(প্রিয়.কম) রাখাইন নিয়ে অব্যাহত বৈশ্বিক রাজনৈতিক চাপ আর অবরোধ আরোপের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই চীনের কাছে কূটনৈতিক আর রাজনৈতিক সমর্থনের আশা করছে মিয়ানমার। দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ইরাবতী তাদের এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে হাজির করেছে কীভাবে রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক আর অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করছে মিয়ানমার। ইরাবতী বলছে, মনে হচ্ছে যেন চীনের আলিঙ্গনে বাধা পড়ছে মিয়ানমার।

আর চীনও তাদের সহায়তার ক্ষেত্রে কোনো রাখঢাক রাখছে না। তবুও সতর্ক আর হিসেবি হয়েই পদক্ষেপ ফেলছে মিয়ানমার। অন্য আঞ্চলিক বন্ধুত্বেরও আশা করছে তারা।

মিয়ানমার সরকার আর তাদের নেপথ্য পাওয়ার ব্যাংক সামরিক বাহিনী চীনকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ আর কৌশলগত সহযোগী বিবেচনা করছে। তবে শুধুমাত্র চীনের প্রতি প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়তেও আগ্রহী নয় তারা।

অন্যদের সঙ্গেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী মিয়ানমার। সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, জাপানের সঙ্গেও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়াতে চায় তারা। এই মুহুর্তে সিঙ্গাপুর মিয়ানমারে বিনিয়োগের শীর্ষে রয়েছে। চলতি অর্থবছরে দেশটিতে চার বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে তারা।

ভিয়েতনামের বিনিয়োগ রয়েছে এক দশমিক তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আঞ্চলিক সহযোগী এই দেশগুলো বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাবশালী না হলেও মিয়ানমারকে রক্ষার প্রয়োজন পড়লে তারাও মাথায় চাঁটি মারতে পারে।

যদি তাই ঘটে, মিয়ানমার সামরিক বাহিনী চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় এক্ষেত্রে সাবধানী থাকছে। অস্ত্র আর কৌশলগত সহায়তা দিয়ে উত্তরাঞ্চলীয় এলাকায় বিদ্রোহীদের দমনে বিগত কয়েক দশক ধরেই মিয়ানমারের পাশে রয়েছে তারা। তবে মিয়ানমারের জেনারেলরা বেইজিংয়ের প্রতি কতটা বিশ্বাস আর নির্ভর করেন তা পরিষ্কার নয়।

১৯৯০-এর দশকে যখন এই অঞ্চল জেট ফাইটার আর গোলাবারুদের জন্যে হন্যে হয়ে উঠেছিলো, তখন মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে নিম্নমানের জেট ফাইটার, অস্ত্র আর গোলাবারুদ সরবরাহ করেছিলো চীন। তখন থেকেই মিয়ানমারের জেনারেলরা উৎসের বৈচিত্র সন্ধানে আগ্রহী হয়ে ওঠে। সামরিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল আর পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে তারা। আর আজকের দিনে এসে ভারত, রাশিয়া, জাপান, থাইল্যান্ডের সঙ্গে সামরিক সহায়তা সম্প্রসারণ করেছে মিয়ানমার।

চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি আর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর মধ্যকার সম্পর্ককে নতুন দিক হিসেবে দেখা যেতে পারে। চায়না নর্থ কর্পোরেশন (নরিনকো) আর মিয়ানমার মিলিটারি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়ে একমত হয়েছে।

গত ২৮ নভেম্বর এক বিবৃতিতে নরিনকো এই পরিকল্পনার কথা প্রথম জানায়। তার কয়েকদিন আগেই নরিনকো চেয়ারম্যান ওয়েন গ্যাং আর মিয়ানমার সামরিক বাহিনী প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অংম হ্লাংয়ের মধ্যে এবিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় বলে ওই বিবৃতিতে জানানো হয়।

বিবৃতিতে নরিনকো জানায়, মিয়ানমারের সঙ্গে ‘সহযোগিতার দীর্ঘ ইতিহাস’ রয়েছে তাদের। আর তারা দেশটির সামরিক বাহিনীকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আর সেবার মাধ্যমে তা অব্যাহত রাখতে চায়। এসবের সম্প্রসারণ আর সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়াতেও আগ্রহ দেখানোর কথা ওই বিবৃতিতে জানায় তারা।

যুক্তরাষ্ট্রও অবশ্য মিয়ানমারের সেনা কর্মকর্তাদের সহায়তা করতে প্রস্তুত ছিলো। মিলিটারি টু মিলিটারি এই সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা চলমান থাকার মধ্যেই রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনে দেশটি। আলোচনা যায় ভেস্তে। আর এই মুহুর্তে মার্কিন কংগ্রেস মিয়ামারের ওপর অবরোধ আরোপের বিষয়ে চিন্তা করছে।

মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চির সাম্প্রতিক চীন সফর ইঙ্গিত দিয়েছে, দুই দেশ তাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করতে চাইছে। সু চির সঙ্গে এক বৈঠকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দ্বিপক্ষিয় সহায়তা বাড়ানোর আগ্রহ দেখান।

গত নভেম্বরে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই রাজধানী নেপিদো সফরের সময় চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপনের প্রস্তাব দেন। তিন পর্যায়ে বাস্তবায়নযোগ্য এই করিডোর মান্দালয়, ইয়াঙ্গুন হয়ে রাখাইনের স্পেশাল অর্থনৈতিক অঞ্চল কায়োকফাউ পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে। মহাপরিকল্পনা রয়েছে এই সংযোগ বাংলাদেশ, চীন, ভারত আর মিয়ানমারের মধ্যে বাড়ানো হবে।

এই প্রকল্প চীনের কুনমিং আর ভারতের কলকাতাকে সংযুক্ত করে মান্দালয়, ঢাকা আর চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ভূরাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে চীন ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বেইজিংকে সংযুক্ত রাখতে চায়।

ভারত এই পরিকল্পনা থেকে বের হয়ে গেলে মিয়ানমার ভূরাজনৈতিক সামঞ্জস্য ধরে রাখবে। অবশ্য সু চি চান তার দেশ ভারতের সঙ্গেও অর্থনৈতিক আর রাজনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী রাখুক। ১৯৫০ এর দশকে তার মা ছিলেন ভারতে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত। সেখানেই কেটেছে তার শিক্ষাজীবনের একাংশ।

গত সেপ্টেম্বরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফর করেন। সেসময়ে তিনি সু চির সরকারকে সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি রাখাইন রাজ্যে উন্নয়ন উদ্যোগে সহায়তার প্রস্তাব দেন। মান্দালয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জাউ মিন্ট মং মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে কলকাতা সফর করে এসেছেন। চীন সফরে সু চির সঙ্গেও ছিলেন তিনি।

ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় চারটি রাজ্যের ১৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। ভারতের কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী মিয়ানমারের ভেতর থেকে তাদের কার্যক্রম চালায়। মিয়ানমারের সামরিক কর্তারা তাদেরকে বের করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। 

রাখাইন শান্ত দেখতে চায় বেইজিং

বেইজিং সফর আর চীনা নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে সু চি বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে মনে করা হয়। এমনকি আগের জান্তা সরকারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সব চুক্তিও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্ট থান সেইনের সময় স্থগিত হয়ে যাওয়া বিতর্কিত খনি স্থাপন চুক্তিও। রাখাইনের লেটাপাদং খনি প্রকল্প, কাইয়োকোফাই গভীর সমুদ্র বন্দর এবং এসম্পর্কিত পাইপলাইন ও রেলওয়ে প্রকল্পও পুর্নবিবেচনার মধ্যে রয়েছে।

কোন সন্দেহ নেই মিয়ানমারের সঙ্গে করিডোর স্থাপিত হলে চীনের বাণিজ্য আর রাজনৈতিক প্রভাব বাড়বে। এছাড়াও পরিকল্পিত হাইওয়ে, রেললাইন, পাইপলাইন ভারত মহাসাগরে চীনের সরাসরি প্রবেশযোগ্যতা নিশ্চিত করবে। এটা দেখার জন্য সবাই তাকিয়ৈ থাকবে যে সরকার কীভাবে রাখাইন রাজ্য ও ওই এলাকার মানুষের উন্নতির জন্য চীনের সঙ্গে দরকষাকষি করে।

ওই সমস্ত চুক্তি পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে বর্তমান সরকার চীনের সঙ্গে আবরও দর কষাকষির চেষ্টা চালাবে। এমন বাস্তবতায় রাখাইনের সংকট মোকাবেলায় শুরু থেকেই মিয়ানমারকে চীন সমর্থন করে গেছে তা মোটেই অবিশ্বাস্য কিছু নয়। এমনকি এই সংকট মোকাবেলায় মধ্যস্তাকারী হওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিলো তারা।

নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একটি চীনা প্রতিনিধি দল অবস্থা খতিয়ে দেখতে রাখাইন পরিদর্শনে যায়। আসিয়ানের অর্থনৈতিক আর সাংস্কৃতিক সংস্থার হয়ে চীনের ওই প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ছিলেন মিয়ানমারের হিনতা আকারি কোম্পানির কর্মকর্তারা। তারা সেখানে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন।

ওই সফরে বাংলাদেশ সীমান্তে বিদ্যমান বেড়ার সামর্থ বাড়িয়ে তা সম্প্রসারণের একটি প্রকল্পে মিয়ানমারকে সহায়তা করার প্রস্তাব দেয়।

এখন মনে হচ্ছে, চীন রাখাইন থেকে তাদের মনোযোগ সরিয়ে নিচ্ছে। যখন পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের জেনারেলদের নির্দিষ্ট করে অবরোধ আরোপের পরিকল্পনায় সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক মাপজোক করছে তখন চীন নতুন রাস্তা আর রেললাইন বানানোর চিন্তায় বিভোর।