(প্রিয়.কম) সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর কথা, কাজ ও সম্মতি এবং সমর্থনকে ইসলামী পরিভাষায় হাদিস বলা হয়। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সাহাবিদের সময়কাল থেকেই নানাভাবে সংরক্ষিত হয়ে বর্তমান যুগ পর্যন্ত এসে পৌছেছে হাদিস। হাদিসের বিভিন্ন সংকলনগ্রন্থ তৈরি হওয়ার ইতিহাসে শুদ্ধতার পাশাপাশি অশুদ্ধতা চর্চাও হয়েছে। আর এই অশুদ্ধতার চর্চার নেপথ্য কাহিনি একটাই- ইসলামের ব্যাপক প্রচার-প্রসার ও বিজয়মুখী গতিতে সমস্যা সৃষ্টি করা। সরাসরিভাবে যখন ইসলামকে আটকানো সম্ভব হচ্ছিলো না, তখন ইসলামের শত্রুতা ইসলামের বেশে ইসলামী বিভিন্ন আকার-অবয়ব ধারণ করে ইসলামের ক্ষতি করার ষড়যন্ত্র শুরু করে।

আর এই নীলনকশার একটি বড় আকারের বহিঃপ্রকাশ হলো জাল বা ভুয়া হাদিস সৃষ্টি। হাদিস বিশারদদের একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে, বর্তমানে মুসলিম সমাজে সহিহ হাদিস হিসেবে বহু জাল হাদিস প্রচলিত রয়েছে। পাঠকের জানার জন্য এখানে উল্লেখযোগ্য কিছু জাল হাদিস তুলে ধরা হলো-

১. জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজনে চীন দেশে যাও- এটি হাদিস নয়। এই আলোচনার আরবী বাক্যটি ব্যাপকভাবে হাদিস হিসাবে বলা হয়ে থাকে। প্রকৃত পক্ষে এটি পরবর্তী কারো বাণী। তবে সন্দেহ নেই যে, বক্তব্যটি সঠিক ও বাস্তবসম্মত। ইলমে দ্বীন হাসিলের জন্য যত দূরের সফরই হোক, তাওফীক হলে করা উচিত। ইলম অন্বেষণে কখনো মেহনত-মুজাহাদকে ভয় পাওয়া উচিত নয়। তদ্রূপ পার্থিব জীবনে প্রয়োজনীয় শিল্প ও বিদ্যা শিক্ষার জন্যও দূর দূরান্তে সফর করা জায়েজ; বরং তা একটি পর্যায় পর্যন্ত কাম্যও বটে। এই সকল কিছু স্বস্থানে বিদ্যমান আছে এবং শরীয়তের বিভিন্ন দলিল দ্বারা তা প্রমাণিত। কিন্তু আমাদের আলোচ্য বাক্যটি হাদিস নয়। যদিও তা হাদিস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, কিন্তু সনদে আবু আতিবা তরীফ ইবনে সুলায়মান নামক একজন রাবী আছে যে হাদিস শাস্ত্রের ইমামগণের দৃষ্টিতে মতারূক (পরিত্যক্ত)। তাকে হাদিস জাল করার অভিযোগেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।  [আয-যুআফাউল কাবীর, উকাইলী ২/২৩০; কিতাবুল মাজরূহীন, ইবনে হিব্বান ১/৩৮২; মিযানুল ইতিদাল ২/২৫৮; আলমুনতাখাব মিনাল ইলাল লিল-খাল্লাল ইবনে কুদামাহ পৃ. ১২৯-১৩০; আলমাকাসিদুল হাসানাহ, সাখাভী পৃ. ১২১]

২. আল্লাহ মহান মোট আঠারো হাজার মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন- এটি হাদিস নয়। লোকমুখে এতই প্রসিদ্ধ যে, অনেকের কাছে তা হাদিসের বাণীর মতো স্বতঃসিদ্ধ। কিন্তু মাখলুকাতের এই নির্দিষ্ট সংখ্যা না কুরআনে আছে, না কোনো সহিহ হাদিসে। বাস্তবতা হলো, আল্লাহ তাআলা অগণিত মাখলুক পয়দা করেছেন। জলে ও স্থলে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির মাখলুক আল্লাহর অসীম কুদরতের প্রমাণ। মানুষের জানার বাইরেও রয়েছে অসংখ্য মাখলুক। আল্লাহ তায়ালা কত ধরনের মাখলুক সৃষ্টি করেছেন তার নির্দিষ্ট সংখ্যা সহীহ হাদিসে বলা হয়নি। [আলমাওযূআত, ইবনুল জাওযী ২/২১৬; আলফাওয়াইদুল মাজমুআ পৃ. ৪৫৮-৪৫৯] এছাড়া এই সংখ্যা সম্পর্কে কিছু মনীষীর উক্তিও রয়েছে। যেমন মারওয়ান ইবনুল হাকামের কথামতে সতের হাজার জগত রয়েছে। আর আবুল আলিয়ার অনুমান অনুযায়ী চৌদ্দ হাজার কিংবা আঠারো হাজার মাখলুকাত আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। এই বিভিন্ন সংখ্যা কিছু মনীষীর উক্তিমাত্র, হাদিস নয়। [তাফসীরে ইবনে কাসীর ১/২৬[ অতএব আঠারো হাজার নয়; বরং বলা উচিত যে, আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য অগণিত মাখলুক পয়দা করেছেন, যা আমরা গুণে ও হিসাব করে শেষ করতে পারব না।

৩. স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত-  এটি হাদিসের পাঠ নয়।  স্ত্রীর প্রতি স্বামীর হক বা স্বামীর আনুগত্য বিষয়ে অনেকে উপরের কথাকে হাদিস হিসেবে পেশ করে থাকে। যার আরবী হল, আল জান্নাতু তাহতা আকদামিল আজওয়াজ। কিন্তু এ শব্দ-বাক্যে কোনো হাদিস পাওয়া যায় না। সুতরাং এটিকে হাদিস হিসেবে বলা যাবে না। তবে কিছু বর্ণনায় এর মর্মার্থ পাওয়া যায়। মুআত্তা মালেক, মুসনাদে আহমাদ, মুসতাদরাকে  হাকেমসহ হাদীসের আরো কিছু কিতাবে বর্ণিত হয়েছে- একবার এক নারী সাহাবী রাসূলের (সা.) কাছে এলেন নিজের কোনো প্রয়োজনে। যাওয়ার সময় রাসূল (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি স্বামী আছে? তিনি বললেন, জী, আছে। নবীজী বললেন, তার সাথে তোমার আচরণ কেমন? সে বলল, আমি যথাসাধ্য তার সাথে ভালো আচরণ করার চেষ্টা করি। তখন নবীজী বললেন, হ্যাঁ, তার সাথে তোমার আচরণের বিষয়ে সজাগ থাকো, কারণ সে তোমার জান্নাত বা তোমার জাহান্নাম। [মুআত্তা মালেক, হাদিস ৯৫২; মুসনাদে আহমাদ, ৪/৩৪১ হাদিস ১৯০০৩; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস ২৭৬৯; সুনানে কুবরা, বায়হাকী, হাদিস ১৪৭০৬] সুতরাং গুনাহের কাজ নয়, এমন সব বিষয়ে স্বামীর আনুগত্য জরুরি। কিন্তু ‘স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত’ এটি হাদিস নয়।

৪. যে ব্যক্তি মসজিদ থেকে একটি চুল সরিয়ে দিল সে যেন একটি মৃত গাধা ফেলে দিল- এটি হাদিস নয়।  কোথাও কোথাও এই কথাটি হাদিস হিসেবে প্রচলিত আছে- ‘যে ব্যক্তি মসজিদ থেকে একটি চুল সরিয়ে দিল সে যেন একটি মৃত গাধা ফেলে দিল বা সে একটি মরা গাধা সরানোর সওয়াব লাভ করল।’ মসজিদে কোনো ময়লা দেখলে তা পরিষ্কার করা অনেক সওয়াব ও ফজিলতের কাজ। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে কোনো ময়লা দেখলে নিজ হাতে তা পরিষ্কার করতেন। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদের দেয়ালে ময়লা দেখতে পেলেন। তখন তিনি একটি পাথরের টুকরা নিলেন এবং নিজ হাতে তা পরিষ্কার করলেন। [সহীহ বুখারী, হাদিস ৪০৮] সুতরাং মসজিদে কোনো ময়লা দেখলে তা পরিষ্কার করা অনেক সওয়াবের কাজ। কিন্তু মসজিদ থেকে একটি চুল ফেলে দিলে মরা গাধা ফেলার সওয়াব সম্বলিত কথাটি লোকমুখে হাদিস হিসেবে প্রসিদ্ধ হলেও এটি হাদিস নয়। কোনো নির্ভরযোগ্য কিতাবে তা পাওয়া যায় না। আমাদের জানামতে এর কোনো নির্ভরযোগ্য সনদ নেই।

৫. মুহূর্তকালের ধ্যানমগ্নতা ষাট বছর ইবাদত অপেক্ষা উত্তম-এটি হাদিস নয়।  যে সনদে (বর্ণনাসূত্রে) হাদিস হিসেবে কথাটি বর্ণিত হয়েছে তা নির্ভরযোগ্য নয়। তাই কথাটি হাদিস নয় বলে মত প্রকাশ করেছেন শাস্ত্রের ইমামগণ। ইবনুল জাওযী রাহ. বলেন, এটি সহীহ নয়।’ আহমদ গুমারীও অনুরূপ মত ব্যক্ত করেছেন। [কিতাবুল মাওযূআত : ৩/৩৮৬ (টীকাসহ);আল মুগীর,পৃ.৭৬;আল ফাওয়ায়েদুল মাজমূআহ, পৃ.২৪২-২৪৩]

৬. শবে বরাতে হালুয়া-রুটি বানালে আরশের নিচে ছায়া পাওয়া যাবে- এটি হাদিস নয়। গ্রামের মহিলাদের প্রায় সকলকেই বলতে শোনা গেছে, ‘শবে বরাতে হালুয়া-রুটি বানালে আরশের নিচে ছায়া পাওয়া যাবে।’ এটিকে রাসূলের হাদিস হিসেবেই বলা হয়েছে। কিন্তু রাসূলের (সা.) হাদিসের সাথে এর দূরতম সম্পর্কও নেই। এটি এমন একটি ভিত্তিহীন কথা যার জাল হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এমনকি জাল হাদীসের উপর লেখা কিতাবাদিতেও এর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। শাবানের পনের তারিখের রাতের ফযীলত সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। হাদিস শরীফে এসেছে, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা অর্ধ শাবানের রাতে (শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষপোষণকারী ব্যতীত আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহীহ ইবনে হিববান, হাদিস ৫৬৬৫; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদিস ৩৮৩৩) কিন্তু এই রাতের সাথে হালুয়া-রুটির কী সম্পর্ক?

৭. তালিবুল ইলমের জন্য সত্তর হাজার ফিরিশতা ডানা বিছিয়ে দেন-এটি হাদিস নয়। জনৈক ওয়ায়েয তালিবুল ইলমের ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণের জন্য পথ চলে তার পায়ের নিচে সত্তর হাজার ফিরিশতা ডানা বিছিয়ে দেন।’ এটি হাদিস নয়। আমাদের জানামতে এমন কথা হাদীসের প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে নেই। বরং এ ব্যাপারে সহীহ ও প্রসিদ্ধ হাদিস হল, (যেখানে ফিরিশতার ডানা রাখার কথা আছে কিন্তু ফিরিশতার কোনো সংখ্যার কথা উল্লেখ নেই।) ‘যে ব্যক্তি ইলমের জন্য পথ চলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। আর ফিরিশতারা তালিবুল ইলমের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে ডানা রেখে দেন। আর আলেমের জন্য আসমান ও যমিনের অধিবাসিরা ইসতিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করতে থাকে। এমনকি সমুদ্রের মাছ পর্যন্ত তাঁদের জন্য ইসতিগফার করতে থাকে।...’ [জামে তিরমিযী, হাদিস ২৬৮২; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৬৪১; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ২২৩; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদিস ১৫৭৩; সহীহ ইবনে হিববান, হাদিস ৮৮]

৮.  জ্ঞান-সাধকের দোয়াতের কালি শহীদের রক্তের চেয়ে মূল্যবান- এটি হাদিস নয়। ‘জ্ঞান-সাধকের দোয়াতের কালি শহীদের রক্তের চেয়ে মূল্যবান’ এ কথাটি হাদিস হিসেবে জনশ্রুতি থাকলেও হাদিস বিশারদগণের নির্ভরযোগ্য মতানুসারে এটি হাদিস নয়; বরং পরবর্তী কারো বাণী। ইমাম সাখাবী রাহ. ‘আল মাকাসিদুল হাসানাতে’ (পৃ. ৪৪২, বর্ণনা: ১০০৫ ) এটিকে হাসান বসরী রাহ.-এর বাণী বলে উল্লেখ করেছেন। শাওকানী রাহ.,যারকাশী রাহ.,তাহের পাটনী রাহ.-সহ আরো অনেক হাদিস বিশারদ এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন।  [দেখুন: আল ফাওয়াইদুল মাজমূআ, খ. ১ পৃ. ২৮৭, বর্ণনা: ৫৩; আললাআলিল মানছূরাহ,  পৃ. ১০১, বর্ণনা: ১০; আল আসারুল মারফূআ ২০৭; কাশফুল খাফা, খ.২ পৃ.২০০; তাযকিরাতুল মাওযূআত খ. ২ পৃ. ৩৬৯; মিযানুল ইতিদাল খ.৩ পৃ. ৪৯৮।] সুতরাং এটিকে হাদিস হিসেবে বলা উচিত নয়। 

৯. রাসূলের (সা.) জুতায় আরশ ধন্য হয়েছে- এটি হাদিস নয়। লোকমুখে মিরাজ সর্ম্পকে একটি কথা প্রসিদ্ধ আছে যে, মিরাজের রজনীতে রাসূল (সা.) আরশে মুআল্লায় প্রবেশের পূর্বে জুতা খুলতে চাইলে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি জুতা খুলবেন না। কারণ, আপনার জুতা নিয়ে আগমনে আরশ ধন্য হবে। এটি বরকত লাভের কারণে অন্যরে উপর র্গববোধ করবে। কথাগুলো সাধারণ মানুষের মাঝে প্রসিদ্ধ তো আছেই, কোন কোন বক্তার মুখেও শোনা যায় কিন্তু এই কথাগুলো ভিত্তিহীন কোনোভাবেই সহিহ তা প্রমাণতি নয়। সবগুলোই মনগড়া ও বানানো কথা। [শরহুল মাওয়াহেব ৮/২২৩]

১০. মাদরাসা রাসূলের ঘর- এটি হাদিস নয়। কোনো কোনো ওয়াজ মাহফিলে এই ধরনের কথা শোনা যায় যে, ‘মসজিদ আল্লাহর ঘর আর মাদরাসা রাসূলের ঘর।’ আবার কোনো কোনো দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তা আরেকটু আগে বেড়ে এটাকে হাদিস হিসেবে এভাবেও বর্ণনা করেন যে, ‘মসজিদ আল্লাহর ঘর আর মাদরাসা আমার ঘর।’ এখানে লক্ষণীয় যে, উপরোক্ত কথায় দু’টি বাক্য রয়েছে। প্রথম বাক্যটি হল, ‘মসজিদ আল্লাহর ঘর’। এটি কুরআন ও হাদিস দ্বারা সমর্থিত । প্রায় এর কাছাকাছি শব্দ বিভিন্ন হাদিসেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় বাক্য অর্থাৎ ‘মাদরাসা রাসূলের ঘর’ এটি কোনো হাদিস নয়। কেউ এটাকে হাদিস হিসেবে বললে ঠিক হবে না।

সূত্র : গবেষণা ম্যাগাজিন আল কাউসার।

প্রিয় ইসলাম/শামীমা সীমা