(প্রিয়.কম) মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর সে দেশের সেনাবাহিনীর অভিযানকে এবার ‘এথনিক ক্লিনসিং’ বা ‘জাতিগত নিধন’ বলে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ণনা করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সুপারিশ অনুযায়ী বুধবার এক বিবৃতিতে এ কথা জানান তিনি।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমাদের হাতে যে সব তথ্য এসেছে, তা খতিয়ে দেখে ও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলেই এটা পরিষ্কার যে উত্তর রাখাইন প্রদেশের পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে একটা জাতিগত নিধনযজ্ঞ ছাড়া আর কিছুই নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘উস্কানির অজুহাত দিয়ে রাখাইনে সংগঠিত নৃশংসতাকে কোনোভাবেই আড়াল করা যাবে না। নিধনযজ্ঞের ফলে রোহিঙ্গারা ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সে কারণেই এর জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্টভাবে কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার কথা বিবেচনা করছে।’

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ ঘোষণা করতে ট্রাম্প প্রশাসনকে আহবান জানিয়ে আসছিল মার্কিন আইনপ্রণেতারা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। সম্প্রতি মিয়ানমার ও বাংলাদেশে সফর করেছেন মার্কিন সেনেটন জেফ মার্কলের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল।

ওই প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বলেছেন, তারা রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন-হত্যা-খুন-ধর্ষণের যে সব ঘটনা শুনেছেন তা তাদের গভীরভাবে বিচলিত করেছে।

রোহিঙ্গা নিপীড়নের এই অভিযানকে জাতিসংঘ ও বিশ্বের অনেক নেতাই ‘জাতিগত নিধন’ বলে ইতোমধ্যে আখ্যা দিয়েছেন। আর এশিয়াভিত্তিক দুটি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়াম ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়াভিত্তিক ফরটিফাই গ্রুপ যৌথভাবে ‘আমাদের মেরে ফেলার চেষ্টা হয়েছে’ শিরোনামের ৩০ পাতার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। 

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর পাহাড়সম প্রমাণ মিলেছে বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। এর আগে অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। 

এর একদিন পর গত ১৫ নভেম্বর বুধবার মিয়ানমারের কাছে রোহিঙ্গা সংকটের একটি গ্রহণযোগ্য তদন্ত চেয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সুচি এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে বৈঠক শেষে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই তদন্ত দাবি করে করেন। 

আগামী ২৬ নভেম্বর পোপ ফ্রান্সিসও মিয়ানমার সফরের কথা রয়েছে। ভ্যাটিকান জানিয়েছে, পোপ ওই সফরে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং লেইং ও সে দেশের ডি ফ্যাক্টো নেত্রী অং সান সু চি-র সঙ্গে বৈঠক করবেন।

প্রসঙ্গত, গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিধন অভিযান শুরুর পর প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৬ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসার এ ধারা অব্যাহত থাকলে শরণার্থীর সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।

এ নিয়ে বেশ কিছু এরিয়াল ফুটেজ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। সেখানে দেখা গেছে, উখিয়ার পালংখালির কাছে নাফ নদী পার হয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় জাতিসংঘ বলছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে জাতিগত নিধনে নেমেছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া এসব রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৯০ ভাগই হলো নারী, শিশু ও বৃদ্ধ।

জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মতে, পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে শিশু রয়েছে শতকরা ৬০ ভাগ। এর মধ্যে ১১শ’র বেশি রোহিঙ্গা শিশু পরিবার ছাড়া অচেনাদের সঙ্গে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। আর এসব শিশুর চোখের সামনেই তাদের বাবা-মাকে গুলি ও জবাই করে হত্যা, মা-বোনদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ঘর-বাড়িতে আগুন দেওয়াসহ ইতিহাসের নৃশংসতম ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে মিয়ানমারের সেনারা।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের দেওয়া সর্বশেষ প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের স্পষ্ট প্রমাণ হাজির করেছে।

সংস্থাটি বলছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দী, স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি-ভিডিও এবং সব ধরনের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ উপসংহারে উপনীত হওয়া যায় যে, ‘রাখাইনে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ চালানো হয়েছে এবং এটি মানবতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অপরাধ।’

এদিকে অভিযানের নামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী খুন, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, কুপিয়ে হত্যাসহ বর্বরতার চূড়ান্ত সীমাও অতিক্রম করেছে বলে অভিযোগ করেছে নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংস্থাটি বলেছে, ইতোমধ্যে প্রায় ২৮৮টি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

সংস্থাটি আরও জানায়, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে।

প্রিয় সংবাদ/আশরাফ