্ন একটাই- কে এই হিজাবি মুসলিম নারী হালিমা? কী তার নেপথ্য পরিচয়? এবং কীভাবেই বা আজকের এই অবস্থানে অধিষ্ঠিত তিনি?

গত ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ বুধবার সিঙ্গাপুরের নির্বাচন বিভাগ (ইএলডি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার তালিকাতে থাকা অন্য দুই প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করার মাধ্যমে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে হালিমা ইয়াকুবের নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি এখন শতভাগ নিশ্চিত। আরো কোনো বাধা বা কোনো সমস্যা নেই এই প্রক্রিয়ায়। খবর রয়টার্স ও স্ট্রেইটস টাইমসের। এছাড়া প্রায় সব বিশ্বমিডিয়াই কভার করেছে স্টোরিটি।

বাধা বা সমস্যা নেই কিন্তু প্রশ্ন কিন্তু রয়ে গেছে সেই আগেরটাই। কী প্রশ্ন? প্রশ্ন হলো- কে এই হিজাবি মুসলিম নারী হালিমা? কী তার নেপথ্য পরিচয়? এবং কীভাবেই বা আজকের এই অবস্থানে অধিষ্ঠিত তিনি?

প্রশ্নকারীরাসহ মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষ হালিমা ইয়াকুবের জীবনীতথ্য জানা প্রয়োজন। শিক্ষণীয় এবং উৎসাহ জাগানিয়া অনেক তথ্য রয়েছে তার জীবন ধারায়। সামান্য একটি দরিদ্র পরিবার থেকে একটি দেশের সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থানে অধিষ্ঠিত হওয়ার নানা নেপথ্য কথন রয়েছে এই জীবনে। রয়েছে ঘাত-প্রতিঘাত আর সমস্যা সঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে চলা অটল অস্তিত্বের অধিকারীনী একজন নারীর পরিচয়।

অধিকাংশ স্কলারদের দাবি হালিমা মালয় জাতিভুক্ত এবং মালয় জাতিভুক্ত হিসেবেই সংরক্ষণ নীতির আওতায় সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু কারো দাবি ভারতীয় মুসলমান বাবা এবং মালয়েশিয়ান মায়ের ঘরে জন্ম নেওয়া কন্যা সন্তান হালিমা ইয়াকুব। আর মুসলিমরা যেহেতু বাবা বা পিতার বংশের হিসেবে বংশ পরম্পরা বিবেচনা করে সেহেতু হালিমা ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম নারী।

উইকিপিডিয়া বলছে, তার পুরা নাম হালিমা বিনতে ইয়াকুব। অর্থাৎ ইয়াকুব তার পিতার নাম আর তিনি ইয়াকুবের কন্যা হালিমা। কুইন স্ট্রিটে ১৯৫৪ সালের ২৩ আগস্ট তার জন্ম। তিনি একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। বাবার সূত্রে তিনি ভারতীয় বংশদ্ভুত এবং মায়ের সূত্রে মালয় বংশদ্ভুত। পরিবারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ (সবার ছোট) হালিমা। ১৯৬২ সালে তার বাবা যখন মারা যান, তখন তার বয়স মাত্র ৮ বছর। তার পিতা একজন পাহারাদার ছিলেন এবং বহু বছর ধরে অসুস্থতায় ভুগছিলেন। এরপরও তিনি জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত পরিবার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর সংসার সামলাতে মাকেও পরিশ্রম করতে হয়েছে এবং পরিবারটিকে রক্ষা করার জন্য প্রচুর পরিশ্রম করেছেন। হালিমার মা রাস্তার পাশের একটি খাবারের স্টলে কাজ করতেন। প্রতিদিন তিনি সকাল ৪টায় যেতেন এবং রাত ১০টায় ফিরতেন। ১০ বছর বয়স থেকে হালিমা স্কুলে আসা যাওয়ার পথে তার মাকে স্টলটির পরিষ্কার, বাসনপত্র ধৌতকরণ, টেবিল পরিষ্কার, কাস্টমারদের খাবার পরিবেশন প্রভৃতি কাজে সাহায্য করতেন।

প্রেসিডেন্ট টনি তান কেং ইয়ামের কাছে থেকে ২০১৬ সালের ৭ জুলাই ডক্টরেট ডিগ্রি সম্মাননা নিচ্ছেন হালিমা ইয়াকুব। ছবি : সংগৃহীত।

এরপর ১৯৭০ সালে তানজং ক্যানটং গার্লস স্কুলে এবং পরে সিঙ্গাপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি সম্পন্ন করেন হালিমা। নানা কষ্ট এবং সমস্যা আর ভোগান্তিকে নিত্যসঙ্গী করে হালিমার এই সময়গুলো কেটেছে। হালিমা তার এক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘জীবনের এই সময়গুলোতে অনেকবার নিজেকে আত্মহত্যার হাতে সঁপে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু যখনি ভেবেছি আমি একজন মুসলিম তখনি আবার ফিরে এসেছি এবং নতুন করে জীবন সাজাতে শুরু করেছি’।

১৯৭৮ সালে ন্যাশনাল ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেসে (এনটিইউসি) একজন আইন কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তার কর্মজীবন শুরু করেন। প্রায় ৩০ বছর দক্ষতা ও বিচক্ষনতার সাথে দায়িত্ব পালনের পর ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে নির্বাচিত হন হালিমা। ঠিক এই অবস্থান থেকে শুরু হয় তার নতুন পথচলা। জীবনের জন্য স্বার্থকতার জগতে প্রবেশ করার একটি উন্মুক্ত দরজা খুঁজে পান তিনি।

১৯৮০ সালে হালিমা ইয়াকুব বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু ও ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল-হাবসিকে বিয়ে করেন। বর্তমানে পাঁচ ছেলেমেয়ের জনক-জননী তারা। এরপর ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গোহ চোক টংয়ের অনুরোধে রাজনীতিতে আসেন হালিমা ইয়াকুব এবং ধারাবাহিকভাবে ৪টি সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। সবার মন জয় করে ২০১১ সালে তিনি সামাজিক উন্নয়ন, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন। এরপর ২০১৩ সালে সিঙ্গাপুরের সংসদে প্রথম নারী স্পিকার নিযুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বিশ্বময় আলোচনায় চলে আসেন এবং বিশ্বময় পরিচিতি অর্জন করেন।

এরপর ২০১৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সাধারণ নির্বাচনের দিন তিনি তার মাকে হারান। প্রচন্ড রকম আঘাত আসে হালিমার জীবনে। কারণ এই জীবনের পথচলায় তার মা-ই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। এই আঘাতকেও শক্তির উৎস হিসেবে গ্রহণ করে নতুন উদ্দোমে এগিয়ে চলেন তিনি এবং ২০১৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি সিঙ্গাপুরের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার শতভাগ নিশ্চয়তা লাভ করেন। সারা বিশ্বের মুসলিম নারী, আমি বলবো শুধু মুসলিম নারী নয়, সারা পৃথিবীর সব নারীর জন্য হালিমা ইয়াকুব একটি আদর্শের নাম। একটি আইকন। একজন মুসলিম নারীর জন্য সবচেয়ে গর্ব করার মতো বিষয় হলো- বিশ্বের সর্বাধুনিক একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানের এই স্থানে পৌঁছানোর জন্য হালিমা কখনো তার ব্যক্তি স্বত্তা এবং মুসলিম ঐতিহ্যকে বিসর্জন দেননি। তার এই আদর্শিক অবস্থান আরো একবার প্রমাণ করলো- কারো কোনো ব্যক্তি স্বত্তা বা জাতিগত আদর্শ কোনো সম্মান অর্জনের পথে অন্তরায় নয় বরং সহযোগি।  

কর্মময় জীবনের কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি স্বরুপ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছেন হালিমা ইয়াকুব। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো- ২০০১ সালে তিনি the Berita Harian/McDonald's Achiever পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৩ সালে Her World Woman of the Year Award অর্জন করেন। এছাড়া ২০১১ সালে প্রাপ্ত হন the AWARE Heroine Award।

সার্বিকভাবে নির্বাচিত হলে হালিমা ইয়াকুব হবেন সিঙ্গাপুরের অষ্টম এবং প্রথম মুসলিম নারী প্রেসিডেন্ট। তিনিই হবেন দেশটির সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিত্ব। উল্লেখ্য, সাবেক প্রেসিডেন্ট টনি তানের ৬ বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেশটির রাষ্ট্রপতি কাউন্সিলের উপদেষ্টা জে ওয়াই পিল্লাই ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সূত্র : উইকিপিডিয়া ও তার ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট হালিমাহ.এসজি

প্রিয় ইসলাম/শামীমা সীমা।