(প্রিয়.কম) নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে দুই লাখের বেশি শিশু ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল-ইউনিসেফ। ১২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ইউনিসেফ-বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা ইউনিটেরে প্রধান জঁ লিবির দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘যেভাবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢল শুরু হয়েছে, তা অভাবনীয়। শুধু ৪ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর— এই ছয় দিনে দুই লাখ ২০ হাজার মানুষ এসেছে বাংলাদেশে। এ ঢল যে কমবে, এর কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। এটি একটি বড় মানবিক বিপর্যয় আর এর বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা।’

প্রাথমিক তথ্য থেকে বলা যায়, মিয়ানমার থেকে এ যাবৎ যত রোহিঙ্গা এসেছে, এর মধ্যে ৬০ শতাংশই শিশু। ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত অন্তত তিন লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

রোহিঙ্গা শিশু। ছবি: ফোকাস বাংলা

রোহিঙ্গা শিশু। ছবি: ফোকাস বাংলা

ইউনিসেফের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ‘যেসব শিশু এসেছে, তারা কয়েক দিন ধরে নির্ঘুম। তারা ক্ষুধার্ত ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ ও বিপৎসংকুল যাত্রাপথ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাদের জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবা দরকার।’

পালিয়ে আসা শিশুরা অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বলে ইউনিসেফ জানায়। আন্তর্জাতিক সংস্থাটি মনে করে, এসব শিশুর সুরক্ষা এবং মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা দরকার।

এখন প্রতিদিন পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য একের পর এক শিবির তৈরি হচ্ছে। এসব শিবিরে নিরাপদ পানি এবং মৌলিক স্যানিটেশন-সুবিধা দরকার বলে মনে করে ইউনিসেফ।

রোহিঙ্গা শিশু। ছবি: ফোকাস বাংলা

রোহিঙ্গা শিশু। ছবি: ফোকাস বাংলা

জঁ লিবি বিবৃতিতে বলেন, ‘যেসব শিশু মা-বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, আমার বড় শঙ্কা তাদের নিয়ে। এখন পর্যন্ত আমরা এক হাজার ১২৮ শিশু পেয়েছি, যারা মা-বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চলে এসেছে। আগামী দিনগুলোতে এ সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আমাদের ধারণা।’

সম্প্রতি সহিংসতা শুরুর পর থেকে রাখাইন অঞ্চলের প্রায় ৩ লক্ষ ৭০ হাজারেরও বেশি সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। গত ২৪ আগস্ট গভীর রাতে বেশ কিছু পুলিশ পোস্টে একযোগে হামলার পর থেকে দেশটির সেনাবাহিনী নজিরবিহীন অমানবিক অভিযান শুরু করে। এর পর থেকেই বাংলাদেশমুখী শরণার্থীর ঢল নামে। 

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রধান যাইদ রাআ’দ আল হোসাইন সহিংসতার জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে অভিযুক্ত করে গৃহীত পদক্ষেপকে ‘স্পষ্ট বৈষম্য’ আচরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তারা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক বিষয়গুলোর তোয়াক্কাও করছে না বলে দাবি যাইদ। তিনি মিয়ানমার সরকারের প্রতি চলমান এ সংকট দ্রুত নিরসনের দাবি জানান। একইসঙ্গে রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার কথাও বলেছেন যাঈদ।’

রোহিঙ্গা শিশুর পাশে প্রধানমন্ত্রী।

রোহিঙ্গা শিশুর পাশে প্রধানমন্ত্রী। ছবি: ফোকাস বাংলা 

এদিকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গৃহীত পদক্ষেপগুলো আশাব্যঞ্জক। তিনি ১২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থা পরিদর্শনে গিয়ে মিয়ানমারের প্রতি ‘রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নিতে পদক্ষেপ গ্রহণের অহ্বান’ জানান। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার এ সমস্যার সৃষ্টি করেছে এবং তাদেরকেই এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক চাই।’

ইতোমধ্যে ১২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার থেকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে তালিকাভূক্ত করা শুরু করেছে।

অন্যদিকে, মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর সরকারি বাহিনীর চলমান নির্মম নির্যাতনের প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে। 

১৩ সেপ্টেম্বর বুধবার এ সভা অনুষ্ঠিত হবে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রধান মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ‘জাতিগত নিধন’ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বলে মন্তব্যের পর সংস্থাটির পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্ত এলো। এর আগে যুক্তরাজ্য এবং সুইডেন ক্রমবর্ধমান এ মানবিক সংকট নিরসনে নিরপত্তা পরিষদের কাছে বৈঠকে বসার আর্জি জানিয়েছিল। 

প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গারা।

প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গারা। ছবি: স্টার মেইল  

প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গা একটি নৃগোষ্ঠীর নাম যাদের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ ইসলাম ও ১০ ভাগ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। রোহিঙ্গাদের আদি আবাসস্থল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। শত শত বছর ধরে রাজ্যটিতে বাস করা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি না দিয়ে মিয়ানমার সরকার এ জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালাচ্ছে।

১৯৪৮ সালে মিয়ানমারের স্বাধীনতার সময়ও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি ছিল। ১৯৬২-তে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করার পর নতুন করে সংকটের মুখে পড়ে রোহিঙ্গারা। ১৯৭৪ সালে সামরিক জান্তা ‘বিদেশি’ আখ্যা দেওয়ার পর ১৯৮২ সালে প্রণোয়ন করা হয় নাগরিকত্ব আইন। আর এই কালো আইনের মাধ্যমে অস্বীকার করা হয় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব। নাগরিকত্ব হরণ করে তাদের অস্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। সাদা কার্ড নামে পরিচিত ওই পরিচয়পত্রের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের দেওয়া হয় সীমিত কিছু নাগরিক অধিকার।

জাতিসংঘের সহায়তায় ২০১৪ সালে পরিচালিত আদমশুমারিতে রোহিঙ্গা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাধার মুখে পড়তে হয় রাখাইনের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের। তাদের শুমারি বয়কটের ঘোষণার মুখে সামরিক জান্তা সিদ্ধান্ত দেয় রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত হতে গেলে অবাঙালি হতে হবে। ২০১৫ সালে সাংবিধানিক পুনর্গঠনের সময়ে আদমশুমারিতে দেওয়া সাময়িক পরিচয়পত্র বাতিল করে সামরিক জান্তা।

পদ্ধতিগতভাবে রোহিঙ্গাদের বঞ্চিত করা হয় মৌলিক অধিকার থেকে। চলাফেরা, বাসস্থান নির্মাণ, শিক্ষা, চিকিৎসা, এমনকি চাকরির অধিকার থেকে আইনসিদ্ধভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে তাদের। 

প্রিয় সংবাদ/শান্ত