মাহবুব জামান। ছবি: রিয়াজ আহমেদ। 

(প্রিয়.কম) প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে তা বিশ্বের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রতিষ্ঠান ডাটা সফট। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান শুধু বাংলাদেশে নয়, তার বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিয়ে আমেরিকা, ইউরোপ ছাড়াও জাপানে নিজস্ব অফিস নিয়ে পৌঁছে গেছে ডাটাসফট। তৈরি করেছে বাংলাদেশের প্রথম ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ল্যাব। আর এই সবকিছুর পেছনের কারিগর হচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব জামান। সম্প্রতি প্রিয়.কমের সাথে আলাপকালে আইওটি নিয়ে তাদের কার্যক্রম, প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনাসহ আরো অনেক বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি।

প্রিয়.কম: প্রযুক্তি আমাদের জীবনে কেমন প্রভাব ফেলছে? 

মাহবুব জামান : আজকে যেই বিজ্ঞান নিয়ে আমরা কাজ করছি, সারা দুনিয়া তোলপার হচ্ছে। এই ধরুন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই আপনি দেখতে পাচ্ছেন ফেসবুক আপনাকে ছয় বছর আগে কি করেছেন ছবিসহ সেগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে। কারণ তাদের কাছে আপনার দেওয়া সেই তথ্য বা ডাটাগুলো আছে। ডাটাগুলো প্রতিমুহূর্তে অ্যানালাইসিস করছে। আপনার নামটা বের করে এবং আপনার এবং আপনার বন্ধুর নামটা বের করেই সে এই সব কিছু করতে পারছে। এই যে ডাটা, এটা আপনার কাছে টেরাবাইটস অব ডাটা থাকতে পারে, এক্সাবাইটস, জেটাবাইটস অব ডাটা থাকতে পারে। এটা যদি আপনি অ্যানালাইসিস না করেন, যদি ঠিকমত কাজে লাগাতে না পারেন, সেখান থেকে যদি প্রেডিকশন না করতে পারেন তাহলে এগুলো গার্বেজ। এটা করবে কে? করবে হচ্ছে যারা নাম্বারস এবং লজিকে স্ট্রংস তারা। আমরা মনে করি এখন হচ্ছে একটা যথার্থ সময় বাংলাদেশের জন্য। এটাকে যদি ঠিকমত আমরা চর্চা করতে পারি, তাহলে ইকোনমির একটা সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। 

প্রিয়.কম: তাহলে কি আমাদের ইকোনমির বৃহৎ অংশ পরিবর্তন হয়ে আইটি খাতের ওপর নির্ভরশীল হবে?

মাহবুব জামান : আমাদের ইকোনমির প্যাটার্ন তো চেঞ্জ হবেই। মনে হয় পাঁচ সাত বছরের মধ্যে আইটি উইল বি লাইফ লাইন ফর আওয়ার কান্ট্রি। কিন্তু সেটা করতে হলে করতে হবে কি- এখনও প্রযুক্তিটা যেই জায়গায় আছে সেখানে একটা লিভ ফ্রগ জাম্প দিতে হবে, জাম্প দিয়ে সেইটাকে ধরতে হবে। যেই কারণে আমরা আইওটি ল্যাব করেছি, আমরা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ল্যাব করেছি। যেই কারণে আমরা বলছি যে, আমাদের একেকটা বিশ্ববিদ্যালয়কে একেকটা বিষয়ে সমৃদ্ধ বা অভিজ্ঞ করা উচিত। এখন কিন্তু সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আইওটি ল্যাব তৈরি হচ্ছে। আসলে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আইওটি ল্যাব দরকার নেই। আমরা যদি বলি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট এবং রাজশাহী ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট; তারা মিলে ওখানে একটা ভিআর স্টুডিও এবং ল্যাব করতে পারবে। এভাবেই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে ন্যানো টেকনোলজিতে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) রোবটিক্সে, জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্সে অভিজ্ঞ করে তোলা হোক। শিক্ষা ক্ষেত্রে যদি আমরা  নতুন প্রযুক্তিগুলোকে না আনি, শুধু পুরাতন প্রযুক্তিগুলোকে নিয়ে নাড়াচাড়া করি, তাহলে কিন্তু আমরা ভালো কিছু করতে পারবো না।

প্রিয়.কম: তাহলে এ খাতে আমাদের সম্ভাবনা তৈরি হবে কীভাবে?

মাহবুব জামান : এসব ক্ষেত্রে আবার একটা চ্যালেঞ্জ আছে। চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে আপনার সাহস করেই নতুন কিছু করতে হবে। আবার করতে গিয়ে কিন্তু প্রস্তুত করা কোন রিসোর্স পাবেন না। এজন্য আমাদের কতগুলো চ্যালেঞ্জিং স্টেপস নিতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশের আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে দেশের বড় যেই শিল্প-বাণিজ্য গ্রুপগুলো আছে, তাদের কেউই নেই। বেক্সিমকো গ্রুপের কথাই যদি বলি, আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে কোন খাতে তাদের প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়নি, শুধু মাত্র তাদের সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানটি ছাড়া। তারা ব্যাংকিং সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করেছিলো। কিন্তু হঠাৎ করে তারা সেটা নিয়ে আগানো বন্ধ করে দিল। অথচ আপনি যদি পাশের দেশ ভারতের দিকে তাকান, তাহলে দেখতে পাবেন টাটা, বিরলা, আম্বানী বড় বড় সব গ্রুপ অব কোম্পানীগুলো এই খাতে এসে সফল হয়েছে। প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে কি আমরা সফল হতে পারবো না? পারবো, তবে আমাদের ভিন্ন পদ্ধতিতে এগোতে হবে। আমাদের দেশে তরুণ প্রজন্মরা মিলে ছোট ছোট কিছু কোম্পানি করবে। যা এক'শ থেকে হাজারে পরিণত হবে, যাদের প্রত্যেকটি কোম্পানি হবে আলাদা আলাদা সাবজেক্ট নিয়ে। তারা প্রত্যকেই তাদের নিজ নিজ বিষয়ে পারদর্শী হবে। ওই কোম্পানিগুলোর সাইজ হবে ২০ জন থেকে ২৫ জনের। ভারতের মতো এক লক্ষ দেড় লক্ষ হবে না। কিন্তু ওই ২০ জন নিয়ে কোম্পানিটা এমন একটা জিনিস তৈরি করবে যা বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশেরও যেন কাজে লাগে। সেই রকম রেয়ার সল্যুশন হতে পারে, অগমেন্টেড রিয়্যালিটি সল্যুশন হতে পারে, আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স নিয়ে হতে পারে। এখান থেকেই আমরা অনেক বড় সফলতা অর্জন করতে পারবো, বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থন আরো শক্ত করে তুলে ধরতে পারবো।

প্রিয়.কম: আপনাদের আইওটি ল্যাবের কার্যক্রম সম্পর্কে বলুন। 

মাহবুব জামান : এই ল্যাবটির মাধ্যমে ৩ শতাধিক আইওটি ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হবে। আমাদের আইওটি ল্যাবে সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ক্লাস নেন কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির একজন শিক্ষক প্রফেসর মাইকেল ওন। তিনিও আইওটি নিয়ে অনেক স্টার্টআপ তৈরি করেছেন, এগুলো নিয়ে কাজ করেছেন। সে একজন উদ্যোক্তাও বলতে পারেন। ১১টার পর থেকে এখানকার স্থানীয় শিক্ষকদের মাধ্যমে আমরা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস নিচ্ছি। কারণ এখানে আমরা প্রজেক্ট বেইজড শিক্ষা দিচ্ছি, এইটা কিন্তু ট্রেইনিং না। তাই মাইকেলের কাজ শেষেই তাদেরকে যন্ত্রপাতি দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ব্রেড বোর্ড দেওয়া হচ্ছে। তারা তখন প্রত্যেকেই নিজ নিজ একটা প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছে। এটা হচ্ছে অনেকটা সাতার শেখার মতো। আপনি যতই বইয়ের পড়া পড়ান, পানিতে না নামানো পর্যন্ত কেউ সাঁতার শিখতে পারে না। সেভাবেই তাদের প্রত্যেককে একেকটা প্রজেক্ট দেওয়া হয়েছে, দেশের ও দেশের বাইরের কিছু প্রজেক্ট আছে। এতে করে তারা কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে এবং পরবর্তী দিনই মাইকেলকে তারা জিজ্ঞেস করছে আমাদের এখানে সমস্যা হয়েছে, এটা পারছি না। এভাবেই আইওটি নিয়ে তাদেরকে আমরা গড়ে তুলছি। এখানে যারা কাজ শিখছে, তারা শেষ করে এখানেই জয়েন করবে, বলতে পারেন-অন জব ট্রেইনিং। এখন ৩০ জন শিখছে এবং এদের পরবর্তীতে আরো ৯০ জনকে সেখানো হবে। এদের সবাইকে কিন্তু জাপানের জন্য তৈরি করা হয়েছে। 

প্রিয়.কম: ডাটাসফটকে নিয়ে আপনাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?

মাহবুব জামান : আমরা শুধু ডাটা সফট দেখিনা, আমরা পুরো আইটি ইন্ডাস্ট্রিটা দেখি। আমরা ভাবি, এই আইটি ইন্ডাস্ট্রি কি হতে পারে, কেন হতে পারে। আমরা হঠাৎ করে ভাবি নাই আমাদের ফিউচার ইকোনমি হবে আইটি, কিন্তু এই চিন্তা ভাবনা হুটুহাট করে হয় নি, ধীরে ধীরে ভাবতে ভাবতে এই পর্যন্ত এসেছে। আমরা এখন বিশ্ববাজারে ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রি রেভুলেশনে আছি। যার মূল প্রতিপাদ্য বিস্তারিত হচ্ছে ইনফরমেশন টেকনোলজি বা তথ্য প্রযুক্তি। আর এই আইটির জন্য আপনার অনেক ক্যাপিটালিটি মেশিনারিজের দরকার হয় না। অনেক টাকা বা অনেক জমিজমার কথা বলি তা কিন্তু লাগবে না। লজিক এবং নাম্বারস এই বিষয়টার ওপর আমাদের এই পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ আমাদের বাংলাদেশটা ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ ছিল। আমরা যেই প্রতিযোগিতার কথা বলি বা অ্যালগরিদমের কথা বলি বা ইনফরমেশন টেকনোলজি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সি, ভার্চুয়াল বা অগমেন্ডেন্ট রিয়ালিটি দেখি এই সবকিছুই নাম্বার ও লজিকের সমন্বয়ে। এইটা আমরা ইন হেরিপ করি বাঙালি জাতি। আপনি দেখেন গাছের মানে উদ্ভিদেরও যে প্রাণ আছে তা কিন্তু পৃথিবীর মানুষ প্রথম জেনেছে একজন বাঙালির কাছ থেকে। আমাদের বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু এই তথ্য আবিষ্কার করেছিলেন। এগুলো কিন্তু শত শত বছর আগের কথা। কাজেই আমাদের বিজ্ঞানের কিন্তু ঐতিহাসিক একটা ভিত্তি আছে। 

সম্পাদনায়: এম. মিজানুর রহমান সোহেল/ গোরা