(প্রিয়.কম)আমার যাবার সময় হল দাও বিদায়

এমনভাবেই বিদায় চেয়ে ধরণীর বুক থেকে চিরবিদায় নিয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আজ তার ৪১তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৬ সালের ২৭ আগস্ট তৎকালীন পিজি (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল) হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিজের সকল কর্মের মাঝে চির প্রেমিক এই কবি সর্বদা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে, নারীর প্রতি নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং অবহেলিত মানুষের পক্ষেই কলম ধরেছেন। সমাজের নীচু স্তরের মানুষদের প্রতি ছিল তার অগাধ প্রেম।

১৮৯৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল। ছোটবেলার এই দুখু মিয়া, মাত্র নয় বছর বয়সে পিতৃহারা হোন। সংসারের হাল ধরার জন্য অইটুকু বয়সেই তাকে মসজিদের মুয়াজ্জিন এবং মাজারের খাদেমের কাজ নিতে হয়। ছোট্টবেলা থেকেই তিনি ধর্মের মৌলিক আচার-অনুষ্ঠান, ইসলামের নানা বিষয়-আশয় এবং এর পাঁচটি স্তম্ভের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত লাভ করেন। তবুও জীবনের কোনো অংশেই বিশেষ কোনো ধর্মের প্রতি ছিল না তার পক্ষপাতীত্ব। বরং তিনি তার লেখায় সবার উপরে মানব ধর্মকেই প্রাধান্য দিয়ে বলেছেন-

‘মিথ্যা শুনিনি ভাই/এ হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনও মন্দির-কাবা নাই’।

সকল ধরণের নির্যাতনের প্রতি তিনি ছিলেন সদা জাগ্রত। অন্যায়ের পক্ষে এক চুলও কেউ তাকে আপোষ করাতে পারেনি কোনোদিন। ভারতীয় উপমহাদেশে বৃটিশ নির্যাতনের বিরুদ্ধে তার কবিতা এবং গান ছিল ধারালো ছুরির মতো। জেলের তালা ভাঙতে তিনি লিখে গেছেন-

‘কারার ঐ লৌহকপাট,

ভেঙে ফেল কর রে লোপাট,

রক্ত-জমাট শিকল পূজার পাষাণ-বেদী’

নারীর প্রতি তার অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে তার অসংখ্য লেখায়। তিনি কখনোই নারীর প্রতি উপেক্ষা মেনে নিতে পারেননি। তাই বারবার লিখে গেছেন-

‘কোনকালে একা হয়নি কো জয়ী, পুরুষের তরবারী’

প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়াছে, বিজয়ালক্ষী নারী’।

সকল সাফল্যের জন্য পুরুষের একা কৃতিত্ব নেওয়ার ধারণাকে তিনি বারবার তার লেখার মাধ্যমে ভাঙতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, সমাজের প্রতিটা অঙ্গনে নারীরাও নিজেদের আলাদা সত্ত্বা তৈরি করুক। নারীর প্রতি ধর্মের অন্যায় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া মনোভাবের বরাবরই সমালোচনা করেছেন কাজী নজরুল। তিনি লিখেছেন-

‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনও বসে-

বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে’

 কাজী নজরুল ইসলাম

চির যৌবনের এই কবি বরাবরই নিজের সৃষ্টির মাধ্যমে প্রেমের কথা বলেছেন। নজরুলের প্রেমের কবিতা আর গান শুনলেই বুঝা যাবে- কি পরিমাণ প্রেম তিনি ধারণ করতেন মনে। ব্যক্তি জীবনে দু’বার বিয়ে করলেও বিয়ে করাটুকু ছাড়া প্রথম স্ত্রী নার্গিসের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্কই ছিল না নজরুলের। বিয়ের রাতেই অজানা এক অভিমানে বিয়ের আসর ছেড়ে কাউকে কিছু না বলে চলে যান নজরুল। এরপর আর কোনোদিনই নার্গিসের কাছে তিনি ফিরে যাননি। প্রথম বিয়ের তিন বছর পর তিনি বিয়ে করেন আশালতা সেনগুপ্তা বা প্রমীলাকে। তার লেখায় ছিল অদ্ভুত এক, গভীর প্রেম বোধ। তিনি লিখেছেন-

‘তোমারে যে চাহিয়াছে ভুলে একদিন

সে জানে তোমারে ভোলা কি কঠিন’।

অন্যায়ের প্রতি সদা আপোষহীন এবং ধর্মান্ধ মৌলবাদের প্রতি সদা সোচ্চার এই কবি তার অসংখ্য কবিতা-গান-উপন্যাস-ছোটগল্প-প্রবন্ধ দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে করেছেন সমৃদ্ধ। কবিতা-গদ্য, কিংবা গান, যে কোনো সৃষ্টিতে তিনি ছিলেন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক। তিনি সব সময় তার লেখায় স্বতন্ত্র চিন্তাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। ছোটবেলায় সংসার চালাতে মুয়াজ্জিন, যৌবনে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের একজন সৈনিক, পরিণত বয়সে সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, সঙ্গীত পরিচালক, কবি-গল্পকারসহ আরো বহু পরিচয়ে পরিচিত হওয়া নজরুল ১৯৪২ সালে মানসিক ভারসম্য হারিয়ে নিজের বাক শক্তি হারান।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবিকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে এসে নাগরিকত্ব প্রদান করেন। ১৯৭৪ সালে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে ডি’লিট উপাধি প্রদান করা হয়। এক বছর তিনি একুশে পদকও পান। দীর্ঘ বহু বছর রোগে ভুগে ১৯৭৬ সালের এই দিনে সাম্য ও বিদ্রোহের এই কবি মৃত্যুবরণ করেন।

প্রিয় সাহিত্য/শামীমা সীমা