প্যান্টের ওপর আন্ডারওয়্যার পরলেই যেমন সুপারম্যান হওয়া যায় না, তেমনি ফিতাওয়ালা সালোয়ারের ওপর কুঁচকানো গেঞ্জি পরলেই স্মার্ট হওয়া যায় না।

কয়েক দিন আগে ফেসবুক থেকে পত্রিকা, পোর্টাল, টিভির পর্দা কাঁপানো বিষয় ছিল ‘সালোয়ারের ওপর গেঞ্জি’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের ভেতরে মেয়েদের পরা পোশাক নিয়ে বাধ্যবাধকতার একটি নোটিশ নিয়ে এই কাণ্ড। কিন্তু হলের ভেতরে কেমন পরিবেশ থাকে, একটু পেছন ফিরে দেখে নিই।

আমি যখন প্রথম রোকেয়া হলে উঠলাম তখন খেয়াল করলাম- হলে দুই শ্রেণির অধিবাসী আছে। হলগুলোতে বাস্তবে ঢাকার বাইরের ছাত্রীরাই থাকে। সেই দুই শ্রেণির এক শ্রেণি হচ্ছে যারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল এবং তাদের পোশাক এবং চালচলন আগে থেকেই শহুরে থাকে। আরেক শ্রেণির থাকে যারা আর্থিকভাবে তেমন স্বচ্ছল না, আবার পোশাকেও তেমন আধুনিক বা শহুরে হয় না। সেটা কোনোই সমস্যা না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে সবাই আসে পড়াশোনা করতে, পোশাকের বাহার দেখাতে নয়। সেখানে মেধাই হয় মূল পার্থক্য, বাহ্যিক সৌন্দর্য না। তবুও একটা প্রেস্টিজ ইস্যু থাকে। তো খুব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে বের করলাম- যারা শহুরে বা আধুনিক না তাদের বেশিরভাগই হলে ওঠার কয়দিনের মধ্যেই প্রথমে ভ্রু প্লাক করে এবং নিউমার্কেটে গিয়ে সস্তায় গেঞ্জি কিনে নিয়ে আসে। ট্রাউজার বা শর্টস একটু কস্টলি, তাই সেটার বদলে তারা ফিতাওয়ালা সালোয়ার দিয়ে সেই কাজ চালায়। আর যারা নিউ মার্কেটে যেতে পারে না তারা পরেরবার বাসা থেকে ভাই বা বাবার পুরানো গেঞ্জি নিয়ে এসে আধুনিক হবার চেষ্টা করে।

আপনি একটু কল্পনা করেন যে, একজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রী সালোয়ারের সাথে কুঁচকানো, ছোট বা পুরানো একটা গেঞ্জি পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর নীচে সালোয়ারের ফিতা ঝুলছে। এখন তো তাও বড় বড় গেঞ্জি পাওয়া যায়, তখন গেঞ্জি মানেই ছিল ছেলেদের টি-শার্ট।

এই ড্রেসে তারা গোটা হলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ক্যান্টিনে যাচ্ছে, টিভি রুমে যাচ্ছে। সব ঠিক আছে কিন্তু এই ড্রেসে যখন অফিস রুমে বা গেইটের সামনে যায়, তখন দেখতে কেমন লাগে? রুমের ড্রেস আর অফিসিয়াল ড্রেস কী এক হতে পারে কখনও? এখানে কেউ দয়া করে পোশাকের স্বাধীনতার কথা আনবেন না। পোশাকের স্বাধীনতা আর সুন্দর ফিটফাট ড্রেস যাকে অফিসিয়াল এটায়ার বলে সেটা এক জিনিস নয়। এক জিনিস হলে ঘরের আর বাইরের ড্রেসের আবিষ্কার হতো না। ফর্মাল আর ইনফর্মাল বলে একটা কথা আছে। এমনকি মেয়েরা হলের অফিসিয়াল মিটিংগুলোতেও একই ড্রেসে চলে আসে।

মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে শিক্ষার জায়গা। এখান থেকেই আপনাকে পরবর্তী জীবনের অনেক কিছু শিখতে হয়। আমাদের জীবদ্দশাতেও দেখেছি, হলের আপারা সেসব মেয়েদেরকে ডেকে ডেকে অনেক বকা দিতেন। শিখাতেন কোন ড্রেসে অফিসে যেতে হবে। এসব কালচারের বিষয়। শিক্ষার বিষয়। স্বাধীনতা মানে এই নয় যে, আমি মানানসই ড্রেস পরব না। হলের মেয়েরা শার্ট প্যান্ট পড়েও হলের বাইরে যেত। তাতে কোনো সমস্যা কখনও দেখিনি। আমি নিজেও হলে শর্টস, গেঞ্জি পড়তাম তবে যখনই অফিসে যেতাম, তখনই আমি ড্রেস চেঞ্জ করেই যেতাম। কারণ আমাদের কাছে সেটাই অফিসিয়াল ড্রেস।

সুফিয়া কামাল হলের ঘটনাটা দেখেই আমার মনে হয়েছিল বিষয়টা এমনি কিছু একটা হবে। তবে হল কর্তৃপক্ষ যে কাজটা বোকার মতো করেছে সেটা হচ্ছে একটা জেনারেল মিটিং করে ছাত্রীদের বিষয়টা ইন্সট্রাক্ট করে দিলেই হতো। হলের সেদিনের ঘটনা হয়তো ছিল এমনই। প্রভোস্টের অফিসে দুই তিনটা মেয়ে কুচকানো গেঞ্জি আর সালোয়ার পড়ে গিয়েছিল আর প্রভোস্ট তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন এবং বলেছিলেন এই ড্রেসে কেউ যেন অফিসে না আসে। নোটিশের ভাষা যদি অফিসের হয় তবে সেখানে ‘অশ্লীল’ শব্দটা অবশ্যই আপত্তিকর এবং প্রতিবাদযোগ্য। কিন্তু নোটিশটা প্রভোস্টের অফিস থেকে যায়নি বলেই জেনেছি। সংগত কারণে আমি এই মুহূর্তে সোর্স বলতে পারছি না, তবে আমিও চাই বিষয়টা সঠিক তদন্ত হয়ে আসল ঘটনা বেরিয়ে আসুক। হতেও তো পারে এই সুযোগে কোনো সুবিধাবাদী গোষ্ঠী তাদের কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য হাসিল করে নিতে চেয়েছে বা নোটিশটি প্রভোস্ট নিজে দেখেওনি হয়তো। আমরা এতটাই অবিশ্বাসী হয়ে উঠছি আর এতটাই কাগুজে প্রগতিশীল হয়ে উঠছি যে ঘটনার রটনাতেই দৌড়াচ্ছি। পিছনের খবর জানার চেষ্টা না করে বা অপেক্ষা না করেই প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ছি। সাথে সাথেই বিষয়টা নিয়ে দেখলাম অনলাইন ফেটে পড়ল, পোর্টালগুলোতে কলাম লেখা শুরু হলো, টিভিতে নিউজ হয়ে গেল। আবার কেউ কেউ দুই কদম আগ বাড়িয়ে সম্পাদকীয় লিখে ফেলে বিপ্লব ঘটিয়ে দিলেন। সম্পাদকের কালি আজকাল এতটাই সস্তা হয়ে গেছে যে, যেখানে-সেখানে যেকোনো ইস্যুতে ঝেড়ে দেয়। সালোয়ার গেঞ্জি ইস্যু কী জাতীয় জীবনের কোনো সমস্যা তৈরি করেছিল? এর ফলে কী হলে ছাত্র বিদ্রোহ হওয়ার মতো কিছু হয়েছিল? নাকি কর্তৃপক্ষ ছাত্রীদের এই অপরাধে শাস্তি বা বের করে দিয়েছিল?

ঘটনার প্রতিবাদ অবশ্যই হবে কিন্তু কোন ইস্যুতে কতটা প্রতিক্রিয়া করব আর এর পিছনে মূল ঘটনাই বা কী, সেটা না জেনে কেমন করে লেখালেখি শুরু হয়ে যায়? কেবল ফেসবুকের প্রতিক্রিয়াতেই কী বিশাল নিউজ বা কলাম লেখা যায়? জানি না, আমি হয়তো গন্ডমূর্খ মানুষ। তবে প্রগতিশীলতা এখন একটা ফ্যাশনের পরিণত হয়ে যাচ্ছে, যে কোনো ইস্যুতে বোঝে না বোঝে ইস্যু করাটাও এখন এক প্রকার ট্রেন্ড হয়ে যাচ্ছে। যে বোঝে সেও দুই লাইন লিখে, আর যে না বোঝে তারাও প্রেস্টিজ বাঁচাতে স্ট্যাটাস দিয়ে দেয়। বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয় না।

ফেসবুক এখন একটা বেসিক ইন্সটিংক্টের মতো হয়ে গেছে। অন্যেরটা দেখলেই নিজের বলতে ইচ্ছে করে। অপেক্ষা করার মতো ধৈর্য্য থাকে না। ফেসবুকে যেমন সত্যিকারের প্রতিবাদ হয় ঠিক তেমনি গুজবের কাহিনী তো আছে প্রচুর। কোনটায় প্রতিবাদ করব আর কোনটাকে অপেক্ষার তালিকায় রাখব, সেই ম্যাচিউরিটি না থাকলে সমূহ বিপদ আছে। যে কেউ যে কোনো ইস্যুতে একটা ঝড় তুলে দিয়ে আমাদেরকে বিভক্ত করে দিতে পারে সহজেই। প্রচারকারীরা সেই সুযোগের অপেক্ষায় থাকে সবসময়। আমাদের প্রগতিশীলতা আর অবিশ্বাসের সংস্কৃতিকে আশ্রয় করে বা এটার সুযোগ নিয়ে প্রতিক্রিয়াশীলদের দল যে সামনে কোনো বিপর্যয় ঘটাবে না, সে নিশ্চয়তা আছে কী?

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]