প্রিয় আনিসুল হক,

বাংলাদেশে প্রিয়দর্শিনী নায়িকা কবরীর হাসিটা ছিল মহাবিখ্যাত, নারীদের মধ্যে। কবরী হাসলে হেসে উঠত পৃথিবী। কবরীর ‘চোখ ও মন কাড়া’ হাসির ধারে কাছেও পৌঁছতে পারত না কোনো পুরুষের হাসি। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে কবরীর ভুবনজয়ী হাসির সঙ্গে পেরে ওঠার মতো একজনকে আমরা পেয়েছিলাম বটে বিটিভির কল্যাণে, সেটা আনিসুল হক, আপনি। আপনার হাসিতে একটা জাদু আছে। আপনার ভুবনজয়ী হাসির জাদু অবশেষে বিস্তার লাভ করেছিল বাংলাদেশ নামের বদ্বীপটির প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সর্বত্র। বাংলাদেশ টেলিভিশন আপনাকে পৌঁছে দিয়েছিল বাঙালির ড্রয়িং রুমে, বেডরুমে। সুদর্শন আপনি ক্রমশঃ হয়ে উঠেছিলেন একজন স্বপ্নের নায়ক। আপনার হাস্যোজ্জ্বল স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্ব দীপ্তিময় করেছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে।

সাম্প্রতিককালে আপনার সাফল্যের মুকুটে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নতুন পালক। সফল ও জনপ্রিয় উপস্থাপক এবং শিল্পপতি পরিচয়ের সঙ্গে আপনার পরিচয়পত্রে সংযোজিত হয়েছে নতুন পদ ও পদবী। ঢাকার (উত্তর) মেয়র বা নগরপিতা হিসেবে আপনাকে পেয়েছে নগরবাসী। এতটা সপ্রতীভ বা স্মার্ট মেয়র ইতোপূর্বে দেশবাসী অবলোকন করেনি। অতীতে মেয়র বলতেই নগরবাসীর চোখের সামনে দুর্ধর্ষ কোনো সন্ত্রাসী-লুটেরা-খুনি-বখরাবাজ কিংবা জেলখাটা কোনো দাগী আসামির প্রতিকৃতি বা অবয়ব দৃশ্যমান হয়ে উঠত। কিন্তু মেয়র পদে আপনি অধিষ্ঠিত হবার পর সেই ইমেজটা বিলুপ্ত হয়ে গেল। এবং সেখানে খুব দ্রুতই প্রতিস্থাপিত হলো একজন সৎ-কর্মতৎপর-দায়িত্বশীল-রুচিবান-সংস্কৃতিবান তারুণ্য ভরপুর সজীব সতেজ সদাহাস্য উদ্যমী একজন দেশপ্রেমিকের চেহারা। ঢাকা উত্তরের চেহারাও খানিকটা আপনি পালটে দিয়েছেন খুবই অল্প সময়ের মধ্যে। সফল উপস্থাপক আনিসুল হক এখন মেয়র হিসেবেও দেশবাসীর কাছে আস্থা এবং নির্ভরতার একটি প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে। বহু অসাধ্য সাধন করেছেন আপনি, মেয়র হিসেবে।

আশির দশকে অধ্যাপক মমতাজ উদদীন আহমদ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আবেদ খান, সানজিদা আখতার, জুয়েল আইচসহ আমরা কতিপয় জড়িয়ে পড়েছিলাম অদ্ভুত এক মায়ার বন্ধনে। মনে পড়ে, সে সময় একজন উদীয়মান প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ ব্যবসায়ী হিসেবে আপনি ক্রমশঃ দীপ্যমান হয়ে উঠছিলেন। এখনকার মতো এতটা অর্থ-বিত্ত-প্রতিপত্তি তখনও আপনার হাতে ধরা দেয়নি পুরোপুরি। মধ্য ছিয়াশিতে আমার কন্যা নদীর আগমনকে স্বাগত জানাতে দরিদ্র এই ছড়াকার বন্ধুর বাড়িতে আপনারা দল বেঁধে চলে এসেছিলেন এক সন্ধ্যায়। সেই সন্ধ্যার বর্ণিল উৎসবের কিছু স্থিরচিত্রে আপনাদের প্রত্যেকের কোলে কোলে নিজেকে দৃশ্যমান আবিষ্কার করে এখনও কেমন লজ্জা মেশানো বিস্ময়ে অভিভূত হয় নদী। পারিবারিক এলবামের সেই ছবিগুলো আমাকেও ফিরিয়ে নিয়ে যায় পেছনের দিনগুলোতে, যখন আমরা প্রত্যেকেই তার সেরাটা দিতে চাইছি বা প্রকাশ করতে চাইছি।

তখন, প্রায়ই আমাদের অনির্ধারিত নির্মল আড্ডা জমে উঠত হয় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে, নয় আমাদের কারও বাড়িতে কিংবা কোনো জমজমাট রেস্টুরেন্টের কর্নারে থাকা কোনো নিঃসঙ্গ টেবিলে। আড্ডায় আড্ডায় হুল্লোড়ে হুল্লোড়ে ঘড়ির কাটা মধ্যরাত অতিক্রম করত। আবার এমনও হয়েছে, সারাদিন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে অজস্র জটিলতা ফেস করতে করতে ক্লান্ত বিপর্যস্ত আপনি বিপুল স্ট্রেস জমা মাথাটা মনটা হৃদয়টা ফুরফুরে করবার লক্ষ্যে রাত এগারোটার পরে কল দিয়ে বসলেন--কী করছেন?

--শুয়ে আছি।

--আরে ওঠেন। রেডি হন ভাবীসহ।

--আরে ধুর এত রাতে কীসের রেডি হওয়া!

--কুড়ি মিনিটের মধ্যে আসছি, বেরুবো একসঙ্গে। সায়ীদ স্যার আবেদ ভাই সানজিদা আখতার সবাই থাকবেন গাড়িতে। কুইক হারি আপ...।

--আরে না, আমাকে বাদ দ্যান ভাই, আমি যাবো না।

কে শোনে কার কথা? আমার কথার মাঝখানে আনিসুল হকের বিখ্যাত হাসির অনুরণন শুনি--আপনার কোনো অজুহাত কেউ শুনবে না। আসছি। কুইক হারি আপ...।

এবং ঠিক মিনিট কুড়ির মাথায় আপনি হাজির হতেন আমাকে তুলে নিতে। এরপর পাণ্ডা গার্ডেন কিংবা শেরাটনে বসে আরম্ভ হতো আমাদের সম্মিলিত ছেলেমানুষী ভরা তুমুল হল্লা। বিপুল খানাখাদ্যিকে সাক্ষী রেখে আহা কী প্রাণবন্ত আড্ডাই না হতো আমাদের!

মনে আছে আনিসুল হক, আশির দশকে আপনার বাড়িতে এক বিকেলে আমরা দলে-বলে বৈকালিক আড্ডায় মেতে উঠেছিলাম। গর্মাগরম লুচি ভেজে টেবিলে রাখছিলেন ভাবী। এবং টেবিলে রাখামাত্র আমি আর সায়ীদ স্যার সেটা লুফে নিতে কাড়াকাড়িতে লেগে পড়ছিলাম। অতঃপর সর্বসম্মতিক্রমে স্যারের সঙ্গে আমার একটা বাজি ধরার ব্যবস্থা নেওয়া হলো, কে কয়টা লুচি খেতে পারে। সায়ীদ স্যার আর আমি অবতীর্ণ হলাম তুমুল প্রতিযোগিতায়। কড়াই থেকে সদ্য ভাজা একটা করে পরোটা সাইজের ফুলকো লুচি টেবিলের ওপর প্লেটে রাখা হয় আর ছোঁ মেরে হয় আমি, নয় সায়ীদ স্যার সেটা হাতে তুলে নিই দ্রুত। তারপর চিতার গতিতে সব্জির কিঞ্চিৎ সহায়তা নিয়ে সেটা সাবাড় করে আবার আরেকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া চলতে থাকল। আমরা দুজন অবিরাম খেয়ে যাচ্ছি লুচি আর আমাদের দু'জনার কল্যাণে ভবলীলা সাঙ্গ হওয়া লুচিদের সংখ্যা গুণে রাখছেন আবেদ খান সানজিদা আখতাররা।

এক পর্যায়ে সায়ীদ স্যার ঘোষণা দিলেন, তিনি আর খাবেন না।

প্রতিযোগিতার সমাপ্তি ঘোষণা করা হলো।

গোণাগুন্তি অনুযায়ী আমি খেয়েছি একুশটা লুচি আর সায়ীদ স্যার খেয়েছেন তেরোটা। আমি হুররে বলে দুই হাত উঁচিয়ে বিজয়ীর ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালাম। সায়ীদ স্যার কঠিন এক ধমক দিয়ে আমাকে বসে পড়ার নির্দেশ দিলেন--আরে বসো মিয়া। অত উল্লাস কইরো না। তুমি বিজয়ী হও নাই। বিজয়ী হইছে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

আমি তো আকাশ থেকে পড়ি--আরে! এইটা কেমন কথা! আমি তো স্যার খেলাম একুশটা আর আপনি খাইলেন মাত্র তেরোটা, তাহলে আপনি বিজয়ী হইলেন কীভাবে!

স্যার বললেন--রাখো তোমার একুশ। তোমার যে বয়েস তাতে তুমি খেয়েছো মাত্র একুশটা আর আমার এই বয়েসে তেরোটা খাওয়া মানে তোমার বয়েসে একুশ দুগুণে বেয়াল্লিশটার সমান। সুতরাং বিজয়ী তুমি না, বিজয়ী হয়েছি আমি।

উপস্থিত সকলে সমস্বরে এবং টেবিল চাপড়ে সায়ীদ স্যারকে সমর্থন করল, এমনকি ঘরের শত্রু বিভীষণ আমার স্ত্রী শার্লিও চলে গেল স্যারের পক্ষে!

এভাবে জীবনে প্রথম কোনো প্রতিযোগিতায় বিপুল ভোটের (লুচির) ব্যবধানে বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমাকে পরাজিত ঘোষণা করা হয়েছিল! আহারে আমাদের দিনগুলো কী আনন্দেরই না ছিল তখন, আনিসুল হক!

প্রিয় আনিসুল হক, ভাই আমার, বন্ধু আমার, কত স্মৃতি যে জমা হয়ে আছে আপনাকে ঘিরে! মনে পড়ছে ৯৩/৯৪ সালে একবার কঠিন অসুখে পড়েছিলাম। তখন আমি স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে আজিমপুরের ভাড়া বাড়িতে থাকি। এমন একটা নাছোড়বান্দা জ্বর হলো যে আমাকে ছেড়ে যেতেই চায় না। ঢাকার উল্লেখযোগ্য কয়েকজন চিকিৎসক চিকিৎসা করছিলেন কিন্তু মাসখানেক সময় অতিক্রান্ত, অসুখটাকে আইডেন্টিফাই করা যাচ্ছে না। বিরতিহীন জ্বর এবং খানাখাদ্যে অরুচিজনিত কারণে শয্যাশায়ী আমি দিনে দিনে শীর্ণদেহী হয়ে পড়লাম। এক রাতে কপালে জলপট্টি দিতে দিতে শার্লি জানালো--সন্ধ্যায় ফোন করেছিলেন আপনি। ফোনে আমার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিচ্ছিলেন। শার্লির কণ্ঠে হতাশা টের পেয়ে আপনি নাকি আশ্বস্ত করেছিলেন শার্লিকে। আপনি বলেছিলেন--'ভাবী আপনি একদম দুঃশ্চিন্তা করবেন না। রিটনের ভাই আনিসুল হক এখনও বেঁচে আছে। বাংলাদেশে তার চিকিৎসা না হলে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন কোথায় নিয়ে যেতে হবে। পৃথিবীর যে কোনো দেশে যে কোনো বড় চিকিৎসকের কাছে আমি তাকে নিয়ে যাব। আপনি টাকা নিয়ে ভাব্বেন না।’ আপনার দেওয়া ভরসার কথা বলতে গিয়ে শার্লি সেদিন আবেগে অশ্রুসজল হয়ে পড়ছিল বারবার।

এই যে এখন, লন্ডনের হাসপাতালের আইসিইউতে আপনি দীর্ঘ ঘুমে আচ্ছন্ন আছেন যখন, চিকিৎসার প্রয়োজনে চিকিৎসকরা যখন আপনাকে বাধ্যতামূলক ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে, তখন শার্লি এবং আমার মতো অগুন্তি মানুষ আপনার জন্যে শুভ কামনা করছে। কোটি মানুষের ভালোবাসাকে সম্মিলিত চাওয়াকে শুভ কামনাকে অগ্রাহ্য করার শক্তি আপনার নেই আমি জানি। সুতরাং উঠে দাঁড়ান আনিসুল হক, ঘুরে দাঁড়ান।

আর ঘুম নয়। ওয়েকআপ আনিসুল হক প্লিজ ওয়েকআপ।

ঢাকা আপনাকে ডাকছে। বাংলাদেশ আপনাকে ডাকছে...

২৮ আগস্ট ২০১৭
অটোয়া, কানাডা

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]