(প্রিয়.কম) পশ্চিমা বিশ্বের বহুজাতিক ‘ক্ষুধার্ত’ কোম্পানিগুলোর হাতে রাখাইন রাজ্যের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ তুলে দিতেই মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ওপর মরণ কামড় দিয়ে স্বভূমি থেকে বিতাড়ণের ‘কৌশল’ নিয়েছে বলে মনে করে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই)।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত কয়েক বছর ধরেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর ধারাবাহিকভাবে হামলা-নির্যাতন চালানো হচ্ছে, কিন্তু এখন এটা ‘জাতিগত নিধনে’র পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাতে শুধু হাজার হাজার নীরিহ সাধারণ মানুষকেই হত্যা করা হচ্ছে না উপরন্তু লাখ লাখ মানুষ যাতে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশ ও ভারতে আশ্রয় নেয় সেই ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের সেখান থেকে বিতাড়িত করার পেছনের কারণ হচ্ছে, পশ্চিমা করপোরেটের ক্ষুধা। তারা রাখাইন রাজ্যের বিপুল তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদ চুরি করতে চায়। হামলা-হত্যা-হুমকির মাধ্যমে রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের মাধ্যমে মিয়ানমানের সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক নেতারা পশ্চিমা করপোরেট গোষ্ঠীর সেই দাবিই মেটাতে চান।

বিবৃতিতে শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চির সমালোচনা করে সিপিআই সাধারণ সম্পাদক সুধারাম রেড্ডি বলেন, অবিশ্বাস্যভাবে সু চি শুধু এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থই হননি, তাঁর নীরব দর্শকের ভূমিকা সেখানে বড় ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ করে দিয়েছে।

জীবন বাঁচাতে রাখাইন থেকে নানা বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে রোহিঙ্গারা ঢুকছে বাংলাদেশে। ছবি: রয়টার্স

জীবন বাঁচাতে রাখাইন থেকে নানা বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে রোহিঙ্গারা ঢুকছে বাংলাদেশে। ছবি: রয়টার্স

সম্প্রতি ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মিয়ানমার সফর ও গণহত্যার পরও মিয়ানমারের পক্ষাবলম্বন করায় নরেন্দ্র মোদীর সমালোচনা করে বিবৃতিতে বলা হয়, সফরের সময় নরেন্দ্র মোদি এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো আলোচনা না করেই মিয়ানমার সরকারের ভাষ্যকেই সমর্থন করেছেন, যেন এটি একটি উগ্রপন্থা ও সন্ত্রাসের সমস্যা। বেশ বোঝা যায়, এতে নরেন্দ্র মোদি নিজস্ব সাম্প্রদায়িক-ভেদনীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।’

এ সময় ভারতে আশ্রিত ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগের বিরোধিতা করে সুধাকর রেড্ডি বিবৃতিতে আরো বলেন, ‘ভারতরকে এই অবস্থান পরিত্যাগ করতে হবে। স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গারা ভারতের শরণার্থীর মর্যাদায় অবস্থান করবে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগের অধিকার দিতে হবে।’

বাংলাদেশের মত মিয়ানমারও ভারতের প্রতিবেশি দেশ। ভারতের সাথে মিয়ানমারের ১৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এছাড়া ভারতে প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাস করছে যাদের ১৬ হাজার জাতিসংঘের নিবন্ধিত। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির এই বিবৃতি এমন একটি সময়ে এলো যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফর করে দেশটির পরামর্শদাতা অং সান সু চির সঙ্গে বৈঠক করে এবং রাখাইন ইস্যুতে মিয়ানমারের অবস্থানকে সমর্থন করেন

নাইপিদোতে নরেন্দ্র মোদির সাথে অং সান সুচি। ছবি: সংগৃহীত

নাইপিদোতে নরেন্দ্র মোদির সাথে অং সান সুচি। ছবি: সংগৃহীত

প্রসঙ্গত, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান ইস্যুতে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে অং সান সুচি’র গঠিত কফি আনান অ্যাডভাইজরি কমিশন গত ২৪ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে ১৯৮২ সালের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনে সংশোধন এনে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দেওয়ার সুপারিশ ছাড়াও রাখাইনে মানবিক ত্রাণসহায়তা বিতরণ ও গণমাধ্যম কর্মীদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। ওই দিন রাতেই রাখাইন বিদ্রোহী কতৃক কয়েকটি পুলিশ ফাঁড়িতে হামলার অভিযোগ তুলে দেশটির রাখাইন রাজ্যে ২৫ আগস্ট ভোর থেকে নতুন করে সেনা অভিযান শুরু হয়।

অভিযানে এখন পর্যন্ত ৪০০ জনকে হত্যা এবং ২৬০০ ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। ২৫ আগস্ট থেকে দেশটির সেনাবাহিনী ‘কিলিং অভিযান’ শুরুর পর মিয়ানমার থেকে এখন পর্যন্ত মোট কত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে তা নির্দিষ্ট করে বলেতে পারেনি কেউই। তবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর এর প্রধান ভিভিয়ান ট্যান ৮ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন আগস্ট মাস থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ২ লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে

এর আগেও, জাতিগত দ্বন্দ্বের জেরে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো একই রকম অভিযানে কয়েকশত রোহিঙ্গা নিহত হয়। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় হাজারো ঘরবাড়ি। ওই অভিযানের বর্বরতায় বাধ্য হয়ে অন্তত ৮০ হাজার রোহিঙ্গা পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে।

প্রিয় সংবাদ/কামরুল