(প্রিয়.কম) গ্রামে গ্রামে হামলা করে পালাতে থাকা রোহিঙ্গাদের হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে হত্যা করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র ভিভিয়ান ট্যান সম্প্রতি কাতারভিত্তিক টিভি চ্যানেল আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানান। 

ভিভিয়ান ট্যান বলেন, ‘বেঁচে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা প্রায় সবাই বলছে, আমাদের ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, আমাদের সবকিছু পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গারা জানান, হেলিকপ্টার তাদের গ্রামের আকাশে চক্কর দিতে থাকে। হেলিকপ্টার থেকে কিছু ছুড়ে মারা হয়। গুলিও ছোড়া হয়।’

ইউএনএইচসিআর এর বাংলাদেশ প্রধান ভিভিয়ান ট্যান। ছবি: সংগৃহীত

ইউএনএইচসিআর এর বাংলাদেশ প্রধান ভিভিয়ান ট্যান। ছবি: সংগৃহীত

রোহিঙ্গারা কীভাবে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা কয়েক দিন ধরে হেঁটেছেন। অনেকে সর্বনিম্ন তিন দিন সর্বোচ্চ নয় দিন পর্যন্ত হেঁটেছেন। জঙ্গলে-পাহাড়ে লুকিয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন তারা। তবে এই কঠিন সময়ে পরস্পরকে সাহায্য করছেন সবাই। এমনকি পথে সন্তানের জন্ম হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে।’

ভিভিয়ান ট্যান বলেন, ‘কয়েক দিন আগে আমি শ্যামলাপুর সীমান্ত থেকে সাত কিলোমিটার দূরে একটি সাগরতীর এলাকায় গিয়ে একটি রোহিঙ্গা পরিবার পেয়েছিলাম, যারা একটি শিশুসহ জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল। সম্প্রতি টেকনাফের নয়াপাড়া শিবিরে এক বাবার সঙ্গে দেখা হয়। ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। খুবই চিন্তিত দেখাচ্ছিল তাকে। সেখানে একটি ঝুড়িতে কম্বলে মোড়ানো দুটি শিশু দেখতে পেলাম। তিনি জানান, কিছুক্ষণ আগে জন্মেছে তার যমজ এই শিশু দুটি।’

রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সেনানির্যাতন শুরু হওয়ার পর জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা একটি অস্থায়ী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। ছবিটি ৩০ আগস্ট তোলা। ছবি: এএফপি

রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সেনানির্যাতন শুরু হওয়ার পর জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা একটি অস্থায়ী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। ছবিটি ৩০ আগস্ট তোলা। ছবি: এএফপি

রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিরগুলোর অবস্থা কেমন জানতে চাইলে ইউএনএইচসিআর’র মুখপাত্র বলেন, ‘সংঘাতে পরিবারকে হারিয়েছে বা পালিয়ে আসার সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে অনেক শিশু। কোনো কোনো শিশু আবার আত্মীয়দের সাথে রয়েছেন। স্বেচ্ছাসেবী ও এনজিওর সঙ্গে মিলে আমরা অনেক চেষ্টা করছি তাদের চিহ্নিত করতে বিশেষ করে তাদেরকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে। শিবিরে পুষ্টিহীনতায় ভোগা শিশুও রয়েছে। ওইসব শিশুদের দেখলে প্রচণ্ড কষ্ট হয় যে, তারা সহিংসতার জন্যই নয় বরং অনেক আগে থেকেই উপযুক্ত খাবারের অভাবে পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন।’

প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গা একটি নৃগোষ্ঠীর নাম যাদের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ ইসলাম ও ১০ ভাগ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। রোহিঙ্গাদের আদি আবাসস্থল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। শত শত বছর ধরে রাজ্যটিতে বাস করা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি না দিয়ে মিয়ানমার সরকার এ জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালাচ্ছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ২৫ আগস্ট থেকে নতুন করে সেনা অভিযান শুরু হয়। এ অভিযানে এখন পর্যন্ত ৪০০ জনকে হত্যা এবং ২৬০০ ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে দেশটির সেনাবাহিনী।

এর আগে, জাতিগত দ্বন্দ্বের জেরে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো একই রকম অভিযানে কয়েকশত রোহিঙ্গা নিহত হয়। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় হাজারো ঘরবাড়ি। ওই অভিযানের বর্বরতায় বাধ্য হয়ে অন্তত ৮০ হাজার রোহিঙ্গা পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে।

২৫ আগস্ট থেকে দেশটির সেনাবাহিনী ‘কিলিং অভিযান’ শুরুর পর মিয়ানমার থেকে এখন পর্যন্ত মোট কত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে তা নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশ মুখপাত্র ভিভিয়ান ট্যান জানান, আগস্ট মাস থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ২ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে

প্রিয় সংবাদ/রিমন