(প্রিয়.কম) মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ২৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা নিধন অভিযানের শেষ হওয়ার কোনো বার্তা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। মাত্র ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে বিতাড়িত করতে সেনাবাহিনী লেলিয়ে দিয়েছে দেশটি, যারা সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর চালিয়ে যাচ্ছে গণহত্যা, পাশবিক সংবদ্ধ ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ আর অবর্ণনীয় নির্মম নির্যাতন। ওই রাজ্যে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ ও তার সুরক্ষা দিতেই সংখ্যাগুরু ও জাতি বিদ্বেষী বার্মিজ শাসকগোষ্ঠী রোহিঙ্গা নিধন অভিযান ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ শুরু করেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে।

পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গাদের ঘর-বাড়ি। ছবিটি ৭ সেপ্টেম্বর রাখাইন থেকে তোলা। ছবি: এএফপি

পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গাদের ঘর-বাড়ি। ছবিটি ৭ সেপ্টেম্বর রাখাইন থেকে তোলা। ছবি: এএফপি

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়াল গণহত্যা-ধর্ষণ-লুণ্ঠন-অগ্নিসংযোগে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গা জনস্রোত বৃদ্বি পাচ্ছে অস্বাভাবিকভাবে। জাতিসংঘ ধারণা করছে, গণহত্যার হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে অন্তত ৩ লাখ রোহিঙ্গা আসতে পারে বাংলাদেশে। এমনিতেই অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও শরণার্থীর ভারে ধুঁকছে বাংলাদেশ। তার ওপর নতুন করে আরও এ বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর সংস্থান কীভাবে করবে, তা নিয়েও ভয়াবহ দুঃশ্চিন্তায় রয়েছে বাংলাদেশের সরকার।

রোহিঙ্গা হত্যার পক্ষে আবারও সুচি’র সাফাই

দুই সপ্তাহব্যাপী রাখাইন রাজ্যে চলমান গণহত্যাকে উপেক্ষা করে দ্বিতীয় দিনের মতো সাফাই গেয়েছেন মিয়ানমারের গণতন্ত্রীপন্থী নেত্রী ও রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সুচি। একটি টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাখাইনে প্রত্যেককে রক্ষায় সরকার সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ভারতীয় এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সুচি বলেন, ‘আমাদের নাগরিকদের দেখভাল আমাদের করতে হবে, যারা আমাদের দেশে আছে, তাদের প্রত্যেকের দেখভাল আমাদের করতে হবে, তারা আমাদের নাগরিক হোক বা নাই হোক।’

অং সান সুচি। ফাইল ছবি

অং সান সুচি। ফাইল ছবি

টেলিভিশনটিকে সুচি বলেন, কাশ্মির ইস্যুতে ভারত যে ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে, আমরা ঠিক একই রকম সমস্যায় পড়েছি। আমরা আমাদের নিরপরাধ নাগরিকদের রক্ষার চেষ্টা করছি। আমাদের সম্পদ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তারপরও আমরা সবার জন্য সর্বোচ্চটা করার এবং আইনানুযায়ী সবাইক নিরাপত্তা সুরক্ষা দেয়ার চেষ্টা করছি।

মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর সুচি এর আগেও ৬ সেপ্টেম্বর বুধবারও এক বিবৃতিতে দাবি করেছিলেন, রাখাইন রাজ্যে সবার নিরাপত্তাবিধান করা হচ্ছে! প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে তার দেওয়া এ বিবৃতির বিষয়ে বিশ্বনেতাদের অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করে তার কঠোর সমালোচনা করেন। তারপরও দ্বিতীয়বারের মতো সুচি একই কথার পুনরাবৃত্তি করলেন যা, দীর্ঘ মেয়াদে সহিংসতা চলবে এমনই ইঙ্গিত দেয়। 

নাগরিকত্বের প্রমাণ ছাড়া কাউকে ফেরত না নেওয়ার ঘোষণা

রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার ঘটনায় পালিয়ে বাংলাদেশে আসা লোকজনকে নাগরিকত্বের প্রমাণ ছাড়া ফেরত নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে মিয়ানমার। ৬ সেপ্টেম্বর বুধবার স্টেট কাউন্সেলর অং সান সুচির অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনে মিয়ানমারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) ইউ থং তুন এ কথা জানান। প্রকৃতপক্ষে এ ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত নেওয়া হবে না বলেই পরোক্ষভাবে জানিয়ে দেওয়া হলো। কারণ শত শত বছর ধরে রাজ্যটিতে বাস করা রোহিঙ্গাদের এখনও নাগরিকত্বের স্বীকৃতি দেয়নি মিয়ানমার সরকার।  

সংবাদ সম্মেলনে ইউ থং তুন বলেন, নাগরিকরা কত দিন ধরে মিয়ানমারে বসবাস করেছে; সে বিষয়ে অবশ্যই প্রমাণ থাকতে হবে। যদি সঠিক প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তারা ফেরত আসতে পারবেন।

সংবাদ সম্মেলনে মিয়ানমারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ইউ থং তুন। ছবি: সংগৃহীত

সংবাদ সম্মেলনে মিয়ানমারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ইউ থং তুন। ছবি: সংগৃহীত

দেশটির রাজধানী নেইপিদো, ইয়াঙ্গুন, মান্দালয় ও মল্যামিয়াংসহ দেশটির প্রধান প্রধান কিছু শহরে নিরাপত্তা সতর্কতা সম্পর্কে তিনি বলেন, জনগণের চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। মধ্যপ্রাচ্যে দুর্বল হয়ে পড়া জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনুপ্রবেশের চেষ্টা করতে পারে তাই বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি দেশটির নেত্রী সুচির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলেন, রাষ্ট্র ও জনগণের সুরক্ষা দিতেই রাখাইন রাজ্যে পুলিশের শক্তি বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখে কাঁদলেন তুরস্কের ফার্স্ট লেডিও

মিয়ানমারে অব্যাহত নির্যাতনের কারণে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরেজমিনে দেখতে ৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে পৌঁছান তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিন এরদোয়ান, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেনটো মারসুদি’র এবং বাংলাদেশের বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী ও প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।

এমিন এরদোয়ান উখিয়ার কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধিত ক্যাম্প ও অস্থায়ী ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি কাদা-মাটির মধ্যে প্রায় দুই কিলোমিটার পায়ে হেঁটে রোহিঙ্গাদের কথা শোনেন। আহত ও গুলিবিদ্ধ রোহিঙ্গারা তাদের উপর ঘটে যাওয়া পাশবিকতার বর্ণনা, পরিবারের নারী সদস্যদের উপর ঘটে যাওয়া বর্বরতা ও পাড়া প্রতিবেশীদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারার কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। এ সময় আবেগ আপ্লুত হয়ে রোহিঙ্গাদের ধরে কাঁদছিলেন আর নিরবে চোখ মুছছিলেন এমিন এরদোয়ানও।

দুই  রোহিঙ্গা সন্তান বৃদ্ধ বাবাকে বয়ে আনছেন বাংলাদেশে। ছবিটি ৭ সেপ্টেম্বর শাহপরীর দ্বীপ থেকে তোলা। ছবি: স্টার মেইল

দুই  রোহিঙ্গা সন্তান বৃদ্ধ বাবাকে বয়ে আনছেন বাংলাদেশে। ছবিটি ৭ সেপ্টেম্বর শাহপরীর দ্বীপ থেকে তোলা। ছবি: স্টার মেইল

শরনার্থী শিবির পরিদর্শন শেষে রোহিঙ্গা ইস্যুতে যেকোনো পদক্ষেপে বাংলাদেশের পাশে থাকার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমরা রোহিঙ্গাদের ওপর ঘটে যাওয়া পাশবিকতার কথা শুনেছি। তাদের ওপর ঘটে যাওয়া নিপীড়ন বড়ই অমানবিক, বর্বর। নিজ দেশে এভাবে পাশবিকতার শিকার হওয়া কখনো কাম্য নয়। এটি বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে জাতিসংঘের আগামী অধিবেশনে তা তুলে ধরা হবে। বিপদাপন্ন রোহিঙ্গাদের জীবনমান বিবেক সম্পন্ন যে কাউকে আপ্লুত করবে। অমানবিকতায় মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করলেও মানবিকতায় প্রতিবেশী বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়ে প্রশংসনীয় কাজ করে আসছে। রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশে তুরস্কের সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বর্ণনায় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তুরস্কোর ফাস্ট লেডিও। ছবিটি ৭ সেপ্টেম্বর কুতুবপালং শরনার্থী শিবির থেকে তোলা। ছবি: স্টার মেইল

রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বর্ণনায় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তুরস্কের ফাস্ট লেডিও। ছবিটি ৭ সেপ্টেম্বর কুতুবপালং শরণার্থী শিবির থেকে তোলা। ছবি: স্টার মেইল

রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান গণহত্যা ও নৈরাজ্য বন্ধের দাবি মিয়ানমারের কাছে জানানো হয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে এমিন এরদোয়ান বলেন, আমরা মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা এটি বার বার এড়িয়ে গেছে।

এ সময় তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেনটো মারসুদি বলেন, রোহিঙ্গারা খুবই অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ যা করছে সেজন্য তুরস্কের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ। তুরস্ক রোহিঙ্গাদের সহায়তায় বাংলাদেশের পাশে থাকবে। ভবিষ্যতেও এ সমর্থন অব্যাহত রাখা হবে।

রোহিঙ্গাদের মানবিক দৃষ্টিতে দেখতে জেরেমি করবিন’র আহবান

রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা-নির্যাতন বন্ধ ও মানবিক আচরণ করতে একের পর এক বিশ্ব নেতাদের আহবানের পর এবার অং সান সু চির প্রতি রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধ করার আহ্বান করলেন ব্রিটেনের প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা জেরেমি করবিন। লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির উদ্দেশে আবেদন জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি আচরণে তিনি যেন মানবাধিকারের প্রতি তার অঙ্গীকারের প্রতিফলন দেখান।

ব্রিটেনের প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন। সংগৃহীত ছবি

ব্রিটেনের প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন। সংগৃহীত ছবি

বিবিসির উর্দু বিভাগের আদিল শাজেবকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেরেমি করবিন বলেন, ‘আমরা অং সান সু চির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তার উদ্দেশে আমার বার্তা হলো- আমরা আপনাকে পছন্দ করি- বহু বছর আপনি যখন গৃহবন্দী ছিলেন আমরা আপনাকে সমর্থন করেছি। আমরা আপনার সমর্থনে মিছিল করেছি, মানবাধিকারের প্রতি আপনার অঙ্গীকারকে আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে রোহিঙ্গা জনগণের প্রতিও সেই মানবাধিকারের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরুন। তারা যাতে মিয়ানমারের ভেতর পূর্ণ নাগরিকত্ব পায় সেটা নিশ্চিত করুন। তাদের নিজের দেশ থেকে তাদের জায়গা-জমি আর ঘরছাড়া যাতে না করা হয় সেটা নিশ্চিত করুন।’

নেই আবাসন ব্যবস্থা, পথের ধারে হাজারো ক্ষুধার্ত রোহিঙ্গার আহাজারি

ক্ষুধার্ত চেহারা। মুখে কোনো শব্দ নেই। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। আর কিছুক্ষণ পর পর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। ভীত-বিধ্বস্ত চেহারা। ভয়ে অনেকটা কাতর। নতুন কাউকে দেখলে আতঁকে উঠে। রাস্তার পাশে কিংবা পাহাড়ের পাদদেশে ঝুপড়ি করে অবস্থান নিয়েছেন তারা। কখন খেয়েছে কেউ জানে না। একটু পানি যেন তাদের সম্বল। সেই পানিটুকুও ঠিকমতো পাচ্ছে না তারা। এই চিত্র এখন কক্সবাজার জেলার উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, হোয়াইক্যংসহ আশপাশ এলাকায় অবস্থানরত মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা হাজারো রোহিঙ্গাদের।

প্রাণ বাঁচাতে অনাহার-অর্ধাহারে রাত দিন দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসেছে তারা। এমন করুণ পরিণতি নিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছার পরও খাদ্য-পানি এবং চিকিৎসার অভাবে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে একের পর এক রোহিঙ্গা। ছোট ছোট শিশুদের কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। অপুষ্টি ও ক্ষুধায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ধকল সইতে না পেরে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে শিশুরা। অসুস্থ বৃদ্ধরাও চরম কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। ক্ষুধা ও অসুস্থতায় চিকিৎসার অভাবে কারও কারও মৃত্যু হচ্ছে। সব মিলিয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে রোহিঙ্গারা।

রাখাইন রাজ্যের সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা একটি রোহিঙ্গা পরিবার আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায়। ছবিটি ২ সেপ্টেম্বর তোলা। ছবি: এএফপি

রাখাইন রাজ্যের সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা একটি রোহিঙ্গা পরিবার আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায়। ছবিটি ২ সেপ্টেম্বর তোলা। ছবি: এএফপি

রোহিঙ্গারা কতটা নাজুক পরিস্থিতিতে আছে তা বোঝাতে বাংলাদেশে জাতিসংঘের প্রধান সমন্বয়কারী কর্মকর্তা ৬ সেপ্টেম্বর বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বলেন, অনেকেই খোলা আকাশের নিচে ঘুমচ্ছেন। দিনের পর দিন হেঁটে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে আসা এই লোকজনের জরুরি খাবার ও পানির প্রয়োজন।

এদিকে সম্প্রতি রাখাইন থেকে ফিরে বিবিসির একজন সংবাদদাতা বলেছেন, তিনি দেখেছেন স্থানীয় রাখাইন যুবকরা জগভর্তি পেট্রল ঢেলে মুসলিমদের গ্রামগুলো পুড়িয়ে দিচ্ছে। যে দিকে চোখ যায়, বিস্তীর্ণ এলাকা জনশূন্য- চারিদিকে পোড়া ক্ষেত এবং ফেলে যাওয়া গবাদি পশু।

মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সাথে সাথে রাখাইনে প্রবেশ করতে পারা ওই সাংবাদিক জানান, বাধ্যবাধতার মুখে যতটুকু দেখেছেন তাতেই বোঝা যায় প্রকৃত অবস্থাটা আসলে কী? কতটা ভয়ানক পরিস্থিতিতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়।

আসছে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা

মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনীর আক্রমণের হাত থেকে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ইতোমধ্যে প্রায় ১ লক্ষ ৫০ ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের কর্মীরা। তারা আশঙ্কা করছেন, ঘটনার মাত্রা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে নতুন করে আরও দেড় লাখ অর্থাৎ ৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা সহিংসতা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে

এ বিষয়ে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির বাংলাদেশ প্রধান দীপন ভট্টাচার্য বলেন, শরণার্থীর সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। এদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন। বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গাদের সহায়তায় এগিয়ে আসছে। রোহিঙ্গাদের সংখ্যার আধিক্যতার কারণে সুষ্ঠুভাবে ত্রাণ বিতরণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের জন্য খাবার, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্রোতের মত বাংলাদেশে আসছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। ছবিটি ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে তোলা। ছবি: এএফপি

স্রোতের মতো বাংলাদেশে আসছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। ছবিটি ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে তোলা। ছবি: এএফপি

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বাংলাদেশ প্রধান আরও বলেন, বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গারা প্রত্যেকেই অপুষ্টিতে ভুগছে। মাসেরও বেশি সময় ধরে তারা ঠিকমতো খেতে পারছেন না। তাদের অনেকেই আহত কিংবা অসুস্থ।

রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সেনানির্যাতন শুরু হওয়ার পর জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা একটি অস্থায়ী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। ছবিটি ৩০ আগস্ট তোলা। ছবি: এএফপি

রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সেনানির্যাতন শুরু হওয়ার পর জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা একটি অস্থায়ী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। ছবিটি ৩০ আগস্ট তোলা। ছবি: এএফপি

এদিকে, শরণার্থী সামলানো ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আয়ত্বের বাইরে চলে যেতে পারে জানিয়ে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এর কর্মকর্তা ভিভিয়েন ট্যান বলেন, যেভাবে শরণার্থীর সংখ্যা বাড়ছে তাতে শিগগিরই আশ্রয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের জরুরি সঙ্কট তৈরি হতে পারে। কেননা পুরানো যে দুটো রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির (কুতুপালং এবং নয়াপাড়া) তাতে আর তিল ধারণের জায়গা নেই। স্থানীয় স্কুল-মাদ্রাসা ছাড়াও বিভিন্ন খোলা জায়গায় তাঁবু খাটিয়ে পালিয়ে আসা মানুষজনকে ঠাঁই দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু বর্তমান হারে শরণার্থী আসতে থাকলে পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারে।

বিদেশি বিনিয়োগে বিশেষ শিল্প ও অর্থনৈতিক অঞ্চল করতেই রোহিঙ্গা মুক্ত করা হচ্ছে রাখাইন?

বিদেশি বিনিয়োগে বিশেষ শিল্প ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং তার নিরাপত্তা বিধান করতেই রোহিঙ্গা মুক্ত করা হচ্ছে রাখাইন রাজ্য, বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম বলা হয়, মিয়ানমারে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগ শুরু হওয়ার পর শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলার লক্ষ্যে সে দেশের সরকার রাখাইন রাজ্যকে বেছে নিয়েছে। এতে এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতো সুফল আসবে বলে সামরিক জান্তার মদদপুষ্ট কথিত গণতান্ত্রিক সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলের ধারণা। কারণ হিসেবে আরও বলা হচ্ছে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সরকারের জন্য বড় ধরনের মাথাব্যথা হয়ে আছে।

সীমান্তের ওপারে সহিংসতা চলছেই। নিজ ভূমি পেছনে ফেলে বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গা জনস্রোত। ছবিটি ৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে তোলা। ছবি: ফোকাস বাংলা

সীমান্তের ওপারে সহিংসতা চলছেই। নিজ ভূমি পেছনে ফেলে বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গা জনস্রোত। ছবিটি ৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে তোলা। ছবি: ফোকাস বাংলা

বহুজাতিক কোম্পানিসহ বিদেশিদের মোটা অঙ্কের পুঁজি বিনিয়োগ যাতে হাতছাড়া না হয় সে লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের হত্যা ও বিতাড়িত করে রাখাইন রাজ্যকে বিনিয়োগবান্ধব করে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েই তারা রোহিঙ্গাদের ওপর মরণ কামড় দিয়েছে। এবারের সেনা অভিযান রাখাইনকে রোহিঙ্গামুক্তকরণ অভিযান। অপরদিকে, রাখাইন রাজ্যে সে দেশের নাগরিক তথা বৌদ্ধ ধর্মীয় গোষ্ঠীর সদস্যরা রয়েছে তাদেরও সরিয়ে নেয়ার তৎপরতা শুরু হয়ে তা অব্যাহত রয়েছে।

যে কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না বাংলাদেশ

মিয়ানমারে চলমান ‘রোহিঙ্গা নিধন’ অভিযানে বাংলাদেশ ভয়াবহ বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে বলে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারসহ বিভিন্ন সংগঠন ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া, তা ছাড়া এই ইস্যুতে জাতিসংঘ মহাসচিব ও রাশিয়া, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বাংলাদেশেকে সমর্থন করেছে। তারপরও বাংলাদেশ কেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না? দেশের অভ্যন্তরে এ প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক আমেনা মহসীন বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের কথা চিন্তা করে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে চেষ্টা করেছে। এক্ষেত্রে খুব অফেনসিভ স্ট্র্যাটেজি নেয়া বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব কিনা সেটা চিন্তার ব্যাপার আছে।

অধ্যাপক আমেনা মহসিনা। ছবি: সংগৃহীত

অধ্যাপক আমেনা মহসিনা। ছবি: সংগৃহীত

অধ্যাপক আমেনা মহসিন মনে করেন, বাংলাদেশ চায় না মিয়ানমারের কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন এবং আমেরিকার মতো দেশগুলো নীরবতা পালন করছে। সে জন্য বাংলাদেশ জানে যে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বড় শক্তিগুলোর সমর্থন পাবে না।

তিনি বলেন, মিয়ানমারে যেহেতু নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র, সেজন্য সেখানকার শাসক গোষ্ঠির কোনো জবাবদিহিতা নেই। তারা এ ধরনের কাজ চালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারের সামনে একটা নির্বাচন আছে। সেটাও বাংলাদেশকে ক্যালকুলেশনে রাখতে হবে। কারণ এটা নিয়ে অনেক ধরনের রাজনীতিও হতে পারে। তা ছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কোনো সামরিক উপায়ে হতে পারে না। এ সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে।

প্রসঙ্গত, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান ইস্যুতে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে অং সান সুচি’র গঠিত কফি আনান অ্যাডভাইজরি কমিশন গত ২৪ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে ১৯৮২ সালের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনে সংশোধন এনে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দেওয়ার সুপারিশ ছাড়াও রাখাইনে মানবিক ত্রাণসহায়তা বিতরণ ও গণমাধ্যম কর্মীদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। ওই দিন রাতেই রাখাইন বিদ্রোহী কতৃক কয়েকটি পুলিশ ফাঁড়িতে হামলার অভিযোগ তুলে দেশটির রাখাইন রাজ্যে ২৫ আগস্ট ভোর থেকে নতুন করে সেনা অভিযান শুরু হয়।

এ অভিযানে এখন পর্যন্ত ৪০০ জনকে হত্যা এবং ২৬০০ ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। জাতিসংঘ বলছে, অক্টোবরের পর এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে। প্রতিদিনই এ সংখ্যা বাড়ছে।

এর আগেও, জাতিগত দ্বন্দ্বের জেরে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো একই রকম অভিযানে কয়েকশত রোহিঙ্গা নিহত হয়। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় হাজারো ঘরবাড়ি। ওই অভিযানের বর্বরতায় বাধ্য হয়ে অন্তত ৮০ হাজার রোহিঙ্গা পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে।

২৫ আগস্ট থেকে দেশটির সেনাবাহিনী ‘কিলিং অভিযান’ শুরুর পর মিয়ানমার থেকে এখন পর্যন্ত মোট কত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে তা নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও বিভিন্ন দেশি বিদেশি সূত্র বলছে, সংখ্যাটি ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার। তবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জেনেভায় ৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলাবর এক ব্রিফিংয়ে জানায়, আগস্ট মাস থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ১ লাখ ২৩ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে।

এদিকে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে সুচির নিরব ভূমিকার নিন্দায় সরব হয়েছে বিশ্ব। দেশে দেশে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ থেকে শান্তিতে এই নোবেলজয়ীর পুরস্কার ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি তোলা হয়েছে।

রোহিঙ্গা একটি নৃগোষ্ঠীর নাম যাদের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ ইসলাম ও ১০ ভাগ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। রোহিঙ্গাদের আদি আবাসস্থল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। শত শত বছর ধরে রাজ্যটিতে বাস করা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি না দিয়ে মিয়ানমার সরকার এ জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালাচ্ছে।

প্রিয় সংবাদ/শান্ত