(প্রিয়.কম) এই উপমহাদেশে একজন পুরোদস্তুর গৃহিণীর জীবন সম্পর্কে একবার কল্পনা করুন তো! চোখের সামনে এমন একটি চরিত্র ভেসে ওঠে, যিনি সকালে সবার আগে ঘুম থেকে উঠেন, রাতে সবার শেষে ঘুমোতে যান। সকালে ঘুম থেকে ওঠে নাস্তা তৈরি করা, বাচ্চাকে স্কুলের জন্য তৈরি করা, হাজব্যান্ডকে অফিসের লাঞ্চ দেওয়া, সারাদিন বাসার কাজ, রান্না-বান্না, রাতে আবার সবাই বাসায় ফিরলে তাদের যত্ন-আত্নি করা! নিজের জীবনটা অার তাদের নিজের থাকে না! নিজের ইচ্ছা আকাঙ্খাকে অবদমিত রাখতে রাখতে একসময় এসব জীবন থেকেই হারিয়ে যায়। সবাই সবকিছু দেখেও যেন দেখে না! কিন্তু গৃহিণীদের জীবন কী এমন হওয়ার কথা ছিল!

গৃহিণীদের এমন জীবনের প্রতি নজর দিয়েছেন প্রখ্যাত ভারতীয় বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতা রাম সুব্রামানিয়াম। তিনি সম্প্রতি ভারতের ভোজ্য তেল কোম্পানি ‘রিজো’র জন্য একটি বিজ্ঞাপন নির্মাণ করেছেন, যেটি এখন আর শুধু একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের গণ্ডিতে আবদ্ধ নেই। বিজ্ঞাপনটি হয়ে উঠেছে ভারতীয় তথা এ উপমহাদেশের গৃহিণীদের অনুপ্রেরণা।

‘রিজো উইমেন’ নামের এ বিজ্ঞাপনে হাজব্যান্ড-সন্তান আছে, এমন একজন ভারতীয় নারীর স্বাধীন জীবন-যাপনের প্রতি আকাঙ্ক্ষা, এর পেছনে তার হাজব্যান্ডের অনুপ্রেরণা এবং প্রচলিত প্রথা ভেঙে নারীর বেরিয়ে আসাকে দারুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

বিজ্ঞাপনে বিবাহিত এক ভারতীয় নারী, যিনি পিঠে বিশাল এক ব্যাকপ্যাক নিয়ে একা একা ইতালি, ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ড সফরে বের হয়েছেন। যাকে বলতে শোনা যায়, ‘কেউ একজন বলেছিল, মানুষের জীবন নাকি আসলে দুইটা। দ্বিতীয় জীবন শুরু হয়, যখন কেউ উপলব্দি করতে পারে যে, তার জীবন আসলে একটাই। অর্থাৎ যা করার এই জীবনেই করে ফেলতে হবে। প্রচলিত প্রথা ভাঙা খুব কঠিন একটা কাজ। কিন্তু আমার হাজব্যান্ড আমাকে প্রচলিত ভুল প্রথা ভাঙতে সাহায্য করেছে।’

বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়েছে, বাঁচতে হলে ‘একশতে একশ’ ভাগই বাঁচো, যেটি আবার রিজো ওয়েলেরও ব্যবসায়িক দর্শন। প্রতিষ্ঠানটি তাদের পণ্যের সাথে ‘Live 100/100’ কথাটি সবসময় ব্যবহার করে।

রাম সুব্রামানিয়াম বলেন, ভারতীয় গৃহিণীরা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি উচ্চ শিক্ষিত এবং যোগ্যতাসম্পন্ন। এ বিজ্ঞাপনটি তাদের চোখ খুলে দিতে এবং জীবনকে নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করছে।

বিজ্ঞাপনটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হওয়ার পর নিজের লেখা এক কলামে এর বিভিন্ন দিক ও যথার্থতা নিয়ে ওঠা বিভিন্ন প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছেন পরিচালক রাম সুব্রামানিয়াম।

বিজ্ঞাপনের ওই নারীকে ভারতীয় পোশাকে দেখা গেছে? তাকে আধুনিক পোশাকে দেখা গেল না কেন? ভারতীয় পোশাকে উপস্থাপন করে ওই নারীকে সেকেলেভাব উপস্থাপন করা হয়ে গেল না?

-এ প্রশ্নে আমি খানিকটা অবাক হয়েছি। ভারতীয় সেলোয়ার কামিজে একজন নারীকে উপস্থাপন করলে সেটি সেকেলে হতে যাবে কেন? বিজ্ঞাপনের ওই নারীকে সে দেশে যেভাবে থাকে, সেভাবেই এমনভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছি। যাতে যে কেউ তাকে নিজের বোনের সাথে মেলাতে পারে। বিজ্ঞাপনে দেখিয়েছি সে নিজে যা পরতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে সেটিই পরছে। 

কেন সে সবসময় তার ব্যাকপ্যাক সাথে রাখে?

-আমি রিজো উইমেনকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছি যে নিজেই নিজের ভারী ব্যাগ বহন করতে সক্ষম। ১৮ কেজি ওজনের ব্যাগ কাঁধে নিয়েও সে ভ্রমণের পূর্ণ তৃপ্তি পেতে পারে।  অর্থাৎ একজন বিবাহিত নারীও তার সব দায় দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে পারে, সব দায়িত্ব সামলে নিজের জীবনকে উপভোগ করতে পারে, এটা করতে তার কোনো অসুবিধা হয় না।

কেন সে একা একা ভ্রমণে বের হলো? তার কি কোনো বন্ধু-বান্ধব নেই?

-কোনো বন্ধু-বান্ধবের সাথে পার্টি করতে বেরিয়েছে, এমন কোনো নারীকে উপস্থাপন করতে চাইনি আমি। এটি একটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন হলেও আমি এর মাধ্যমে চেয়েছিলাম- সমাজে একটা পরিবর্তন আসুক, মানুষ নতুন করে ভাবুক। আমি বিবাহিত ভারতীয় নারীদেরকে একা একা ভ্রমণে বের হতে দেখলে আরও বেশি খুশি হব।

দেখুন, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি উচ্চ শিক্ষিত এবং যোগ্য গৃহিণী আছে ভারতে। তাদের নিজেদের অনেক শিক্ষা ও যোগ্যতা থাকা সত্বেও অর্থের জন্য তারা হাজব্যান্ডের ওপর নির্ভরশীল। কোনটা ভালো কোনটা মন্দ, তা তাদেরকে অন্য কারও কাছ থেকে জিজ্ঞেস করতে হয়।

এমনকি অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী একজন নারীকেও একা একা ভ্রমণের জন্য তার হাজব্যান্ড ও পরিবারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। একবার ভাবুন তো, তারা এ বিজ্ঞাপনটি দেখছে এবং একা একা ভ্রমণের পরিকল্পনা করছে, ব্যাপারটা কেমন হবে!

আমাদের দেশে নারী স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে আরও অনেক কাজ করতে হবে। আমি মনে করি সে পথে এটি আমার খুব ছোট একটি পদক্ষেপ।

প্রিয় সংবাদ/রিমন