(প্রিয়.কম) মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর গণহত্যা আর ভয়ংকর নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে গত ২৫ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত চার লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। ১৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সংস্থাটি জানায়, পালিয়ে আসা এসব শরণার্থীদের প্রায় ৬০ শতাংশ শিশু।

যদিও বেসরকারি হিসেবে বাংলাদেশে আসা মোট শরণার্থীর সংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বেসরকারি হিসাব সংশ্লিষ্ট এনজিওগুলো জানিয়েছে, তাদের নিবন্ধনের কার্যক্রম এখনও শেষ হয়নি।

এদিকে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা শিশুর জন্যে জরুরি খাবার পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য সামগ্রী নিয়ে ইউনিসেফের ট্রাক কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছে।

ত্রাণ সামগ্রীর তীব্র সংকটের কথা জানিয়ে বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি এদোর্য়াদ বেইগবেদার বলেন, ‘সবকিছুরই তীব্র সংকট রয়েছে। বিশেষ করে খাবার, খাবার পানি ও বাসস্থানের তীব্র অভাব রয়েছে। এর ফলে শিশুরা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এ সব চরম দারিদ্রপীড়িত শিশুদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের।’

তিনি আরও বলেন, পানির যেকোনো সমস্যায় শিশুরা সবার আগে আক্রান্ত হয়। এখন পরিস্থিতি এমন যে বড় কোনো মহামারীর শঙ্কা রয়েছে।

দিন দিন যে হারে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা বাড়ছে, এতে সবার জন্য পর্যাপ্ত সুবিধা নিশ্চিত করা দুষ্কর হয়ে পড়ছে বলে উল্লেখ করে এদোর্য়াদ বেইগবেদার জানান, ইতোমধ্যে শরণার্থীদের মধ্যে প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানি, ডিটারজেন্ট পাউডার, পানি খাওয়ার পাত্র, জগ, শিশুদের জন্য ফিডার, স্যানিটারি ন্যাপকিন, গামছা, স্যান্ডেল ইত্যাদি বিতরণ করা হয়েছে। তবে আগামী চার মাসে এসব শিশুদের জন্য আরও ৭.৩ মিলিয়ন ডলার অর্থ বরাদ্দের আবেদন জানানো হয়েছে।

বিশ্ববাসীর প্রতিবাদ, নিন্দার মধ্য দিয়েও সমস্যা সমাধানে কোনো ধরনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি মিয়ানমারকে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১২ জন নোবেলজয়ী এবং বিশ্বের ১৮ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে মানবিক এ সংকট নিরসনে জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে খোলা চিঠি লিখেছেন।

গত ২৪ আগস্ট গভীর রাতে বেশ কিছু পুলিশ পোস্টে একযোগে হামলার পর থেকে দেশটির সেনাবাহিনী নজিরবিহীন অমানবিক অভিযান শুরু করে। এর পর থেকেই বাংলাদেশমুখী শরণার্থীর ঢল নামে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রধান যাইদ রাআ’দ আল হোসাইন সহিংসতার জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে অভিযুক্ত করে গৃহীত পদক্ষেপকে ‘স্পষ্ট বৈষম্য’ আচরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তারা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক বিষয়গুলোর তোয়াক্কাও করছে না বলে দাবি যাইদ। তিনি মিয়ানমার সরকারের প্রতি চলমান এ সংকট দ্রুত নিরসনের দাবি জানান। একইসঙ্গে রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার কথাও বলেছেন যাঈদ।

এদিকে, মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর সরকারি বাহিনীর চলমান নির্মম নির্যাতনের প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে। ১৩ সেপ্টেম্বর বুধবার এ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। 

প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গা একটি নৃগোষ্ঠীর নাম যাদের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ ইসলাম ও ১০ ভাগ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। রোহিঙ্গাদের আদি আবাসস্থল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। শত শত বছর ধরে রাজ্যটিতে বাস করা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি না দিয়ে মিয়ানমার সরকার এ জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালাচ্ছে।

১৯৪৮ সালে মিয়ানমারের স্বাধীনতার সময়ও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি ছিল। ১৯৬২-তে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করার পর নতুন করে সংকটের মুখে পড়ে রোহিঙ্গারা। ১৯৭৪ সালে সামরিক জান্তা ‘বিদেশি’ আখ্যা দেওয়ার পর ১৯৮২ সালে প্রণোয়ন করা হয় নাগরিকত্ব আইন। আর এই কালো আইনের মাধ্যমে অস্বীকার করা হয় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব। নাগরিকত্ব হরণ করে তাদের অস্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। সাদা কার্ড নামে পরিচিত ওই পরিচয়পত্রের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের দেওয়া হয় সীমিত কিছু নাগরিক অধিকার।

জাতিসংঘের সহায়তায় ২০১৪ সালে পরিচালিত আদমশুমারিতে রোহিঙ্গা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাধার মুখে পড়তে হয় রাখাইনের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের। তাদের শুমারি বয়কটের ঘোষণার মুখে সামরিক জান্তা সিদ্ধান্ত দেয় রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত হতে গেলে অবাঙালি হতে হবে। ২০১৫ সালে সাংবিধানিক পুনর্গঠনের সময়ে আদমশুমারিতে দেওয়া সাময়িক পরিচয়পত্র বাতিল করে সামরিক জান্তা।

পদ্ধতিগতভাবে রোহিঙ্গাদের বঞ্চিত করা হয় মৌলিক অধিকার থেকে। চলাফেরা, বাসস্থান নির্মাণ, শিক্ষা, চিকিৎসা, এমনকি চাকরির অধিকার থেকে আইনসিদ্ধভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে তাদের। 

প্রিয় সংবাদ/শান্ত