(প্রিয়.কম) ফুল ভালোবাসে না এমন মানুষের সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য। ফুলের মেঘ কি দেখেছেন কখনো? হালকা গোলাপী আভায় নিথর কাঠে ফুটে ওঠা সহস্র ফুলের বাহার কেবলমাত্র চেরি ফুলের মাঝেই পাবেন। দূর থেকে দেখলে যে কেউ ভাববে, মেঘ বুঝি তার রং পাল্টে গোলাপী বর্ণ ধারন করেছে। চেরি ফুলের ঋতু খুব সংক্ষিপ্ত হয়ে থাকে, প্রায় দুই সপ্তাহব্যাপী। যদিও বেশীরভাগ ফুলগুলো সাধারণত ফ্যাকাশে গোলাপী বা তুষার সাদা রঙের হয়, তবে ছয়শ'রও বেশি প্রকারের চেরি ফুলের খোঁজ পাওয়া যায়। চেরি ব্লসম দেখতে চাইলে প্রথমেই হয়তো আপনার মাথায় আসবে জাপানের কথা, নতুবা মনে করবেন ওয়াশিংটন ডি.সি. চেরি ব্লসমের জন্য সেরা জায়গা। কিন্তু না, পৃথিবীর সেরা চেরি ফুলের রাজধানী হিসেবে আমেরিকার জর্জিয়া রাজ্যের ম্যাকন শহর খ্যাতি পেয়েছে। 


বসন্ত আসলেই চেরি ফুলে ছেয়ে যায় পুরো শহর। 

চেরি ফুলের উৎসবের ইতিহাস একশ বছরের পুরনো। ১৯১২ সালের ২৭ মার্চ দু দেশের বন্ধুত্বের সম্পর্কে আরো জোরদার করতে ওয়াশিংটনের মেয়রকে চেরি গাছ উপহার দিয়েছিলেন জাপানের রাজধানী টোকিওর মেয়র। উপহারের অমর্যাদা করেনি যুক্তরাষ্ট্র। তাই ওয়াশিংটন ডিসি জুড়েও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য চেরি গাছ। বসন্তে সেখানেও ফোটে হাজার হাজার চেরি ফুল। ন্যাশনাল পার্কের জরিপ অনুযায়ী, ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ লাখ চেরি গাছ ম্যাকনে রয়েছে যা ওয়াশিংটন ডিসি'র তুলনায় প্রায় ৯০ গুণ বেশি। এ কারণেই এই শহরকে চেরি ফুলের রাজধানী বলা হয়ে থাকে। এই শিরোনামে অসাধারণ শহরটির যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৯ সালে। ঐ বছর ম্যাকন নিবাসী উইলিয়াম ও ফ্লিকিং তাদের বাড়ির পেছনে দক্ষিণ আমেরিকার একটি বিরল প্রজাতির ওসিনো চেরি গাছ আবিষ্কার করেছিলেন। ফ্লিকিং এর বাড়ির মালী পরামর্শ দেয়ার পরেও প্রথমে তিনি এই অদ্ভুত প্রজাতির গাছ চিনতে পারেননি। এর কয়েক বছর পর ১৯৫২ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে থাকা অবস্থায় গাছটি সম্পর্কে তিনি জানতে পারেন। তারপর তিনি সেখানে চেরি গাছের পরিচর্যা শেখেন এবং ম্যাকনে ফিরে প্রচার করতে থাকেন। 


ইন্টারন্যাশনাল চেরি ব্লসম ফেস্টিভ্যালের একাংশ। 

অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল চেরি ব্লসম উৎসবের কথা বলতে গেলে প্রথমেই ক্যারলিন ক্র্যাটেনের নাম স্মরণ করতে হয়। ক্র্যাটেন ফ্লিকিং এর কাছ থেকে পাঁচশ চারা গাছ নিয়ে নেন এবং ওয়েসলিউন উডসে ম্যাকন কমিউনিটিকে সাথে নিয়ে সেগুলোর বীজ বপন করেন। ক্র্যাটেন বৃক্ষ রোপণকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যান আর তার মাধ্যমেই ইন্টারন্যাশনাল চেরি ব্লসম উৎসবের হাতেখড়ি। প্রথম চেরি ব্লসম উৎসব অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮২ সালে। তখন এটি শুধুমাত্র তিনদিনের একটি উৎসব ছিল আর এখন এটি মাসব্যাপী উদযাপন করা হয়। এ বছর ম্যাকনে ২৪শে মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত এই উৎসব পালিত হয় যার মধ্যে স্ট্রিট পার্টি থেকে শুরু করে ব্লসম প্যারাডেও ছিল।
উৎসবে যোগদানকারীরা শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে একটি র‍্যালি বের করে যা শহরের দক্ষিণ থেকে উত্তর ম্যাকন আবাসিক এলাকাগুলোর মধ্য দিয়ে প্রদক্ষিণ করে এবং সবশেষে ওয়েসলিউন উডসে যেয়ে শেষ হয়, যেখান থেকে এই চেরি উৎসবের শুরু। আপনি যদি মনে করেন, যেকোনো সময় ম্যাকন তার এই উপাধি হারাতে পারে তাহলে আপনি ভুল ভাবছেন। প্রতিবছর ফ্লিকিং ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন এই শহরে হাজার হাজার চেরি গাছ রোপণ করে যাতে করে চেরি ফুলের রাজধানীর সৌন্দর্য অটুট থাকে।

জাপানের চেরি ব্লসম এখন আর শুধুমাত্র জাপানিজদের উৎসব নয়। উৎসবের রঙ গত কয়েক শতকে বিশ্বকে রাঙিয়ে দিতে অন্যান্য দেশেও পালিত হয়ে আসছে। ভৌগলিক দূরত্ব পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা ও ইংল্যান্ডসহ পৃথিবীর নানা দেশে মৈত্রী বা বিজয়ের প্রতীক হিসেবে এই উৎসব উদযাপিত হচ্ছে। যদিও আমাদের দেশে শুধুমাত্র ঘরোয়াভাবে কেউ কেউ চেরি গাছ রোপণ করে থাকে তবে চেরি ফুলের আসল রূপ দেখতে হলে আপনাকে সেই সুদূর আমেরিকার শহরে ঢুঁ মারতে হবে। তাহলে আসছে বসন্তের ভ্রমণ তালিকায় যোগ করে রাখুন চেরি ফুলের রাজধানীর গন্তব্য। 

সম্পাদনাঃ ড. জিনিয়া রহমান

প্রিয় ট্রাভেল সম্পর্কে আমাদের লেখা পড়তে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেইজে। যে কোনো তথ্য জানতে মেইল করুন travel@priyo.com এই ঠিকানায়। ভ্রমণ বিষয়ক আপনার যেকোনো লেখা পাঠাতে ক্লিক করুন এই লিংকে-https://www.priyo.com/post