(তাজুল ইসলাম পলাশ, কুতুপালং, কক্সবাজার) মিয়ানমারের আর্মি ও স্থানীয় বৌদ্ধ-রাখাইনদের বর্বরতার শিকার হয়ে লাখো রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছে। গত ১৪ দিনে কক্সবাজারসহ আশপাশের এলাকায় অবস্থান নিয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা নাগরিক। যে যেদিকে পারছে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছে। খালের পাড়, পাহাড়ের পাদদেশ, রাস্তার পাশে, হাসপাতাল, স্কুল-মাদ্রাসা, কমিউনিটি সেন্টারসহ কোথাও তিল ধারনের জায়গা নেই। সর্বত্র এখন রোহিঙ্গাদের অবস্থান। তাদের সঙ্গে যোগ হচ্ছে নতুন করে পালিয়ে আসা শত শত রোহিঙ্গা পরিবার। জাতিসংঘের হিসেবে এ সংখ্যা এখন ২ লাখ ৭০ হাজার।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের দুই পাশে উখিয়ার বালুখালী ঢালা এলাকায় রয়েছে ছোট ছোট অসংখ্য পাহাড়। মহাসড়ক থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরত্বের মধ্যেই ওই পাহাড়ের শুরু। আর এই পাহাড়ের পাদদেশই সীমান্তের ওপার থেকে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর হাজারো পরিবারের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের হাকিম পাড়া ও থাইংখালী এবং হোয়াইক্যং ইউনিয়নের রইক্ষ্যংয়ের পুটিবনিয়া এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে হাজারো রোহিঙ্গা পরিবার খোলা আকাশের নিচে প্লাস্টিকের কাগজ দিয়ে ছোট ছোট অসংখ্য ঘর তৈরি করে বসবাসের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সেখানেই মিয়ানমার মংডু’র বটতালা এলাকা থেকে আসা রশিদ আহমেদ সঙ্গে কথা হয়। রশিদ আহমেদ তাদের স্থানীয় ভাষায় যা বললেন তা অনকটা এ রকম- ‘অনেক কষ্ট করে পাহাড়ের উপরে থাকার চেষ্টা করছি। কী আর করব। বৌ-বাচ্চা নিয়ে কোথায়। বাজার থেকে বাঁশ কিনে এনে প্লাষ্টিক সিট দিয়ে ঘর তৈরি করেছি। কোদাল ও দা দিয়ে পাহাড়ের ঢালু সমতল করে ঘর তৈরি করেছি।’

শুধু রশিদ এরকম হাজারো রোহিঙ্গা পাহাড় কেটে ঘর তৈরি করতে দেখা গেছে। রশিদের পাশেই কিছুক্ষণ আগে একটি ছোট ঝুপড়ি ঘর নির্মাণের কাজ শেষ করেছেন মংডুর চানচিপ্রাং গ্রাম থেকে আসা মো. আবুদও রহিম। ছোট ঘরটিতে পলিথিন বিছিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তার পরিবারের নয়জন সদস্য। রহিম জানান, গত শনিবার তিনি টেকনাফের লম্বাবিল সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি বালুখালী বস্তিতে থাকা মো. ইউনুসের কাছে আশ্রয় নেন। গত বছরের অক্টোবরের সহিংসতার পর বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিলেন ইউনুস। এবার তারাও চলে এলেন বাধ্য হয়ে।

এ পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে চোখ গেলে দেখা যায়, রোহিঙ্গারা মাটি থেকে সদ্য কেটে ফেলা গাছের শেকড় তুলে একপাশে জড়ো করছেন। তারপর সারিবদ্ধভাবে কাজে মনোযোগ দিয়ে কোদাল দিয়ে পাহাড় সমতল করছে তারা। তারপর পলিথিন ও বাঁশ দিয়ে তৈরি করছেন ঝুপড়ি ঘর। মংডুর তুলাতলী গ্রাম থেকে আসা মো. জুবায়ের (২৪), ডিয়লডলি গ্রাম থেকে আসা শফি উল্লাহ (৩৪), আইয়ুবচর গ্রাম থেকে আসা ওমর মাহাদি (৬৫)সহ অনেকের সঙ্গে কথা হলে তারা সবাই একই ধরনের কথা বলেন।

স্থানীয়রা জানান, পাহাড়গুলোতে গত দুই দিনে অন্তত ২০ হাজার রোহিঙ্গা পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে পাহাড় কাটার। পাহাড় কেটে সমতল করে নির্মাণ করা হচ্ছে বসতি। পাহাড়ের সঙ্গে ছোট-বড় অসংখ্য গাছ পালাও কাটা হচ্ছে।

জানতে চাইলে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আলী কবির জানান, তাদের বিষয়টি নজরে আসলেও মানবিক দিক বিবেচনা করে তেমন কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ইতোমধ্য ছয়টি স্থানে রোহিঙ্গারা অবস্থান নিয়েছে। পাহাড়ের অধিকাংশ জায়গা এখন তাদের দখলে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা ইতোমধ্যে নতুন করে ৪০০ একরের বেশি পাহাড়ি বনভূমি দখল করে নিয়েছে। ওই স্থানগুলো হলো- টেকনাফের রইক্ষ্যংয়ের পুটিবনিয়া, উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী ঢালার মুখ, হাকিম পাড়া ও থাইংখালী।

এ ছাড়াও উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালংয়ের অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা বস্তির পাশে এবং পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালীর পানের ছড়া এলাকার অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা বস্তির পাশের আরও কিছু নতুন বসতি গড়ে উঠেছে।

প্রিয় সংবাদ/কামরুল