পাঠকের প্রশ্ন: আপু আমি একদম শুরু থেকে বলছি, আমরা ২ভাই ১ বোন। একমাত্র মেয়ে হলে যা আহ্লাদী হয় একটা মেয়ে, ঠিক তেমনটাই ছিলাম।  প্রচন্ড আদর আর ভালবাসার মাঝে বড় হয়েছি। খুব ভাল ছাত্রী ছিলাম আমি। পড়াশোনা করতে ভালবাসতাম। আমার ফ্যামিলি ইসলামিক মাইন্ডের।  আর পাচঁ দশটা মেয়ের মত উগ্রতা আমার মাঝে ছিল না। পরিবার ব্যতীত অন্য বন্ধু বান্ধবী তেমন ছিল না। সারাক্ষন পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ততম সময় কাটতো।

আমি যখন  কলেজ 1st year  পড়ি, ২০১৫ সাল, হুট করে আমার বাবার খুব ভাল বন্ধু আমার ব্যাপারে  একটা বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কিছু না বলা বা বুঝার আগেই আমাকে ছেলে ও তার বাবা দেখতে আসে। আমার অমত থাকলেও যখন দেখলাম মা-বাবার খুশি নষ্ট হবে,  কষ্ট পাবে, তাই এতটুকু অবাধ্য হতে পারি নি। রাজি হয়ে গেলাম, শুধু একটাই কথা বলেছিলাম আম্মুকে- দেখো আম্মু, আমার পড়ালেখা যেন বন্ধ না হয়। আম্মু বলেছিল- শিক্ষিত ছেলে, ভাল ফ্যামিলি,  ভাল চাকুরী করে, পড়াবে না কেন।  এখনকার যুগে এমন হয় নাকি। পড়াবে,  তুমি নিশ্চিত থাকো।

তারপর যাই হোক,  সবার খুশিতে বিয়ে হলো। বিয়ের ২য় দিনের দিন সে আমার সাথে অনেক রাগ করে আমি তাকে নাকি ইচ্ছে করে জড়িয়ে ধরি না, ভালোবাসি না, আচ্ছা আপু বলেন তো একদিনে তাকে আমি কি ভালোবাসবো? তার সাথে এতটা ফ্রি কীভাবে হবো? সে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে চায়। আমার কান্না দেখে আমার কাছে ক্ষমা চায়। 

তারপর থেকেই আমার পড়ালেখা নিয়ে নানান অভিযোগ করে। আমি আমার বাবার বাড়ি গেলে আমাকে ছাড়া  থাকতে পারে না, ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমায়। পড়ালেখার কারণে যত সব দূরত্ব। আমার বাবা-মাকে অভিযোগ করে, অশান্তি করে,  আর এভাবেই খারাপ ভালো মিলিয়ে সময় কাটতে থাকে। তারপর ৪ মাস পর হঠাৎ জানতে পারি আমি প্রেগন্যান্ট, যদিওবা আমার বা তার কারোরই ইচ্ছা ছিল না। এই অবস্থায় আমি টেস্ট পরীক্ষা দেই। অনেক কষ্টে HSC পরীক্ষা দেই।   এত যুদ্ধ করে তবুও ভাল হয়।

আমার বিয়ের পর পরই তার চাকুরীটা চলে যায়। অনেক কষ্টে আবার চাকুরী পায়, ১ মাসের মাথায় ওটাও চলে যায়। তারপর ব্যবসা শুরু করে, ওটাও কিছুদিন পর খারাপ হয়ে যায়। ওর এই কারণে আমি কখনো কোন কিছু আবদার করি নাই, এমন কি মেয়েলী প্রয়োজনীয় জিনিষও আম্মুর কাছে চাইতাম।  ওকে বলতাম না, মাঝে মাঝে বললেও এড়িয়ে যেতো,  পরে আবার বললে বলতো, ভুলে গেছে। সবসময় আমার বাবা-মাকে ছোট করে কথা শুনাত। আরো ছোট ছোট বিষয় নিয়ে অনেক দাঙ্গা হাঙ্গামা করতো। অনেক বকতো। ঝগড়া করতো। মেয়ে হিসেবে কি, বৌ হিসেবেও কোন সম্মান আমাকে সে করে না।

তবুও আমি ওর উপর রাগ করে থাকতে পারতাম না। প্রথম প্রথম আমার শাশুড়ি আমাকে  বলত- ছেলে মানুষ এমন একটুআধটু করেই, মেয়েদের মানতে হয়, না হলে সংসার করা যায় না। কিন্তু পরে ছেলের সাথে তিনিও আমাকে  বকতেন,  যাচ্ছেতাই কথা শুনাতেন। সবসময় ছেলেকে বাজে পরামর্শ দিতেন, অনেক সময় আমার সামনে-পিছনে বলতেন আমার মেয়েরা শশুড়বাড়িতে কখনো এত প্রশ্রয় পায় নাই, তুই তোর বউ কে অনেক সুযোগ দিস, আর তুই ছেলে, সবসময় দাপটে থাকবি। মেয়ে নাকি যে মাথা নিচু করে সব সহ্য করবি??? আপু বিশ্বাস করেন আমরা যদি জোরে একটু হাসাহাসি করি, কিছুক্ষণ পর শাশুড়ি ওকে ডেকে কি যেন বলে। ও তারপর রুমে ঢুকেই যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে আমার সাথে অনেক পুরোনো কোনো একটা বিষয় নিয়ে। আমরা ভাল মূহুর্ত বেশিক্ষণ কাটাতে পারি না। অনেক বুঝাই, নিজে থেকে কাছে টেনে নেই, তবুও কাজ হয় না, ২ দিন পরই আবার যেই সেই। আর মার থেকে শুনে শুনে শুধু অভিযোগ,  আমি সব করার পরও আমার দোষের শেষ নাই। কিছু তো ছাড় দেয়ই না,উল্টো যা করি নাই তা নিয়ে ভুল বুঝে ঝগড়া করবে। বুঝাতে চাইলে আরও মেজাজ দেখাবে।  আর ১টা কথা,  ওর এমন ব্যবহারের কারণে আমি অনেক ভাবি, গোপনে খোজঁ নেই, জানতে পারি অন্য কোন সম্পর্ক নেই। ওর মোবাইলে কখনো তেমন কোন মেয়ের ম্যাসেজ বা ফোন পাই না।

বাইরে থাকলে, আমি ওকে ফোন দিলেও সারাদিন ব্যস্ততা দেখায়, ফোন ধরে না। আর আমি ফোন দিতে দেখলেই আমার শাশুড়ি বলবে,আমি নাকি উনার ছেলেকে পাগল বানায় ফেলবো। বলে- তুমি দেখো আমি তোমার বাবাকে বাইরে গেলে ফোন দেই নাকি? তুমি দাও কেন তোমার জামাইকে এত ফোন? আচ্ছা আপু বলেন আমার বয়স আর উনার বয়স কি সমান? 

 আর আপু, বিয়ের দুই বছর পরও ওর কোনো ইনকাম নেই, আমি বিয়ের পর অনেক টাকা সালামি পাই।  প্রায় সত্তর হাজার টাকা পাই, সব টাকাই আমি আস্তে আস্তে দিয়ে দেই, ওর কষ্ট আমি সহ্য করতে পারতাম না।  তারপর আমার ছেলে হলো, ছেলের হাদিয়াও প্রায় ৫০ হাজার টাকা পাই।তখন চিন্তা করি কোন ভাবেই যখন ও কিছু সফল করতে পারছে না, তাহলে এই টাকা দিয়ে থ্রি পিসের ব্যবসা বাসায় করি। কোনো ভাবে ওকে একটু হেল্প করতে পারি কিনা। কারণ এরই মধ্যে তার অনেক ঋণ হয়ে যায়।  এতে কিছু লাভ হয়, তার মাঝেও ও অল্প অল্প করে বেশ কিছু টাকা নিয়ে যায়। আমি তখন হিসেব রাখি না যে কত টাকা নিছে বা নিচ্ছে, কিন্তু হঠাৎ একদিন একজনের ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে আমার কাছে ৩৫ হাজার টাকা চায়। আমি বলি যে অনেক টাকা তো তুমি নিয়ে গেছ, আমার কাছে তো এত টাকা নেই। বলে, হিসাব দাও কখন কি টাকা আমি নিছি?  আমি বলি, আমি হিসাব লিখে রাখি নাই, যখন যা চাইছ তাই দিছিলাম।  ও আমাকে অনেক বকে,  বলে আমি নাকি বাপের বাড়ি টাকা পাঠায় দিছি তাই হিসাব দেই না। আপু, আমার পরিবার  অনেক ধনী,  আর আমি বাড়ির বাইরে বের হই না, তবুও যাচ্ছেতাই বকে গেছে। শেষে বলে আমি যেখান থেকে পারি যেন টাকা এনে দেই। আমি অনেক কান্নাকাটি করি  তারপর উপায় না পেয়ে কাউকে না জানিয়ে আমি আমার  গয়না বিক্রি করে টাকা আনি। বাসায় আসার সাথে সাথে দুই মা আর ছেলে মিলে অনেক নোংরা কথা বলে, আমি  কিছু না বলে টাকাটা ওর হাতে দিয়ে বলি, নাও তোমার টাকার দরকার টাকা নাও।  

তারপর ও আর ওর মা বলে আমি নাকি অন্য পুরুষের সাথে খারাপ কাজ করে টাকাটা আনি। তারপর আমার শাশুড়ি আমার গায়ে হাত তোলে,  সেও আমার গায়ে হাত তোলে। অনেক অনেক মারে, ওড়না পেঁচিয়ে মারতে চায়, আমার শাশুড়ি বলে-  জেলে নিবে তোকে,  ছাড়।  পরে ছাড়ে, কিন্তু অনেক লাথি মারে। আমার তখন সিজার হয়েছে, আমার বাচ্চাটা আমার দুধ খায়,  অথচ সে আমাকে বুকে পেটে অনেক জোড়ে জোড়ে লাথি মারে। অন্ধকারে মারে যেন আশেপাশের বাসা থেকে কেউ দেখতে না পায়। আপু কষ্ট থেকে আমি অবাক হয়েছি বেশি, কীভাবে পারে এত নিষ্ঠুর হতে মানুষ। তারপর আবার ফোন দিয়ে আমার মাকে বলে আমি নাকি ওর মায়ের গায়ে হাত তুলছি। যত সব বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলেছে। আম্মু না পেরে আমার মামাকে ফোন দেয়, কিন্তু মামা আমাকে নিয়ে যেতে চায় না। আমার মামাকে দেখে শাশুড়ি বলে এই মেয়ের সাথে আমার ছেলে আর সংসার করবে না, নিয়ে যান ওকে। আমার মামা ওর সাথে কথা বলতে চায় কিন্তু ওর মা ওকে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বলে। পরে আমি আমার ছেলেকে নিয়ে আমার মামার বাসায় চলে যাই। অনেক কষ্ট সহ্য করি তবুও লোকলজ্জার ভয়ে আমার মামারা ওর বাবার সাথে কথা বলে আমাকে ঐ বাড়ি দিয়ে আসে। বলে এই নিষ্পাপ শিশুর দিকে তাকায় সব মেনে নিতে। আমি তবুও সব মাটিচাপা দিয়ে সংসার করে যাই।

এখানেই শেষ না, এবার  শুরু হয় নতুন নাটক। এবার আসার পর থেকে আমার শাশুড়ি প্রতি কথায় কথায় হেয় করে, যা খুশি তাই বলে যাচ্ছে, আমার সাথে ওকে দেখলেই সহ্য করে না। নানান মিথ্যা কথা লুকিয়ে লুকিয়ে বলে আর ঘরে এসে আমার সাথে খারাপ আচরণ করে,  কথায় কথায় গায়ে হাত তোলার কথা বলে। আপু, শুধু বাচ্চার দিকে তাকিয়ে সব সহ্য করি, বলি আমি যদি বাবা বাড়ি চলে যাই এই বাচ্চাটা তো তার বাবাকে হারাবে। আর সমাজের চোখে আমি আজীবন দোষী থাকবো।  আমি মায়া ছাড়তে পারি না, ভাবি এই বুঝি ও আমাকে বুঝলো, আমাকে সম্মান করল, আমাকে ভালবাসলো..... ভাবি আমার ভালটা দিয়ে আমি তাকে ভাল বানাবো, কিন্তু সব স্বপ্ন ফিকে হয়ে যায়। 

আমি ৩ মাস পর বাবার বাড়ি আসি, যে দিন আসি ঠিক সেদিনই ওর মা ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করে বলে, পায়ের অনেক ব্যথা অবশ হয়ে যাচ্ছে, নড়তে পারছে না বলে ওকে। সাথে সাথেই সে চলে যায়। যাওয়ার পর দিন সকালে আমাকে ফোন দিয়ে নানা অভিযোগ করে বলে,  আমাকে নিয়ে তার সংসার করতে বাবা-মা কেউ রাজি না, আমাকে নিয়ে আলাদা হয়ে যেতে বলে, কিন্তু ও তো বেকার,  কি করবে? আমাকে বলে আমি আমার বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম, তুমি তোমার বাপের বাড়ি যত দিন খুশি থাক। আমি বাসা পেলে তোমাকে আনবো।  আমাকে ইচ্ছামত বকে ফোন বন্ধ করে দেয়।। আজ ২ দিন কোনো যোগাযোগ করে না। আমি অনেক মেসেজ দেই, কোনো রিপ্লাই দেয় না। ফোন দেই,  কেটে দেয়। ধরে না। 

আমার বাবা মার সিদ্ধান্ত, বিয়ে মেয়েদের ১ বারই হয়, তোমার ভাগ্যে যা ছিল তাই মেনে নাও। ওকে ছেড়ে দিলে বাকি জীবন মানুষের কটু কথা শুনে অসম্মান নিয়ে চলতে হবে।  আর তাছাড়া ছেলেটা বড় হচ্ছে,  তাকে কী বলবে বাবা সম্পর্কে? সম্পর্ক ভাঙা সহজ টিকিয়ে রাখা কঠিন।  ওর ভবিষ্যৎ চিন্তা করে সব মেনে নাও। মুখ বুঝে  কষ্ট কর, আল্লাহই প্রতিদান দিবে।

কিন্তু আপু আর কত? আপু এখন আমি কি করবো?  নিজেকে শেষ করার মত নিষ্ঠুর চিন্তা আমি করি না। আমি কিভাবে এগিয়ে যাব?  কী করব? পড়ালেখা করতে যে টাকা লাগে সেটাও তো আমার নেই।  আমি কী করবো বুঝতে পারছি না। আপু আমাকে একটু বলবেন এর কি সমাধান??? আমি বাঁচতে চাই। সুখে থাকতে চাই। মানসিক প্রশান্তি চাই।

প্রশ্নটি আমাদের ফেসবুক পেজে করেছেন : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন

চাইলে আপনিও যেকোনো প্রশ্ন করতে পারেন আমাদের কাছে। আর নিজের নাম গোপন রাখতে চাইলে প্রশ্ন পাঠাতে পারেন পেজের ইনবক্সেসঙ্গে লিখে দিতে হবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। আমাদের ফেসবুক পেজ দেখতে এখানে ক্লিক করুন। আর উত্তর জানতে এখানে ক্লিক করুন

স্বাস্থ্য হোক বা সৌন্দর্যখেলা হোক বা সিনেমাদাম্পত্য বা প্রেমঅফিসের সমস্যা কিংবা আইনিবিজ্ঞান হোক বা রাজনীতিস্কুল-কলেজ হোক বা সামাজিক ও পারিবারিক কোনো সমস্যা। যে কোনো সমস্যা লিখে জানান আমাদের। আপনার হয়ে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করবো আমরা।

 আপনার প্রশ্নবিশেষজ্ঞের উত্তর।