(প্রিয়.কম) ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রয়াণ দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে কতিপয় বিপথগামী সেনা কর্মকর্তাদের হাতে স্বপরিবারে প্রাণ হারান তিনি। বঙ্গবন্ধুর প্রয়াণ দিবসে তাকে স্মরণ করে প্রিয়.কম এর সাথে কথা বলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (বিএফডিসি)র সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিটিভির সাবেক মহাপরিচালক নাট্যব্যক্তিত্ব পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়।

প্রিয়.কম: আপনি তো ছাত্র জীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আপনার। সেই সময়ের উল্লেখযোগ্য স্মৃতি সম্পর্কে বলুন

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: আমি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হই ১৯৬৬ সালে। তার আগে মিছিলে যাওয়া-আসা ছিল। ৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনের সময় থেকে সক্রিয় হলাম। ৬৭-৬৯ সালে আমরা ফরিদপুর জেলা পর্যায়ের নেতৃত্বে চলে আসি। আমরা যেহেতু ফরিদপুর জেলার রাজনীতি করতাম সে কারণে বঙ্গবন্ধুর কাছে যাওয়ার সুযোগ হতো। ফরিদপুরের ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি আমাদেরকে কতগুলো আলাদা নির্দেশ দিতেন, সেই সময় তার কাছে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। সব থেকে বেশি কাছে যেতে পেরেছি ৭০ এর নির্বাচনের সময়। ৭০ এর ১২ নভেম্বর দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস হয়, লাখ লাখ মানুষ তখন মারা গেছে। সে সময় ত্রাণ কাজে আমরা তার খুব কাছে এসেছিলাম। তিনি আমাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন ত্রাণ কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। আওয়ামীলীগের পুরানা পল্টনে অফিসে তিনি এই নির্দেশনা দিলে আমরা তাকে বললাম পরের মাসে ইলেকশন হবে এখন ইলেকশনের কাজ ফেলে কীভাবে ত্রাণ কাজে যাবো...বলা শেষও করিনি, তিনি ধমকে উঠলেন- মানুষ আগে, নাকি রাজনীতি আগে? মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে পারলে আমার ভোট এমনেই আসবে। এই কথাটা আমি জীবনেও ভুলতে পারবো না।

প্রিয়.কম: ১৫ আগস্টের সেই কলঙ্ককর দিনের কথা বলুন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আপনারা কীভাবে নিজেদের সামাল দিয়েছিলেন?

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: আমি তখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকি। মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ, সম্ভবত থিসিসের কাজ বাকী। ১৫ আগস্টের আগের রাতে আমাদের উত্তেজনা, পরদিন বঙ্গবন্ধু যাবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আলপনা আঁকা হচ্ছে, উৎসবমুখর পরিবেশ। সে সময় রেডিও ছাড়া যোগাযোগের আর কোনো মাধ্যম সহজ ছিল না। সেটাও তো সবার কাছে ছিল না, আর অত ভোরবেলা কেউ রেডিও শুনেও না। আমাদের হলের পাশে একটা টং দোকান ছিল, তারা প্রথম রেডিওতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর শুনে আমাদের জানায়। আমরা হতবিহ্বল হয়ে পড়লাম, বুঝতে পারছিলাম না কি করবো। আমাদের মধ্যে অনেকেই চিৎকার করে কাঁদছিল। যে কিনা এই বাংলাদেশের মানুষের জন্য বুক পেতে দাঁড়িয়েছেন, তাকে কিনা হত্যা করেছে কিছু বাঙালি- এটা ভাবা যায়?

প্রিয়.কম: বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত উদ্যোগে এফডিসির যাত্রা শুরু হইয়েছিল, কিন্তু গত ৪৬ বছরেও তাকে নিয়ে উল্লেখযোগ্য একটি চলচ্চিত্র কেনো নির্মাণ করা হলো না?

পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়: তাকে নিয়ে কোনো চলচ্চিত্র হয়নি, এটা তো অবশ্যই বিশাল কষ্টের, দুঃখের এবং আশ্চর্যেরই ব্যাপার। এটা একটা বড় প্রশ্নের জায়গা। কিন্তু আমি একটা কথা বলি- তিনি যে দূরদর্শীতা দেখিয়ে ১৯৫৭ সালে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক জায়গা তৈরি করে দিয়ে গেলেন, আজকে এত বছর পরে এসেও ওই জায়গাটি কেনো এত নড়বড়ে, এটা আমি খুঁজে পাই না।   

প্রিয়.কম: আপনি বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং এফডিসি দুটি প্রতিষ্ঠানেরই শীর্ষ পদের দায়িত্বে ছিলেন, আপনার পক্ষ থেকে কি কোনো উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন?

পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়: কোনো ব্যক্তি কখনো একা কোনো প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারে না। আমি আমার সাধ্য মতো চেষ্টা করেছি কিন্তু আমার সামনে অনেক বাঁধা ছিল। বঙ্গবন্ধুর উপর চলচ্চিত্র নির্মাণে আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের দুই প্রতিষ্ঠানের সাথে কথাও বলেছিলাম, সুন্দর একটা চিত্রনাট্যও ছিল আমার কাছে, কিন্তু দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি আমাকে সাহায্য করেনি। বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসে, এমন অনেক মানুষের প্রচুর টাকা আছে, তারা কেনো এগিয়ে আসছে না? সব কিছুতে কেনো রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করত হবে?

প্রিয়.কম: গত ৪৬ বছরে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নাট্যগ্রন্থ লেখা হয়েছে দুইটি। দুজনই বর্তমানে প্রবাসী। তার মধ্যে একটি আব্দুল গাফফার চৌধুরীর লেখা। দেশে কী এমন কেউ নেই যে এই তাকে নিয়ে একটি ভালো উপন্যাস, নাটক কিংবা চলচ্চিত্র লিখতে বা নির্মাণ করতে পারে?

পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়: আগেই তো বললাম- সত্যিই দুঃখজনক। নিশ্চয় কেউ না কেউ আছেন। আমাদের প্রজন্ম পারেনি, কিন্তু আমার আশাবাদ তরুণরা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ঠিকই চলচ্চিত্র নির্মাণ করবে

প্রিয়.কম: আবদুল গাফফার চৌধুরীর রচনায় এবং পরিচালনায় নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’তে বঙ্গবন্ধু চরিত্রে অভিনয় করেছেন আপনি, এই গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা থাকলেও, কেনো সেটা সম্ভব হলো না?

পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়: আমি এই বিষয়ে আসলে কিছু জানি না। আপনার মতো আমিও পত্রপত্রিকায় শুনেছি। গাফফার ভাই এর সাথে এই বিষয়ে আমার কখনো কথা হয়নি।

প্রিয়.কম: নির্মাণশৈলী নিয়েও প্রশ্ন আছে। এত বড় উচ্চতার একজন মানুষের জীবনের উপর কাজ কি আরো বেশি যত্ন নিয়ে বানানো উচিৎ ছিল বলে মনে করেন না?

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়: এই প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে গাফফার ভাই অনেকের দ্বারে ঘুরেছেন, তাকে সাহায্যের জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি, ফলে তাকে নিজ উদ্যোগে এটা বানাতে হয়েছে। নির্মাণ হয়তো উন্নতমানের হইয়নি, আমি স্বীকার করছি কিন্তু এটি নির্মাণে যেই উপকারটি হয়েছে- মানুষ বঙ্গবন্ধু হত্যার পিছনের ষড়যন্ত্রটা জানতে পেরেছেন। কারা সেই ষড়যন্ত্রের কলাকুশলী সে বিষয়ে ধারণা পেয়েছেন।

প্রিয়.কম: আবদুল গাফফার চৌধুরীর এই গল্পটাই আমাদের দেশের অন্য কোনো নির্মাতা নির্মাণ করলে হয়তো নির্মাণ কৌশলে পরিবর্তন আসতো

পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়: অবশ্যই। কেউ চাইলে এই কাজ এখনো করতে পারে।

প্রিয়.কম: চাষী নজরুল ইসলাম মৃত্যুর আগে এক সাক্ষাতকারে নাকি বলেছিলেন- তার সংগ্রাম সিনেমার একটি সিনে পীলখানা রোডে সত্যি সত্যি বঙ্গবন্ধু অংশ নিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা এবং অভিনেতা খসরু তাকে রাজী করিয়েছিলেন। এর সত্যতা সম্পর্কে আপনি জানেন কী?

পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়: আমি এই বিষয়ে কিছু জানি না।

প্রিয়.কম: কিছুদিন আগে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন বঙ্গবন্ধুর জীবনের উপর সিনেমা নির্মাণে ভারতীয় খ্যাতিমান নির্মাতা এবং অভিনয় শিল্পীদের সহযোগীতা নেওয়া হবে। আমাদের দেশের নির্মাতা বা শিল্পীদের পক্ষে কী তা করা অসম্ভব?

পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়: মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে নাকি সে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথে এই বিষয়ে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়েছে বলে আমি শুনেছি। আপনার মতো আমারও একই প্রশ্ন- বাংলাদেশে কী এমন কেউ ছিল না, যে এই কাজটি করতে পারে?  যাকগে, আফসোস করে আর লাভ নেই। আমার ধারণা ইংল্যান্ড, আমেরিকা বা ফ্র্যান্সের মতো কোনো দেশে যদি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোনো সিনেমা বানানো হয়, সারা বিশ্বে আলোড়ন পড়বে, বঙ্গবন্ধু হিমসেলফ একজন মহানায়ক। আমাদের দেশে মার্কিটিং এর অবস্থা ভালো না, শুধু সিনেমা বানালেই চলে না, এর প্রচারের ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে।

প্রিয় বিনোদন/গোরা