শরণার্থীদের অর্থনৈতিকভাবে বোঝা ভাবা একটা সেকেলে ধারণা, বরং আজকাল একে বিনিয়োগ ভাবা হয়। 

দুঃখ হয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার ‘অবৈধ’ মানুষ রয়েছে যে দেশের এবং সেই ‘অবৈধ প্রবাসী’দের রেমিটেন্সে যে দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উপচে পড়ছে, এরকম দেশের ‘বুদ্ধিজীবী’রা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে বস্তাপঁচা সব আতংক আর ভীতি বাজারজাত করে চলেছেন।

এটা আশা করি অনেকেই স্বীকার করবেন, ইউরোপ-আমেরিকা মানবাধিকারের চেয়ে অর্থনীতিটা ভালো বোঝে। শরণার্থীরা বোঝা হলে ইউরোপ-আমেরিকা যুগের পর যুগ এত এত শরণার্থী গ্রহণ করতো না। কস্ট-বেনিফিট হিসাব করা ছাড়া তারা কোন হিউম্যানেটারিয়ান এপ্রোচ নেয় না। অস্ট্রেলিয়ায় ২৮ শতাংশ নাগরিক এখন বিদেশী জন্মগ্রহণকারী। অর্থনীতির জন্য বোঝা হলে এই নাগরিকরা কোনদিনই সেখানে ঢুকতে কিংবা থাকতে সমর্থ হতো না।

বস্তুত পুঁজিবাদী দুনিয়া বাস্তব থেকেই শেখে এবং বলে। সত্তর-আশির দশকে যেসব ভিয়েতানামিজ আমেরিকায় শরণার্থী হয়ে এসেছিল তারা এখন গড়পড়তা আমেরিকানদের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে ভালো আছে। উপরন্তু তারাই জন্ম দিয়েছে ভিয়েতনাম-আমেরিকার মাঝে বিশাল এক অর্থনৈতিক সম্পর্কের।

সাধারণত শরণার্থীরা শুরুতে কম মজুরির কাজগুলোতে ঢোকে। ফলে ইতোমধ্যে অনুরূপ কাজে যুক্তরা বেকার হয় না, বরং অধিক মজুরির কাজের দিকেই ধাবিত হয়। 

ইউরোপে এটা বহু উচ্চারিত ধারণা যে, শরণার্থীদের পেছনে এক ইউরো ব্যয় করলে দুই বছর পরই দুই ইউরো সমান রিটার্ন আসে। সম্প্রতি প্রকাশিত অর্থনীতিবিদ ফিলিপ লেগরেইনের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে ইইউর দেশগুলো শরণার্থীদের জন্য বাড়তি খরচ করেছে যথাক্রমে জিডিপির ০.০৯ শতাংশ ও ০.১১ শতাংশ। আর আগামী পাঁচ বছর ধরে তারা জিডিপিতে শরণার্থীদের কাজ থেকে পাবে বলে আশা করছে ০.২৩ শতাংশ হারে।

একজন শরণার্থী মাত্রই একজন কর্মী, উদ্যোক্তা, আয়করদাতা, ভোক্তা এবং বিশেষভাবে ভবিষ্যতের বিনিয়োগকারী। আর এসবই হলো প্রবৃদ্ধির রসদ। শরণার্থীরা অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হবে নাকি বিনিয়োগে পরিণত হবে সেটা অবশ্যই নির্ভর করে আশ্রিত দেশ তাদের কত পরিমাণে এবং কত বেশি কাজ, শিক্ষা ও পুঁজি পাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। ইউরোপজুড়ে অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যে দেশ বেশি শরণার্থী নিয়েছে সে দেশ বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। 

শরণার্থী রোহিঙ্গারা একদিন স্বদেশভূমিতে চলে যাবেন এটাই আশা করছি। সেটাই তাদের প্রত্যাশা হওয়া স্বাভাবিক। বাংলাদেশ সেই প্রত্যাশা পূরণেই সহযোগিতা করবে। কিন্তু যদি তা নাও ঘটে, তাহলেও ইউরোপ-আমেরিকার চেয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় পরিণত করার ক্ষেত্রে অন্তত একটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে, তাহলো ভাষা। রোহিঙ্গারা বাংলাভাষী হওয়ায় অতি দ্রুত তাদের থেকে ইকোনমিক ডিবিডেন্ড পাওয়া সম্ভব। কারণ অতিদ্রুত তাদের মাঝে বিশাল এক লেবার ইকোনমির জন্ম হতে পারে।

প্রায় সর্বত্র শরণার্থী মাত্রই ভিন্ন প্রযুক্তিজ্ঞান নিয়ে আসে। ফলে তারা নতুন সমাজে অর্থনীতিতে বৈচিত্রময় ইনোভেশন ঘটায়। অর্থনীতিতে যাকে বলে ডাইভারসিটি ডিবিডেন্ড। 

যুক্তরাষ্ট্রে প্যাটেন্ট রেজিস্ট্রেশনের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে সেগুলোর প্রতি চারটির তিনটিতেই উদ্যোক্তরা বিদেশে জন্ম নেয়া মানুষ। ১৯৯০ থেকে ২০১৪ সময়ে আমেরিকায় ঢুকে পড়া শরণার্থীদের নিয়ে উইলিয়াম ইভানসের গবেষণা হলো, একজন শরণার্থীর পেছনে ঐ দেশে গড়ে প্রাথমিক বিনিয়োগ (অনুসন্ধান+হাউজিং+ইংরেজি শেখানো+জব ট্রেনিং ইত্যাদি ক্ষেত্রে) ছিল ১৫ হাজার ডলারের মতো। আর পরবর্তী দুই দশক ধরে সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা দেয়া হয় সর্বোচ্চ প্রায় ৯২ হাজার ডলারের মতো। অথচ একই সময়ে তার কাছ থেকে কেবল ট্যাক্সই পায় দেশটি ১ লাখ ৩০ হাজার ডলারের মতো।

অনেকেই বলবেন, এত এত বেনিফিট থাকলে বর্তমানে উন্নত দেশগুলোতে শরণার্থী বিরোধী মনোভাব কেন। এর উত্তর হলো, মূলত রাজনৈতিক কারণে বর্তমানে শরণার্থী বিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে তৈরি হয়েছে ইসলামভীতি। কিন্তু এমন এমন কোন প্রবল যুক্তি ইউরোপ-আমেরিকার শরণার্থী বিরোধী রাজনীতিবিদরাও দেন না যে, শরণার্থীরা অর্থনীতির জন্য বোঝায় পরিণত হচ্ছে। যেমনটি প্রচার শুরু হয়েছে অতিসাম্প্রতিক বাংলাদেশে।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]