(কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং থেকে) ‘লাফ দিয়ে পড়লাম ধানখেতে। ঘণ্টাখানেক সেখান অবস্থান করে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছি। হাঁটু দিয়ে অঝরে রক্ত ঝরছে। কাপড় ছিড়ে হাটুতে বাধঁলাম। প্রচন্ড ব্যাথা হচ্ছিল। আশেপাশে কেউ নেই। খুব ভয় হচ্ছিল। মনে করেছিলাম আর বাচঁব না। এখানেই মনে হয় জীবনের ইতি টানতে হবে। হাঁটতে হাঁটতে আর পাঁ চলে না। বসে পড়লাম। পানির তৃঞায় প্রাণটা যায় যায় অবস্থা। পাশের একটি ছড়া থেকে পানি পান করলাম। রাত কয়টা বাজে তাও জানি না। কিছুক্ষণ পর দেখি পূর্বে দিকে ভোরের আলো। সকাল হলো। আর দেরি নয়। গন্তব্যে বাংলাদেশ।’ কথাগুলো বলছিলেন মোহাম্মদ তকি (৩৩)। মিয়ানমারের মংডু’র সাহেব বাজারের উত্তর পার্শ্বে বড়ধাইজ্যা এলাকায় মোহাম্মদ তকির বাড়ি।

গত ৪ সেপ্টেম্বর সোমবার রাতে তকির ঘরে আগুন দেয় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্যরা। সেখান থেকে পালিয়ে আসার সময় সেনা সদস্যদের ছোড়া গুলি তার কোমরে ও ডান পায়ের বাহুতে এসে লাগে। গুলি খেয়ে সে পাশের ধান ক্ষেতে পড়ে যায়। এরপর সে আর কিছু জানে না। পরিবারের কে কোথায় আছে, কেমন আছে, তিনি কিছুই জানেন না। জ্ঞান ফিরে নিজেকে ধানখেতে পড়ে থাকতে দেখেন।

উখিয়ার কুতুপালং এ তকি’র সঙ্গে কথা হয় প্রিয়.কম-এর এই প্রতিবেদকের। কথা বলতে বলতে সে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেই কালো রাতের নৃশংসতার বর্ণনা দিতে গিয়ে সে বার বার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। শান্তনা দিয়ে কিছুক্ষণ পর তার কাছে আবারও জানতে চাইলে তকি বলেন, ‘গত বুধবার (০৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছি। হাতে টাকা নেই। ওষুধ খেতে পারছি না। পানি খেয়ে ক্ষুধা মিটাতে হচ্ছে। আপনি কি সাংবাদিক? কাউকে বলে আমাকে একটু থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন?’ এ কথা বলে আবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তকি।

rahingya-in-teknaf

মিয়ানমারের মংডুতে সেনা সদস্যেদের গুলি লাগে মোহাম্মদ তকির কোমরে। ছবি: প্রিয়.ক

কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং এলাকার বাস্তব দৃশ্য এরকম। হাজার হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আসছে। সীমান্তে ওপারে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্যদের নির্বচারে গুলিবর্ষণ, হত্যা নির্যাতনে শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে শত শত রোহিঙ্গা নাগরিক। 

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, গত অক্টোবর থেকে মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনীর অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে রাখাইন রাজ্য থেকে ২ লক্ষ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। যার অধিকাংশই মাছ ধরার নৌকায় করে এসেছে।

উল্লেখ্য, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ২৫ আগস্ট পুলিশ চেকপোস্টে হামলার জেরে নতুন করে সেনা অভিযান শুরু হয়। হামলায় প্রথমদিনে মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যসহ নিহত হয় প্রায় শতাধিক। অব্যাহত সহিংসতায় ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছে ৪০০ জন। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে প্রায় ২ হজার ৬০০ ঘরবাড়ি।

আগ্রাসন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে ঢুকছে রোহিঙ্গা। এর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে আশঙ্কা করছে জাতিসংঘের।

এর আগে, জাতিগত দ্বন্দ্বের জেরে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো একই রকম অভিযানে কয়েকশত রোহিঙ্গা নাগরিক নিহত হয়। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় হাজারো ঘরবাড়ি।

প্রিয় সংবাদ/কামরুল