৫ বা ১০ কেজি চাল, ২ বা ৪ কেজি আলু, ১ বা ২ কেজি ডাল একটি পরিবারের ক’দিনের খাবার? একদিনের, দু’দিনের, না কী এক মাসের? কাছাকাছি একটা জিজ্ঞাসা ছিল এক বানভাসি পরিবার প্রধানের। ৩ দিনের আধপেটা খাওয়া একজন বৃদ্ধ এমন ত্রাণের একটি প্যাকেট পেয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আরদিন কী খামু’। যারা ত্রাণ দিচ্ছিলেন তারা প্রচণ্ড বিরক্ত হয়েছিলেন সেই বৃদ্ধের অমন জিজ্ঞাসায়। বলেছিলেন, ‘মিয়া যা পাইছো শুকুর করো, বেশি কথা কও ক্যা’। না, এটা কোনো কল্পকাহিনী নয়, সাম্প্রতিক বন্যার ত্রাণচিত্রের একটি খণ্ডাংশ।

সত্যিই তো, ‘শুকুর’ই করার কথা, একদিন বা দুদিনের হলেও তো খাবার জুটেছে। যে দেশে হাজার কোটি টাকা বাইরে পাচার হয়ে যায়, ৭ বছরে শূন্য থেকে ৭ কিংবা ৭ শ’ কোটি টাকার মালিক হয়ে যায় কেউ কেউ, সেই দেশে একজন নিরন্ন বৃদ্ধের দু’একদিনের খাবার জোটা তো শুকরিয়ারই ব্যাপার। রাজনীতির বাইরে থাকা, চাষাভূষা মানুষগুলো এর চেয়ে কী আশা করে, তাদের জন্য একদিনের খাবার, একবেলার কাঙ্গালিভোজ, এই তো বেশি। বন্যায় কিছু চাল, চিড়া, ডাল, আলু, তেল আর শীতে হঠাৎ জোটা কম্বল এর বেশি কী পাওনা এদের! এরা এত চায় কেন?

রোদচশমা চোখে পড়া এক সৌখিন ত্রাণকর্মী খুবই বিরক্ত হয়। এমনিতেই ট্রলারে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই, রোদে মুখের চামড়া লাল, এত কষ্ট করে এদের জন্য ত্রাণ নিয়ে আসা, তাতেও এরা খুশি না, কী অকৃতজ্ঞ। 

দুপুরে সোনারগাঁওয়ের লাঞ্চটা ক্যান্সেল করে আসতে হয়েছে, রাতের ডিনারটাও মিস হবে, সাথে রাতের সঙ্গটাও। এত ত্যাগ এদের জন্য তাও ‘শুকুর’ নেই। 

এদের কী এমনিতেই অকৃতজ্ঞ বলে, এত আয়োজন, এত উন্নয়ন কিছুই এদের খুশি করতে পারে না। এদের শুধু খাই খাই, আর নাই নাই। রোদের চোটে সাথে নিয়ে আসা `ফাইভ স্টারে’র খাবারও নষ্ট হতে বসেছে। এদের জন্য সব নষ্ট হলো, তবু এরা খুশি না। `বুড়া’টার কথা শুনেই বোঝা গেছে, এদের জন্য কষ্ট করে কোনো লাভ নেই। 

লাভ না হোক, নৌকা ভ্রমণটাও তো সে রকম হলো না। সবসময় মুখটাকে দুখি-দুখি করে রাখতে হচ্ছে। অন্য সময় হলে সাথে ডিজে থাকত, পার্টি হতো, পানীয় হতো, সময়টা ভালো কাটত। আর দূর, কী রোদের মধ্যে মুখ চুপসে বসে থাকা। চারদিকে প্যাকাটে চেহারার কিছু খাই-খাই, নাই-নাই চেহারার মানুষ, কোনো গ্ল্যামার নেই। অসস্তির কথা কাউকে বলাও যায় না, ঢাকার দেয়ালে লেখা ‘কষ্টে আছে আইজুদ্দিনে’র মতোন অবস্থা। ইচ্ছে করছে নতুন দেয়াল লিখন, ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা’র লাইন ধরে পালিয়ে যেতে। 

বুঝি, এমুন মাইনষের কষ্টের কথা আমরা বুঝি। আমাগোও বুঝ আছে। সাহেব গো শইলডা রইদে পোড়ায় না, শীতে খায় না, বানে ভাসায় না, দুঃখ-কষ্টও তাগোরে ছুইতে পারে না। হ্যাগোর মতোন মানুষ আমাগো দেখবার আহে, হ্যাইডাই তো বেশি। আমগোর পোড়া দেশে হ্যারা কষ্ট কইরা পইড়া আছে, হ্যাইডাও ম্যালা। হ্যাগোর তো বৈদেশে বাড়িঘর সবি আছে, যাগোর নাই তারাও করবার পারে, হেই ক্ষ্যামতা আছে। আমরা হগ্গলই বুঝি। আমগো লাইগাই তো আফনেরা এমুন রইদ পোড়া, বানে ভাসা দেশে পইড়া আছেন, এর লাইগা আমরা কিরতজ্ঞ। আফনে গো দয়ার শরীল, খালি তো কইলাম, ‘এ দুগায় কয়দিন চলবো’, রাগ করেন ক্যান বাজান!

 

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]