(প্রিয়.কম) মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান সেনা অভিযানে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে প্রতিদিনই হাজার হাজার রোহিঙ্গা নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে। মিয়ানমার ছাড়তে বাধ্য হওয়া এসব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিজ ভূমিতেই দীর্ঘদিন থেকেই পরবাসী। নিরাপত্তা চৌকি ও সেনা স্থাপনায় হামলার অভিযোগে গত ২৫ আগস্ট থেকে দেশটির সেনাবাহিনী রাখাইনের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় অভিযান শুরু করলে নতুন করে এ দমন-নিপীড়ন, নির্যাতন বেড়েছে। তবে বহু বছর ধরেই মিয়ানমারে দমন-নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গারা। রাষ্ট্রীয় আইন দিয়ে তাদের চলাফেরা আর সন্তান জন্মদানের মতো মৌলিক মানবাধিকার কেড়ে নিয়েছে দেশটির সরকার। ফাঁস হয়ে যাওয়া কিছু সরকারি নথি বিশ্লেষণ করে ২০১৪ সালে ‘ফরটিফাই রাইটস’ নামের একটি মানবাধিকার গ্রুপ অধিকার হরণের এই ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে।

১৯৪৮ সালে মিয়ানমারের স্বাধীনতার সময়ও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি ছিল। ১৯৬২-তে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করার পর নতুন করে সংকটের মুখে পড়ে রোহিঙ্গারা। ১৯৭৪ সালে সামরিক জান্তা ‘বিদেশি’ আখ্যা দেওয়ার পর ১৯৮২ সালে প্রণোয়ন করা হয় নাগরিকত্ব আইন। আর এই কালো আইনের মাধ্যমে অস্বীকার করা হয় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব। নাগরিকত্ব হরণ করে তাদের অস্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। সাদা কার্ড নামে পরিচিত ওই পরিচয়পত্রের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের দেওয়া হয় সীমিত কিছু নাগরিক অধিকার।

জাতিসংঘের সহায়তায় ২০১৪ সালে পরিচালিত আদমশুমারিতে রোহিঙ্গা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাধার মুখে পড়তে হয় রাখাইনের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের। তাদের শুমারি বয়কটের ঘোষণার মুখে সামরিক জান্তা সিদ্ধান্ত দেয় রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত হতে গেলে অবাঙালি হতে হবে। ২০১৫ সালে সাংবিধানিক পুনর্গঠনের সময়ে আদমশুমারিতে দেওয়া সাময়িক পরিচয়পত্র বাতিল করে সামরিক জান্তা।

পদ্ধতিগতভাবে রোহিঙ্গাদের বঞ্চিত করা হয় মৌলিক অধিকার থেকে। চলাফেরা, বাসস্থান নির্মাণ, শিক্ষা, চিকিৎসা, এমনকি চাকরির অধিকার থেকে আইনসিদ্ধভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে তাদের।

নিজ গ্রাম যেন কারাগার

মিয়ানমার সরকার বৌদ্ধ অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের মনে করে বাংলাদেশ থেকে আসা বহিরাগত। আর তা প্রতিফলিত করতে তাদের জন্য চালু রয়েছে ট্রাভেল পাস। রোহিঙ্গা নিপীড়নের কারণে বিতর্কিত হয়ে পড়া সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকার কাছ থেকে নিতে হতো এই ট্রাভেল পাস। পরে দেশটিতে বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) গঠিত হলে তারা এই পাস দিয়ে থাকে। নিজ গ্রামের বাইরে যেতে রোহিঙ্গাদের এই পাস নিতে হয়। ওই পাসে বাইরে যাওয়ার কারণ আর সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেউ গ্রামে ফিরতে ব্যর্থ হলে গ্রামের বাসিন্দাদের তালিকা থেকে তার নাম কাটা যায় এবং আটক করে পাঠানো হয় কারাগারে।
নিজ দেশে চলাচলের অধিকার বঞ্চিত রোহিঙ্গারা।  পালিয়ে আসা এই রোহিঙ্গার ছবিটি বাংলাদেশের শাহপরীর দ্বীপ থেকে তুলেছেন ফোকাস বাংলার আলোকচিত্রী: ফোকাস বাংলা

নিজ দেশে চলাচলের অধিকার বঞ্চিত রোহিঙ্গারা। পালিয়ে আসা এই রোহিঙ্গার ছবিটি বাংলাদেশের শাহপরীর দ্বীপ থেকে তুলেছেন ফোকাস বাংলার আলোকচিত্রী।

আবার এই পাস পাওয়াও সহজ নয়। যাবতীয় নিয়ম নীতি অনুসরণের পরও মেটাতে হয় কর্মকর্তাদের ঘুষের দাবি।

বিয়ে করতে অনুমতি, সন্তান ধারণে নিয়ন্ত্রণ!

১৯৯৩ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের মিয়ানমার সরকারের ফাঁস হয়ে যাওয়া ১২টি নথি পায় মানবাধিকার গ্রুপ ফরটিফাই গ্রুপ। ওইসব নথি বিশ্লেষণ করে ২০১৪ সালে করা তাদের প্রতিবেদনে দেখা যায় রাখাইনের রোহিঙ্গারা বিয়ে ও সন্তান জন্মদানে নিয়ন্ত্রণ আরোপের শিকার।

কোনো রোহিঙ্গার বিয়ে করতে হলে আর্থিক সঙ্গতির প্রমাণসহ নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে সরকারের কাছে আবেদন করতে হয় বলে ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়। নিয়মানুযায়ী এই আবেদন করা হলেও কাঙ্খিত অনুমতি পেতে লেগে যায় কয়েক বছর। নিজ জনগোষ্ঠীর বাইরে কাউকে বিয়ে করার কোনো বিধান সেখানে নেই। রাষ্ট্রীয় কোনো আইন না থাকার পরও বাইরের কারোর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে অন্য আইনের আওতায় তাদের ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার নজির রয়েছে। এ ছাড়া বিয়ের সময় দুই সন্তানের বেশি নেওয়া যাবে না বলেও সরকারের কাছে মুচলেকা দিতে হয় রোহিঙ্গাদের। দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে বিয়ে করতে বাধার মুখে পড়ে অমানবিক জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন রোহিঙ্গারা। অনুমোদন পাওয়ার আগেই যেসব রোহিঙ্গা মুসলিম ধর্মমতে বিয়ে করে ফেলেন, তারা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে পড়েন বাধার মুখে।

রোহিঙ্গা শিশুদের এই ছবিটি কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে তোলা। ছবি: ফোকাস বাংলা

রোহিঙ্গা শিশুদের এই ছবিটি কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে তোলা। ছবি: ফোকাস বাংলা

সন্তান ধারণ করে ফেললে তাকে গোপনে গর্ভপাত ঘটিয়ে ফেলতে হয়। তারপরও কোনো সন্তান জন্ম নিয়ে ফেললে তাকে তালিকাভুক্ত করতে বাধার মুখে পড়তে হয়। বাধ্য হয়ে বৈধ কোনো দম্পত্তির সন্তান হিসেবে তাকে তালিকাভুক্ত করতে হয়। আশ্চর্যজনক হলেও এমন নজিরও রয়েছে নিজের সন্তানকে মা-বাবার সন্তান হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে বাধ্য হয় রোহিঙ্গারা। আবার কখনো কখনো তারা সন্তানকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হন। অনেক সময় এসব শিশুর গন্তব্য হয়ে ওঠে বাংলাদেশের বিভিন্ন শরণার্থী শিবির।

বাড়ি সংস্কার আর মসজিদ নির্মাণে বাধা!

রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর নির্মাণ বা সংস্কারের ক্ষেত্রেও রয়েছে রাষ্ট্রীয় বাধা। ফরটিফাই গ্রুপের ওই রিপোর্টে বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করে দেখানো হয়, রাষ্ট্রীয় নীতি কীভাবে তাদের ন্যূনতম মানবিক অধিকারগুলোও হরণ করেছে। এ ছাড়া মসজিদ নির্মাণেও তাদের পড়তে হয় বাধার মুখে।

ছবিটি উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরের। ফোকাস বাংলার ছবিছবিটি উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরে ফোকাস বাংলার তোলা। 

চিকিৎসা এবং শিক্ষায়ও রাষ্ট্রীয় অবহেলার শিকার রোহিঙ্গারা

নাগরিক অধিকার তো অনেক দূরের বিষয়, সরকারি চাকরিতে পর্যন্ত নিষিদ্ধ রোহিঙ্গারা। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেও তাদের জন্য চিকিৎসা অপ্রতুল। সরকারি বড় হাসপাতালগুলোতে পদ্ধতিগতভাবে তাদের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার হরণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা চালাতে গিয়েও সরকারি বাধার মুখে পড়েছে।

মায়ানমারে নিরক্ষরতার হার ৪০ শতাংশ হলেও রাখাইন রাজ্যে তা ৮০ শতাংশ পর্যন্ত। রোহিঙ্গা এলাকাগুলোতে মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা খুবই কম। বাইরের স্কুলগুলোতে পড়তে যেতে হলে নিতে হয় ট্রাভেল পাস। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অনুমোদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ২০০১ সালে। তখন দূরশিক্ষণে রোহিঙ্গারা আগ্রহী হয়ে উঠলে ২০০৫ সালে তাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

তথ্যসূত্র: ফরটিফাই গ্রুপ, বিবিসি, সিএফআর.ওআরজি, গার্ডিয়ান

প্রিয় সংবাদ/শান্ত