২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর গভীর রাতে ভারতের দিল্লিতে এক মেডিকেল পড়ুয়া শিক্ষার্থীকে (ছন্দনাম দামিনী, যার প্রকৃত নাম ‘জ্যোতি সিং পান্ডে’) সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে ৬ বাসশ্রমিক। পরে ওই মেয়ে এবং সাথে থাকা ছেলে বন্ধুকে ব্যাপক মারধর করে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলা হয়। ঘটনার পর ১৪ দিন সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েন দামিনী। কিন্তু ধর্ষক নরপশুদের নিপীড়নের মাত্রা এতটাই বেশি ছিল যে ২৯ ডিসেম্বর ভোর রাতে  মৃত্যুর কাছে হার মেনে পৃথিবী মায়া ত্যাগ করেন দামিনী। লোমহর্ষক এই ধর্ষণ ঘটনার দ্রুত বিচার করে ভারত সরকার। বিচার চলাকালীন রাম সিং নামক এক আসামি মারা যায়। বাকি চার ধর্ষক মুকেশ সিং, বিনয় শর্মা, পবন গুপ্ত, অক্ষয় ঠাকুরকে মৃত্যুদণ্ড দেয় সে দেশের আদালত। ওই ঘটনা ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বাংলাদেশেও ওই ঘটনার প্রতিবাদে সভা-সমাবেশ হয়েছিল। ওই ছাত্রীর পরিবারকে ১৫ লাখ রুপি আর্থিক সহায়তা এবং পরিবারের একজন সদস্যকে চাকরিও দিয়েছে ভারত সরকার। ভারতীয় গণমাধ্যমে সে খবরও বেরিয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেশে কয়টা ধর্ষণের বিচার হয়। আর ক্ষতিগ্রস্ত কয়টা পরিবারকে কতটুকু ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, তা আমাদের সবারই জানা। যেখানের ত্রাণের চালের হদিস পাওয়া যায় না, সেখানে অপরাধীর বিচার হবে এ আশাও সবক্ষেত্রে করাটা বোধ হয় সমীচীন নয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে এক আলোচিত ধর্ষণের ঘটনার শিকার কুমিল্লার কলেজ শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু। যাকে গত বছরের এপ্রিলে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ঘটনার দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও না হয়েছে এর সঠিক তদন্ত, না হয়েছে বিচার। বিচার হবেই বা কি করে। এখনও তো ধর্ষককেই চিহ্নিত করা যায়নি। শুধু তাই নয়, তনু আদৌ ধর্ষণের শিকার হয়েছে কিনা, সেটাও তো তদন্তে পরিষ্কার করেননি সংশ্লিষ্টরা।

এর কিছুদিন পর মিরপুরের সাইক পলিটেকনিকের শিক্ষার্থী আফসানাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। সেসময় বিভিন্ন পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল আফসানাকে ধর্ষণের পর হত্যার পেছনে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা জড়িত। তাদের নাম-পরিচয়ও ছাপা হয় পত্রপত্রিকায়। কিন্তু ঘটনার কোনো সুরাহা হয়নি। ধর্ষকরা বুক উঁচিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। উল্টো মৃত আফসানার লাশে লেপ্টে দেওয়া হয়েছে আত্মহত্যার কলঙ্ক।

এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় প্রতিদিনই ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গত জুলাই মাসে রাজধানীর বাড্ডায় সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। সে ঘটনায় একজন গ্রেফতারও হয়। কিন্তু এরপর ঘটনার কি হয়েছে হয়তো আমরা কেউ জানি না। ধর্ষক হয়তো কদিন পর জামিনে বেরিয়ে যাবে। পেশী শক্তি কিংবা টাকার কাছে হয়তো বিচার বঞ্চিত হবেন ওই শিশুর বাসচালক বাবা। সাড়ে তিন বছরের একটি শিশু ঠিকমতো কথা বলতে পারার কথা নয়। তার তুলতুলে শরীরে মানুষ নামক নরপশুরা কীভাবে যৌন নির্যাতন চালায় সে প্রশ্নও তোলা যায় না। কারণ এখন এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। এতেই বোঝা যায় মানুষ এখন আর মানুষ নেই। আবার অমানুষও হয়ে যায়নি। হয়তো মাঝামাঝি কোনো একটা প্রাণীতে রূপ নিয়েছে মানুষ!

মাত্র কয়েক দিন আগে বরগুনার বেতাগীতে স্বামীকে আটকে রেখে স্কুল কক্ষে এক স্কুল শিক্ষিকাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। নৈতিকতা কতটা নিচে নামলে স্কুল শিক্ষিকাকে তারই স্কুলের কক্ষে এবং স্বামীর সামনে ধর্ষণ করা যায়। আইন, শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নিচে নামলে অপরাধীরা এমন সাহস পায় তা সহজেই অনুমেয়। একজন শিক্ষক হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। আর তাকেই নিজের ইজ্জত হারাতে হচ্ছে নিজ কর্মস্থলে। ফলে নৈতিকতা, নীতি, আদর্শ আর মানসিকতা বা মানবিকতা কতটা নিচে নেমেছে, সে প্রশ্ন পাঠকের কাছেই রইল।

এবার আসুন মূল আলোচনায় আলোকপাত করি--

২৮ আগস্ট রাতে টাঙ্গাইলে মধুপুরে চলন্ত বাসে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের এক তরুণী কর্মীকে (রূপা প্রামাণিক) ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। নরপশুদের পৈশাচিকতা থেকে বাঁচতে শত আকুতি-মিনতি করেছেন রূপা। এমন কি সম্ভ্রম রক্ষায় নিজের কাছে থাকা পাঁচ হাজার টাকা এবং মোবাইল ফোন দিয়েও রেহাই পাননি তিনি। শুধু তাই নয় ধর্ষণের পর ঘাড় মটকে হত্যা করে তার লাশ বাস থেকে ছুঁড়ে ফেলা হয় জঙ্গলে। পরদিন পুলিশ লাশ উদ্ধার করে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে। এর কয়েকদিন পর পরিচয় পাওয়া গেলে তার লাশ কবর থেকে তুলে আবার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে স্থানীয় প্রশাসন। চলন্ত বাসে একের পর এক এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। রূপাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় টাঙ্গাইলের মধুপুর থানার পুলিশ বাসটির পাঁচ শ্রমিককে গ্রেফতার করেছে। তাদের মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। এ মামলা দ্রুত বিচারিক আদালতে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। এটি নিঃসন্দেহে আশার খবর। কিন্তু হতাশার বিষয় হলো- যে দেশে ধর্ষণ আজ মহামারী আকার ধারণ করেছে, সেটা থামাবে কে? তিন বছরের শিশু থেকে শিক্ষিকা, বিশ্ববিদ্যালয়-স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থী, কাজের মেয়ে এমন কি প্রতিবন্ধী কন্যাশিশুও ধর্ষকদের হাত থেকে রেহাই পায় না। এসব ধর্ষণের ঘটনার বিচারও হয় কালেভদ্রে। রূপা যে বাসে চড়ে কর্মস্থলে ফিরছিলেন সে বাসটির নাম ছোঁয়া পরিবহণ হলেও বাসটির মূল নাম ছিল নিরাপদ পরিবহণ। অথচ কোথায় সে নিরাপদ নামের নিরাপত্তা।

যে দেশ নারীদের, মায়েদের, কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা দিতে পারে না অথচ সে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধী দলীয় নেত্রী, সংসদের বাইরের বিরোধী দলীয় নেত্রীও নারী। এমনকি কয়েকজন সচিব, আধাডজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নারী। এ তালিকায় রয়েছেন ট্রেন চালক, বিমানের পাইলট, থানার ওসি, সার্জেন্ট, বিচারপতিও। এরপরও এই নারী জাতির ইজ্জতের নিরাপত্তা দিতে আমরা বার বার ব্যর্থ হচ্ছি। নারীর শরীরের দুটি মাংসপিন্ড আর নিম্নাঙ্গকে শকুনের লম্বাটে ধারালো চিকন ঠোঁটের আঁচড় থেকে রক্ষা করতে পারছি না। বিশেষ করে রাস্তায়, কর্মস্থলে এবং পাবলিক পরিবহণে নারীদের যৌন হয়রানির মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলছে। এর জন্য হয়তো নারীদেরও দায় রয়েছে। নিজেদের পোশাক-আশাক চাল-চলন নিয়েও নানা বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু সবকিছুর ওপরে পুরুষ নামক দানবদের মানুষ হতে হবে। কেননা এই নারীর পেট থেকেই প্রতিটি পুরুষের জন্ম। যে মাংসপিন্ড দেখলে পুরুষ তার লোলুপ দৃষ্টিকে আটকাতে পারে না, সেটাই তো জন্মের পর তার একমাত্র খাবার ছিল। আর যে নিম্নাঙ্গের কথা মাথায় এলে পুরুষের গায়ে জ্বর উঠে আর জিভে পানি আসে, সেখান দিয়েই তো আলো বাতাস দেখতে পৃথিবীতে এসেছে তারা।

রূপা হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া আসামিরা পুলিশকে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, ওই দিন তরুণী ছাড়াও বাসে পাঁচ-ছয়জন যাত্রী ছিল। অন্য সব যাত্রী সিরাজগঞ্জ মোড়, বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম প্রান্ত ও এলেঙ্গায় নেমে যায়। এরপর বাসটি টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার কাছাকাছি এলে বাসের চালকের সহকারী শামীম তরুণীকে জোর করে পেছনের আসনে নিয়ে যান। এ সময় তরুণী তার কাছে থাকা পাঁচ হাজার টাকা ও মুঠোফোন শামীমকে দিয়ে তাকে নির্যাতন না করতে হাতজোড় করে অনুরোধ করেন। কিন্তু শামীম কোনো কথাই শোনেননি। পরে শামীম, আকরাম ও জাহাঙ্গীর তাকে ধর্ষণ করেন। তিনি কান্নাকাটি ও চিৎকার করা শুরু করলে তারা তিনজন মুখ চেপে ধরেন। একপর্যায়ে ঘাড় মটকে তাকে হত্যা করা হয়। পরে মধুপুর উপজেলা সদর অতিক্রম করে বন এলাকা শুরু হলে পঁচিশ মাইল এলাকায় রাস্তার পাশে লাশ ফেলে রেখে চলে যান তারা। কতটা নির্মম, নিষ্ঠুর আর জল্লাদী হলে একজন মানুষের পক্ষে এমন ঘটনা ঘটানো সম্ভব?

এর আগে ২০১৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জে শুভেচ্ছা পরিবহনের চলন্ত একটি বাসে তরুণী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ওই মামলায় বাসচালক দিপু মিয়া ও চালকের সহযোগী কাশেম আলীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ২০১৫ সালের ১২ মে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে চলন্ত বাসে এক পোশাককর্মীকে ধর্ষণ করে ফেলে দেন বাসচালক ও তার সহকারী। ঢাকায় এক গারো তরুণীকে চলন্ত মাইক্রোবাসে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। গত বছরের ২৩ জানুয়ারি বরিশালে সেবা পরিবহনের একটি বাসে দুই বোনকে ধর্ষণ করে পাঁচ পরিবহনকর্মী। ওই বছরের ১ এপ্রিল টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী থেকে ঢাকাগামী বিনিময় পরিবহনের একটি বাসে ধর্ষণের শিকার হন এক পোশাককর্মী। পরে পুলিশ ওই বাসের তিন কর্মীকে গ্রেফতার করে। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি ময়মনসিংহের নান্দাইলে একটি বাসে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে বাসচালকসহ তিন পরিবহনকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বাসচালককে ঘটনাস্থল থেকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে জনগণ। সর্বশেষ এ ঘটনায় গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাহলে কর্মস্থল, প্রশাসন, বিচারালয়, পুলিশ প্রশাসন, বিমান চালনা, ট্রেন চালনাসহ সব ধরনের পেশায় নারীদের সম্পৃক্ত করা সত্বেও তাদের একা চলা কি অনিশ্চিত থাকবে? তাহলে কি বোনকে ভাইয়ের, মেয়েকে বাবার, মাকে ছেলের আর স্ত্রীকে স্বামীর হাত ধরেই রাস্তায় বেরুতে হবে আজীবন?

রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধে রুখে দাঁড়াক বিশ্ব মানবতা

ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেন না অত্যাচারী শাসকরা। এ যেন চিরন্তন সত্য। যেমন শিক্ষা নেননি এডলফ হিটলার। শিক্ষা নেননি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট সিনিয়র বুশ। যদিও ইরাক আক্রমনকে পরবর্তীতে তার ভুল সিদ্ধান্ত বলে স্বীকার করেছেন। আর হিটলার ৬০ লাখ ইহুদিকে মারার পর নিজেও আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন। যদিও তার মৃত্যু নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। অবশ্য তার ইহুদি নিধনের পক্ষে-বিপক্ষেও যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। আর এখন উত্তর কোরিয়া, চীন, আমেরিকা, রাশিয়া তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধানোর চেষ্টায় মরিয়া।

এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা রোহিঙ্গা মুসলিম এবং হিন্দু সকলেই এখন জীবন নিয়ে শঙ্কিত। গত ১৫ দিনে রোহিঙ্গাদের কয়েক হাজার বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে সে দেশের সেনাবাহিনী। বৌদ্ধ সন্যাসীদের সহায়তায় রাতের আঁধারে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে অসংখ্য রোহিঙ্গাকে। এমন কি জবাই করে হত্যা করা হয়েছে শিশুদের। শুধু মুসলিম রোহিঙ্গাই নয়, তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি হিন্দুরাও। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে তিন লাখের মতো রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। তাদেরকে বাংলাদেশ আশ্রয়ও দিয়েছে। কক্সবাজারসহ ওই অঞ্চলের বাসিন্দা রোহিঙ্গাদের যথাসাধ্য মানবিক সহযোগিতাও দিয়ে আসছে। পাশাপাশি ভারতেও ৪০ হাজার রোহিঙ্গা ঢুকে পড়েছে বলে দাবি করেছে ভারতীয় গণমাধ্যম। তবে ভারতীয় গণমাধ্যমের এ তথ্যের ভিত্তি নেই বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

এ ঘটনার পর সে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাৎক্ষণিকভাবে মিয়ানমার সফর করেছেন। সেখানে গিয়ে তিনি ‘শান্তির দূত’ শান্তিতে নোবেল জয়ী ক্ষমতাসীদের নেত্রী অং সান সুচির সঙ্গে ‘চিয়ারস’ করেছেন। তারা রাখাইনে সন্ত্রাস দমনে একমত হয়েছেন। প্রশ্নটা হলো- নরেন্দ্র মোদি যে চিয়ারস করলেন সেটা কীসের প্রতীক। যেখানে রোহিঙ্গাদের দিনে-রাতে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। নারী-শিশুদের রক্তে ভাসছে নাফ নদী। সেখানে কাচের ওই স্বচ্ছ গ্লাসে তো রোহিঙ্গাদের সেই রক্ত দিয়ে চিয়ারস করারই সামিল। যেখানে মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সচিত্র ছবি আসছে। সেখানে অং সান সুচি বলেছেন, গণমাধ্যমে রাখাইন সম্পর্কে ভুল বার্তা দেওয়া হচ্ছে। ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। রাখাইনে তার সরকার নাকি শান্তি প্রতিষ্ঠায় সচেষ্টা। কতটা হাস্যকর, মিথ্যাচার এবং ন্যাক্কারজনক। একটা জাতিকে মেরে ফেলে দেশে তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠায় নেমেছেন। নিস্পাপ শিশুদের হত্যা করে তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যস্ত। তিনি আবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কারও পেয়েছেন। তাহলে সঠিক তথ্য কোনটা? চিয়ারসের গ্লাসে রোহিঙ্গাদের রক্ত ! নাকি শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে মুসলিম নিধনযজ্ঞ।

মুসলিম দেশ হিসেবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আর ফার্স্ট লেডি ছুটে এসেছেন রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে। তিনি প্রচন্ড এই গরমে কক্সবাজারের বিভিন্ন গ্রামে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খোঁজ খবর নিয়েছেন। অথচ বিশ্ব বিবেক জাতিসংঘ এমন একটি মানবিক বিষয়ে টু শব্দও করেনি এখনও। শুধু তাই নয় আমাদের দেশের কোনো মানবাধিকার সংগঠন বা আন্তর্জাতিক কোনো মানবাধিকার সংগঠন এ ইস্যুতে কোনো কথা বলছে না। মনে হয় সব অন্ধ হয়ে গেছে। মুসলিম কোনো দেশ, মধ্যপ্রাচের দেশ যারা নিজেদের ইসলামের প্রকৃত সেবক মনে করে, সেসব শাসকও যেন কানে তুলো গুঁজে বসেন আছেন। ধিক জানাই এমন জাতিসংঘকে, বিশ্ব বিবেককে, মানবাধিকারের ফেরিওয়ালাদেরকে।

এবার আসুন ভিন্ন একটি গল্প বলি

‘গ্রামের এক বাড়িতে আগুন লেগেছে। ঘরের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। বাড়ির মালিক বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন। প্রতিবেশীদের অনেকেই আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। আবার কেউ কেউ বাড়ির মালিককে সান্তনা দিচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে কাছের যে প্রতিবেশীর বাড়িটা। সেই বাড়ির মালিক এসে আগুনে আলু পোড়ানোর চেষ্টা করছে। যা দিয়ে হয়তো একটু পর তিনি আলু ভর্তা বানিয়ে ভাত খাবেন।’ এই গল্পটা বলার কারণ হলো- আপনার সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী যদি বদ হয় তাহলে বিপদে-আপদে, সুখে-অসুখে সেই আপনার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করবে। এখানে গল্পটাকে আপনি দুইভাবে চিন্তা করতে পারেন। প্রথমত, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত আপনাকে সহায়তা না দিয়ে মিয়ানমারের শান্তির দূত সুচির সঙ্গে চিয়ারস করছে। আর কেউ বুদ্ধিমান হলে আমার বলার দরকার নাই যে, ভারত আলু পোড়ানোর চেষ্টা করছে রাখাইনে দেওয়া সেনাবাহিনীর আগুনে।

অন্যদিকে বন্যা কবলিত এলাকার মানুষের জন্য বরাদ্দ ত্রাণ মেরে দেওয়া প্রসঙ্গে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুটি উক্তি স্মরণ করছি-

‘দেশ স্বাধীন করলে সবাই পায় সোনার খনি আর আমি পেয়েছি চোরের খনি...’

‘সাত কোটি মানুষের জন্য সাড়ে সাত কোটি কম্বল আনছি, অথচ আমি আমারটাও পেলাম না...’

খবর প্রকাশিত হয়েছে, বন্যায় দুর্গত মানুষের জন্য বরাদ্দের ত্রাণের সাড়ে ৯ টন চাল গায়েব হয়েছে। যে এলাকার জন্য ওই চাল বরাদ্দ রাখা হয়েছিল সেটা ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ আবু হোসেনের নির্বাচনী এলাকা।

তিনি অবশ্য চাল গায়েবের ঘটনায় কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামকেই দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, কেন্দ্রীয় খাদ্য গুদাম সবাকেই চাল কম দেয়। এখানে একটি বড় চক্র জড়িত আছে। এ চক্রকে শনাক্ত করে, এদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।’

আমার প্রশ্ন হলো- মাননীয় সংসদ সদস্য বললেন, কেন্দ্রীয় খাদ্য গুদাম সবাইকেই চাল কম দেয়। তিনি সবার খবর পেলেন কীভাবে? আর যদি তিনি জেনেই থাকেন তাহলে নিজের অনুকূলে বরাদ্দের ট্রাক জব্দের পর কেন এ তথ্য ফাঁস করলেন। তার কি আরও আগে বলা উচিত ছিল না?

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]