(প্রিয়.কম) মিয়ানমারের রাখাইনে অব্যাহত সেনা নির্যাতনে টিকতে না পেরে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ  আশ্রয় নিয়েছে ৪ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল অব্যাহত থাকলে নতুন করে আসা শরণার্থীর সংখ্যা দশ লাখে পৌঁছাবে বলে আশংকা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। একইসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর ভার সংস্থাটির পক্ষে বহন করা সম্ভব নয় বলেও জানানো হয়। তবে জাতিসংঘ আতঙ্কিত হলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষায় আপ্রাণ চেষ্টা করছে সরকার। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বাংলাদেশ ১৬ কোটি মানুষকে খাওয়াতে পারলে, আরও ৭ লাখ মানুষকেও খাবার দিতে পারবে।

সে মোতাবেক বিভিন্ন উদ্যোগ ও ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত আছে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে। তবে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে জন্মহার অনেক বেশি হওয়ায় সরকার কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ লক্ষ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মাঝে জন্মনিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সব ধরনের উপকরণ বিতরণ করবে, যার মধ্যে রয়েছে কনডম, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়িসহ, ইনজেকশন ও অন্যান্য উপকরণ। এ ছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত অন্যান্য ব্যবস্থাও সরকারিভাবে দেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘আমরা কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ইতোমধ্যে ছয়টি মেডিকেল টিম পাঠিয়েছি। এর মধ্যে তিনটি টিম টেকনাফে এবং অন্য তিনটি টিম উখিয়ায় কাজ করছে। এসব মেডিকেল টিম সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি যৌনরোগ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে রোহিঙ্গাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে প্রচারণা চালাচ্ছে।’

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে একটি চিকিৎসক দল ইতোমধ্যেই এ সপ্তাহের শুরুতে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন। এ টিম শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের পর জন্মনিয়ন্ত্রের কৌশল নির্ধারণ করেছে। 

তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে কনডম, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ও ইনজেকশন সরবরাহ করা হবে।

এ টিমটি যৌনরোগ বিশেষ করে এইচআইভি/এইডস জীবানু কারও শরীরে রয়েছে কি-না তা নির্ধারণে কাজ করছে বলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান।

রোহিঙ্গা পরিবারের সদস্যরা জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতির ব্যাপারে সচেতন নয় উল্লেখ করে ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, এ জন্য অধিকাংশ রোহিঙ্গা পরিবারে ৫ থেকে ৭ জন সন্তান রয়েছে। এর আগে কুতুবখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চিকিৎসকরা একজনের শরীরে এইচআইভি জীবাণু বহনের সন্ধ্যান পেলে তার আলাদাভাবে যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

চিকিৎসকরা ১ লাখ ২০ হাজার টিকা ভ্যাকসিন, ৪০ হাজার পোলিও ভ্যাসসিন, ৩৮ হাজার ভিটামিন ট্যাবলেট রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মাঝে বিতরণ করছে বলেও জানান তিনি।

এ ছাড়া সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. এ এস আলমগীর জানান, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনেকেই অপুষ্টি ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে ডায়রিয়াসহ নানা সংক্রামক রোগে ভুগছে।

প্রসঙ্গত, গত ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইনে বেশ কিছু পুলিশ পোস্টে হামলার প্রেক্ষিতে মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনী নজিরবিহীন নৃশংস অভিযান পরিচালনা করে। খুন, কুপিয়ে-পুড়িয়ে হত্যা, ধর্ষণসহ নানাভাবে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন অব্যাহত রাখে দেশটির নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা। এতে নিহত হয় প্রায় ৩ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা। জীবন বাজি রেখে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছে ৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। ফলে জনশূন্য হয়ে গেছে রাখাইন রাজ্যের প্রায় ১৭৬টি গ্রাম। 

এদিকে সারা বিশ্বে ইউএনএইচসিআর দ্বারা নিবন্ধিত ১৭.২ মিলিয়ন শরণার্থীর ৩০ শতাংশ এখন বাংলাদেশে। বাংলাদেশ্মুখী রোহিঙ্গা ঢল অব্যাহত থাকলে শরণার্থীর এ সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলেও সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। এত সংখ্যক শরণার্থীর দায়িত্ব তাদের পক্ষেও নেওয়া সম্ভব নয় বলে জানায় সংস্থাটি। 

উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা একটি নৃগোষ্ঠীর নাম যাদের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ ইসলাম (প্রায় ৮ লক্ষ) ও ১০ ভাগ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। রোহিঙ্গাদের আদি আবাসস্থল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। শত শত বছর ধরে রাজ্যটিতে বাস করা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি না দিয়ে মিয়ানমার সরকার এ জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালাচ্ছে।

সূত্র: বাসস

প্রিয় সংবাদ/কামরুল