(প্রিয়.কম) রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সে দেশে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর দমন অভিযান ও বর্বরোচিত নির্যাতনের বিষয়ে বহুল প্রতীক্ষিত দেশেটির নেত্রী অং সান সুচির ভাষণে সুস্পষ্ট বক্তব্য না আসায়, তা প্রত্যাখ্যান ও হতাশা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোট ও অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি।

২০ সেপ্টেম্বর বুধবার সুচির ভাষণের একদিন পর পৃথক দুটি অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও স্বাস্থমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই প্রতিক্রিয়া জানান।

রাখাইনে নির্যাতনের শিকার হয়ে গত তিন সপ্তাহে ৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বাংলাদেশে পালিয়ে আসা নিয়ে সমালোচনার মুখে ১৯ সেপ্টেম্বার মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর সুচি। এ ভাষণে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মোট আট লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ‘যাচাই করে’ ফেরত নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন সুচি। ভাষণের সময় তিনি রোহিঙ্গা শব্দটি একবারও উচ্চারণ করেননি।

এ সময় রাখাইনে সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা জানালেও সেনাবাহিনীর বিষয়ে কিছু বলেননি তিনি।

আর সুচির এই ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় বুধবার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে ১৪ দলের নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মতবিনিময় অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নে জোটের সমন্বয়ক ও স্বাস্থমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সুচির এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যানের কথা জানান।

নাসিম বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিয়ে সুচির দেওয়া কোনো বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। সব বক্তব্য আমরা প্রত্যাখ্যান করছি।’

এদিকে রোহিঙ্গাদের শিক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা দেওয়া এবং সেনা অভিযান ৫ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে বলে যে কথা সুচি বলেছেন, তা মিথ্যা বলে দাবি করেছেন একজন রোহিঙ্গা নেতা।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাসিম বলেন, ‘মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, যারা মিয়ানমারের নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে, আমরা ১৪ দলের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা করছি। আমরা নিন্দা করি সুচির আজকের এই ভূমিকাকে। তিনি শান্তিতে নোবেল পেয়ে কীভাবে এই নির্যাতনকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন? বলেও পশ্ন রাখেন তিনি।

এ সময় শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে চাপ দিতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাসিম বলেন, ‘আমরা আজকে অনুরোধ করব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ বিশ্বের বড় শক্তিধর দেশকে, তারা যেন এগিয়ে আসে। এই নিরীহ মানুষের দিকে তাকিয়ে মিয়ানমারকে চাপ সৃষ্টি করার জন্য।’

মানববন্ধনে রিজভী। ছবি: ফোকাস বাংলা   

এদিকে বুধবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞ বন্ধের দাবিতে জাতীয়তাবাদী ‍ওলামা দলের উদ্যোগে আয়োযিত এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘গণমাধ্যমে আমরা অং সান সু চির যতটুকু ভাষণ পড়েছি, তাতে হতাশ হয়েছি। সেই ভাষণ সমর্থনযোগ্য নয়। আপনার (সুচি) বক্তব্য মনে হচ্ছে সেখানে (রাখাইন) যারা জুলুম করছে, নারকীয় তাণ্ডব চালাচ্ছে, সেই সিকিউরিটি বাহিনীর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের অনুরূপ।’

সুচির বক্তব্যের সমালোচনা করে রিজভী বলেন, ‘আপনার বক্তব্যে আপনি বলেছেন, ৫ সেপ্টেম্বরের পরে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা হয়নি, বন্ধ হয়ে গেছে। আপনি আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত পরিচিত একজন নেত্রী সেই দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের জন্য। এতবড় মিথ্যা কথা আপনি বললেন কী করে?’

তিনি আরও বলেন, ‘তাহলে দুই সপ্তাহ ধরে এত গ্রাম পুড়ল, এত বাড়ি-ঘর আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হলো, এত মানুষের মৃত্যু, এত শিশুকে নাফ নদীতে নিক্ষেপ করা হলো, এসব অবলীলায় আপনি অস্বীকার করলেন।’

রিজভী বলেন, ‘আপনি (সুচি) একবারও রোহিঙ্গা কথাটি উচ্চারণ করেননি আপনার বক্তব্যে। আপনি বলেছেন সেখানে বসবাসকারী মুসলিম। আপনি তো গণতন্ত্রের নেত্রী নন, আপনি তো সাম্প্রদায়িক। আপনার দেশের রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু মুসলমান, হিন্দুও আছে। এই নির্যাতনের মধ্যে অনেক হিন্দুও নির্যাতিত হয়েছেন এবং বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। কিন্তু আপনি টার্গেট করে বলছেন মুসলিম। এটা তো ভয়ংকর ব্যাপার।’

যাচাই করে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে সুচির বক্তব্য মানবতাবিরোধী উল্লেখ করে রিজভী বলেন, ‘রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক, এটা সুচি তার বক্তব্যে স্বীকার করেননি। বরং তিনি তাদেরকে শরণার্থী স্ট্যাটাস দিতে চান- সেটা তার বক্তব্যে এসেছে।’ 

‘আমরা স্পষ্টভাষায় সুচিকে বলতে চাই, অবিলম্বে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে হবে’, বলেন তিনি।

প্রিয় সংবাদ/শান্ত