(প্রিয়.কম) মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শিশুরা বাংলাদেশেও নির্যাতন ও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে বলে দাবি করেছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা (আইওএম)। আইওএমের বরাত দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্ট মাসে মিয়ানমারে নতুন সেনা অভিযান শুরুর পর এখন পর্যন্ত সাড়ে ৪ লাখ রোহিঙ্গা শিশু বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এসব শিশু মিয়ানমারে যেমন প্রহার, যৌন নির্যাতন, অমানবিক পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হয়েছিল, বাংলাদেশে এসে প্রায় একই অবস্থার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কক্সবাজারের সহকারী পুলিশ সুপার আফরুজুল হক টুটুল। তিনি জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে শিশুদের বের হওয়া ঠেকাতে ১১টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। প্রথমত কাউকে ক্যাম্পের বাইরে যেতে দেয়া হচ্ছে না। ক্যাম্পগুলোতে প্রতিনিধি রয়েছেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষও আছে। শিশুদের সেখানে প্রয়োজনীয় সহায়তাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো তারা দেখভাল করছেন। তারপরেও কাউকে বাইরে পাওয়া গেলে ক্যাম্পে এনে অভিভাবকদের কাছে দেওয়া হচ্ছে।

তবে আইওএম-এর দাবির সত্যতাও পাওয়া গেছে জানিয়ে রয়টার্স প্রতিবেদনে বলেছে, বেঁচে থাকার প্রয়োজনে রোহিঙ্গা শিশুরা সস্তায় শ্রম বিক্রি করছে। নিরাপত্তা আর অর্থের অভাবে মেয়েদের বাল্যবিবাহ দেওয়া হচ্ছে। অনেক শিশু আবার বাংলাদেশিদের দ্বারা যৌন নির্যাতনেরও শিকার হচ্ছেন। তাছাড়া এসব শিশুর প্রতি পাচারকারীদের লোলুপ দৃষ্টিও রয়েছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনী কর্তৃক জাতিগত নিধন অভিযানে হত্যা-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগের মহোৎসব থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাধ্যতামূলক দেশত্যাগে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে সাড়ে ছয় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা, যাদের অধিকাংশই শিশু। তা নিয়েই কাজ করেছে আইওএম।

আইওএম জানিয়েছে, শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গা শিশুরা চরম দারিদ্র আর অপুষ্টির সাথে যুদ্ধ করছে। ফলে একটু ভালভাবে বাঁচতে গিয়ে সস্তায় শ্রম বিক্রি করছে। 

রয়টারর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, আইওএম ও রোহিঙ্গা অধিবাসীদের অনেকেই জানিয়েছেন অল্প বয়সী শিশুরা অনেকেই স্থানীয় ফার্ম, নির্মাণ কাজ, মাছ ধরা, চায়ের দোকানে কাজ করা এমনকি নির্মাণ কাজ ও রিকশা চালানোর কঠিন পরিশ্রমের কাজেও লিপ্ত হয়েছে। এসব শিশুদের মধ্যে সাত বছর বয়সী ছেলে ও মেয়ে শিশুও রয়েছে। তবে মেয়েশিশুরা বেশির ভাগই গৃহপরিচারিকার কাজে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোহিঙ্গা শিশুর অভিভাবক জানিয়েছেন, তার ১৪ বছর বয়সী কন্যা চট্টগ্রামে এক বাসায় কাজ করেছে এবং পরে পালিয়ে এসেছে। সে যখন ক্যাম্পে ফিরে আসে, তখন সে ঠিকমতো হাঁটতেও পারছিল না।

তিনি দাবি করেন, তার মেয়ে যে বাসায় কাজ করত, সেখানে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তার মেয়েকে।

ওই শিশুর মা বলেন, ‘যে বাসায় আমার মেয়েটি ছিল, ওই বাসার গৃহকর্তা মদ্যপ ছিল এবং রাতের বেলায় আমার মেয়েকে ধর্ষণ করত। সে ছয় সাতবার এই কাজ করেছে।’

‘তারা আমার মেয়েকে কাজের জন্য কোনো পারিশ্রমিক দেয়নি’, অভিযোগ করেন তিনি।

রোহিঙ্গা শিশুদের পড়াশোনার প্রাথমিক দায়িত্ব পালন করেছে  কয়েকটি এনজিও। ছবি: ফোকাসা বাংলা

রোহিঙ্গা শিশুদের পড়াশোনার প্রাথমিক দায়িত্ব পালন করেছে  কয়েকটি এনজিও। ছবি: ফোকাসা বাংলা

রয়টার্সের সাথে কথা বলেছে এমন সাতটি রোহিঙ্গা পরিবার জানিয়েছে, তারা বাধ্য হয়েই শিশুদের অল্প বেতনে কাজ করতে পাঠিয়েছে। কিন্তু সেখানে বিভিন্ন ধরনের হয়রানিরও শিকার হচ্ছে।

এদেরই একজন ১২ বছর বয়সী মোহাম্মদ জুবায়ের। সে জানায়, তাকে প্রতিদিন ২৫০ টাকা বেতনে সড়কে নির্মাণ কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু ৩৮ দিন কাজ করার পর তাকে মাত্র ৫০০ টাকা দেওয়া হয়েছে। আরও টাকা চাওয়ায় শারীরিক নির্যাতনও সইতে হয়েছে। পরে জুবায়ের একটি চায়ের দোকানে কাজ নেয়। যেখানে তাকে ভোর হতে মাঝরাত অবধি কাজ করতে হয়।

আইওএম-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরাপত্তা আর আর্থিক অনিশ্চয়তায় অনেক রোহিঙ্গা অভিভাবক তাদের ১১ বছর বয়সী শিশুকন্যাকেও বিয়ে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে বিয়েতের রাজি হওয়ার জন্য তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করাও হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এদের অনেককে পরিণত হতে হয় দ্বিতীয় স্ত্রীতে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার কোনো ধরনের অর্থনৈতিক সহায়তা ছা্ড়াই তালাকের শিকার হতে হচ্ছে।

আইওএম-এর পাচারবিরোধী বিশেষজ্ঞ ক্যাটেরাইনা আরদানিয়ান বলেন, এ ধরনের নিগ্রহ শরণার্থী ক্যাম্পগুলোর স্বাভাবিক চিত্র। এ অবস্থা থেকে রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের সুরক্ষায় জরুরি সহায়তা প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত, ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরু হলে প্রাণ বাঁচাতে সাড়ে ছয় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে যাদের ৬০ শতাংই শিশু। ইউনিসেফের হিসেব অনুযায়ী শরণার্থী শিবিরে বর্তমানে ৪ লাখ ৫০ রোহিঙ্গা শিশু রয়েছে যার মধ্যে ২ লাখ ৭০ হাজারই নতুন। এসব শিশুর মধ্যে আবার অভিভাবকহীন ৩৬ হাজার ৩৭৩ টি শিশুও রয়েছে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে অন্তত ৫০ হাজার অন্তঃসত্ত্বা নারী রয়েছেন। পালিয়ে আসা শিশু শরণার্থীদের বাইরেও প্রতিদিন যোগ হচ্ছে প্রায় ১০০ নবজাতক। 

প্রিয় সংবাদ/রিমন