(প্রিয়.কম) রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান হত্যা-নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নারীদের একটা বড় অংশ মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতে যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া এসব নারীরা লোকলজ্জার ভয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় চিকিৎসকরা।

পালিয়ে আসা শরণার্থীরা জানিয়েছেন, পুরুষরা যেমন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তেমনি নারীরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এমনকি অনেক নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা মো. ইলিয়াস জানান, পালিয়ে আসার সময় তিনি একজন নারীকে ধর্ষিত হতে দেখেছেন। ওই নারীর কোলে তার শিশু সন্তান ছিল। পরে আরো পাঁচটি মরদেহের সাথে ঐ নারীর অর্ধপোড়া মরদেহ দেখতে পেয়েছেন তিনি।

উখিয়াতে পালিয়ে হাজেরা বেগম বলেন, ‘আমি নির্যাতনের পরেও প্রাণে বেঁচে গিয়েছি। কিন্তু অনেক মেয়ে আছে যাদের ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। নির্যাতনের পর আমার মত অনেক নারীই চিকিৎসা নিতে চেয়েছে। বিশেষ করে যাতে করে গর্ভধারণের ঝুঁকি মুক্ত থাকা যায় সেজন্য ওষুধ পর্যন্ত চেয়েছে। কিন্তু পায়নি।’

কক্সবাজারের উখিয়ার পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১৮টি ঘটনার কথা জানা গেছে। তবে এই সংখ্যা আরো বেশি। আমি ছয়জন মায়ের সাথে কথা বলেছি যারা বার্মার মিলিটারির হাতে ‘জুলুমের শিকার’ হয়েছেন। তাদের কোলে সন্তান ছিল আর চেহারায় ছিলো বেদনা, কষ্ট ও আতংকের ছাপ।’

তিনি বলেন, ‘আমরা মাঠ পর্যায়ের যে তথ্য পাচ্ছি তাতে আমাদের শঙ্কা ও আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের বিষয়ে রোহিঙ্গা নারীরা মুখ খুলছেন না। ফলে তাদের প্রয়োজনীয় সেবা দেয়ার কাজটা কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু সনাক্ত না করা গেলে বড় ধরণের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পরতে পারেন ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার এ সব রোহিঙ্গা নারী।’

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, স্বাস্থ্যকর্মীরা এখন ক্যাম্পে ক্যাম্পে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন যাতে যৌন নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গা নারীদের চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয়। এখন পর্যন্ত যে সব নারীদের সনাক্ত করা গেছে তাদের চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। তাদের কাউন্সেলিং বা পরামর্শও দেয়া হচ্ছে।

এদিকে ১৩ সেপ্টেম্বর বুধবার দুপুরে তেজগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাদের নির্যাতনের বর্ণনা শুনেছি। যতগুলো নারী এসেছেন তাদের নব্বই শতাংশ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। 

প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ২৫ আগস্ট থেকে নতুন করে সেনা অভিযান শুরু হয়। এ অভিযানে এখন পর্যন্ত ৪০০ জনকে হত্যা এবং ২৬০০ ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার কথা শিকার করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। জাতিসংঘ বলছে, অক্টোবরের পর এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে। প্রতিদিনই এ সংখ্যা বাড়ছে। 

‘গত দুই সপ্তাহে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে’ করে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর’র। জাতিসংঘ ধারণা করেছিল সংঘর্ষের জেরে এবার তিন লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু ইতিমধ্যেই সংস্থাটির ধারণারও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে।

মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা এবার ৩ লক্ষ ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করছে জাতিসংঘ। ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার শিকার হয়ে তারা ধাপে ধাপে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র ভিভিয়ান তান

এর আগে জাতিগত দ্বন্দ্বের জেরে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো একই রকম অভিযানে কয়েকশত রোহিঙ্গা নিহত হয়। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় হাজারো ঘরবাড়ি। ওই অভিযানের বর্বরতায় বাধ্য হয়ে অন্তত ৮০ হাজার রোহিঙ্গা পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

প্রিয় সংবাদ/শিরিন