(প্রিয়.কম) মিয়ানমারের ডি ফ্যাক্টো নেতা অং সান সু চি ২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার রাখাইন পরিদর্শনে গিয়ে সেখানকার মানুষেরা যাতে ঝগড়া বিবাদ না করে, সে আহ্বান জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে তাদের মিলেমিশে থাকারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তবে তার বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশের কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নারী পুরুষ এবং সেখানকার কম্যুনিটি নেতৃবৃন্দ।

সফুরা খাতুন এবং তার পরিবারের ১৩জন সদস্য ১৫দিন আগে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশে এসে পৌছেছেন। পরিবারের দুইজন সদস্যকে গুলি করে ও পুড়িয়ে হত্যার পর তারা দেশ ছাড়েন। তার আগে সেনারা দখল করে নেয় তাদের ফসলি জমি আর পুকুর।

প্রতিদিন সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসছে হাজারো রোহিঙ্গা। ছবি: ফোকাস বাংলা

প্রতিদিন সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসছে হাজারো রোহিঙ্গা। ছবি: ফোকাস বাংলা

সফুরা বলছেন, তার মামাকে গুলি করে ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় সেনাবাহিনী। এরপর তার মামীসহ অন্যরা এদেশে পালিয়ে আসে। সেখানে তাদের জমি, ভিটাবাড়ী আছে। কিন্তু যেদিন তাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়, সেদিনই জমিজমাও কেড়ে নেয় সেনারা। আশেপাশের প্রতিবেশীদের বেশিরভাগ বাংলাদেশে এসেছে। যারা আছে তাদেরও সেনাবাহিনী রোজ ভয় দেখায়।

এদিকে সফুরার পরিবার উখিয়ার একটি অস্থায়ী আশ্রয় ঠাঁই পেয়েছে, সপ্তাহ দেড়েক হলো। কিন্তু এখনো তার পরিবারের মত যারা সেখানে রয়ে গেছেন, তাদের দেখতে আজ দুপুরে একটি সামরিক বিমানে করে রাখাইনে গিয়েছিলেন মিয়ানমারের ডি ফ্যাক্টো নেতা অং সান সু চি। সেখানে মিজ সু চি যখন সেখানকার মানুষদের ঝগড়া-বিবাদ না করে মিলেমিশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন, তখনো বুথিদং এর জঙ্গলে কয়েক হাজার মানুষ বাংলাদেশে ঢোকার জন্য অপেক্ষা করছে। আর যারা নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছেন, তাদের সকলেই ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন।

এখনো থেমে নেই রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ। ছবি: ফোকাস বাংলা

এখনো থেমে নেই রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ। ছবি: ফোকাস বাংলা

পালিয়ে বাংলাদেশে আসা এমনই একজন রোহিঙ্গা মোহম্মদ নুর হোসেন। তিনি সু চির ভাষণ সম্পর্কে জানার বলছিলেন, ঝগড়া করার মত পরিস্থিতিতে কোন রোহিঙ্গা নেই সেখানে। আমরা কিভাবে ঝগড়া করবো? আমাদের নাগরিকত্ব দেয় নাই, আমাদের ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করতে দেয় নাই, আমাদের সহায়-সম্পদ কাড়ি নিছে। আমাদের যদি মানুষের মত অধিকার দেয়, আমার জমিজমা যদি ফেরত দেয়, ওখানে বুদ্ধিষ্টরা যেভাবে চলাফেরা করে সেভাবে আমাদেরও যদি করতে দেয়, তাহলে আমাদের তো এখানে থাকার দরকার নাই।

উখিয়ার আরেক ক্যাম্পে বাস লায়লা বেগমের। এখানে আসার আগে তার একটি সন্তান নাফ নদীতে ডুবে মারা গেছে। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের মিলেমিশে থাকার পরিস্থিতি আছে কিনা জানতে চাইলে লায়লা বেগম বলেন, অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে দেশ ছাড়তে হয়েছে। ওদের সাথে কিভাবে মিলিমিশে থাকব? যেভাবে নির্যাতন করছে তাতে কি ওদের সাথে মিলেমিশে থাকা যায় নাকি?

প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য গড়ে নতুন করে গড়ে উঠেছে শরনার্থী শিবির। ছবি: ফোকাস বাংলা

প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য গড়ে নতুন করে গড়ে উঠেছে শরনার্থী শিবির। ছবি: ফোকাস বাংলা

এখনো প্রতিদিনই ঘরবাড়ি ছেড়ে, নিজেদের সর্বশেষ সম্বলটুকু নিয়ে পরিবার পরিজনের সাথে নৌকায় পাড়ি জমাচ্ছেন হাজারো মানুষ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে তারা সীমান্তে অপেক্ষা করছে। ১ নভেম্বর বুধবারই বাংলাদেশে ঢুকেছে কয়েক হাজার মানুষ। এখানকার অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোর রোহিঙ্গা নেতা হিসেবে পরিচিত আমির হোসন। সুচির বক্তব্য সম্পর্কে আমির হোসেন বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর এখনো একই ভাবে নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। ফলে সুচি যা বলছেন, তা হাস্যকর।

তিনি বলেন, এখনো প্রতিদিনই ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে, মহিলাদের ধর্ষণ করা হচ্ছে। যারা আছে তাদের অবরোধ করে রাখা হচ্ছে। বাজারে গিয়ে চালও কিনতে পারছে না তারা। পথে পেলে মারধর করা হচ্ছে। পারলে মেরে ফেলা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিধন অভিযান শুরুর পর প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৬ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

প্রিয় সংবাদ/কামরুল