গত আরাকান ক্রাইসিস নিয়ে যখন লিখলাম, তখন অনেকের কুঞ্চিত ভ্রু দেখেছি, শুনেছি সাম্প্রদায়িক, এমনকি গাধার ভদ্র সংস্করণ মূর্খ সম্বোধনও। গায়ে লাগাইনি, যার যার নিজস্ব চিন্তার অধিকার রয়েছে, এমনকি আমাকে মূর্খ বলারও। তবে এবার গণেশ বোধ হয় উল্টানোর পথে। তা না হলে গেলবারের ‘প্রগতিশীল জ্ঞানীরা’ এবার ‘জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক’ রোহিঙ্গাদের বিষয়ে ‘মানবতার বাণী’ নিয়ে মাঠে নেমেছেন। গতবার বলেছেন, রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে সারাদেশে জঙ্গিবাদ ছড়াচ্ছে, আজ তারাই বলছেন, ‘ধর্ম কোনো বিষয় নয়, মানবতাই বড়’। ইসলামের নাম শুনলে যাদের গা জ্বলে, তাদের মুখে এমন কথা শুনে সাধুবাদ জানানোর বিষয়ে রীতিমতো কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় পড়েছি। 

গত ক্রাইসিসেও আমি বলেছিলাম, রোহিঙ্গাদের নিধনের মূল কারণ ধর্ম নয়, ধর্ম অজুহাত মাত্র। এটা স্রেফ এথিনিক ক্লিন্সিং (জাতিগত নির্মূল প্রক্রিয়া)। তবে ধর্মও এর সঙ্গে জড়িত। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উগ্র একটি অংশ মিয়ানমারে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নেশায়, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নিরংকুশ সমর্থনের আশায় ধর্মের নামে এই নির্মূল প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হয়। ‘নাইন সিক্স নাইন’ এমন সংখ্যাটি বৌদ্ধ ধর্মে পবিত্র বলে বিবেচিত। ‘বৌদ্ধ, ভিক্ষু, সংঘ’ এই তিন নিয়েই ‘নাইন সিক্স নাইন’। এমন পবিত্রতার আবরণেই মিয়ানমারের উগ্র বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আশ্বিন ভিরাথু নামে এক ভিক্ষুর নেতৃত্বে শুরু করে উগ্রপন্থী কার্যকলাপ, যা পরিচিত পেয়েছে ‘নাইন সিক্স নাইন’ নামের কথিত আন্দোলন হিসাবে। জাতিগত নির্মূল প্রক্রিয়ায় যা মিয়ানমার সরকার তথা সূচি’র দলকে অনেক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। 

‘নাইন সিক্স নাইন’ নামের তথাকথিত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আন্দোলনের বিপরীতে তাই সহজেই রোহিঙ্গাদের স্বাধিকার আন্দোলনকে মুসলিম সন্ত্রাসবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করছে মিয়ানমার সরকার। একইসঙ্গে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বাসযোগ্য করার চেষ্টা চালাচ্ছে। আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি আর্মি (এআরএসএ)-কে দেওয়া হচ্ছে জঙ্গি সংগঠন আইএস’র তকমা। অথচ রোহিঙ্গা এআরএসএ’র লড়াই হলো স্বাধিকারের জন্য, স্বাধীনতার জন্য যেমন আমাদের ছিল একাত্তরে। জার্মান বার্তা সংস্থা ‘ডয়চে ভেলে’র একটা রিপোর্টে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া একজন রোহিঙ্গা মা’র কথা তুলে ধরা হয়েছে। যে মা তার দুই ছেলেকে রাখাইনে রেখে এসেছেন স্বাধিকারের লড়াইয়ের জন্য, পরবর্তীতে আরেকজনকেও পাঠিয়েছেন। এএফপি’র বরাত দিয়ে সেই মা’কে উদ্ধৃত করে ‘ডয়চে ভেলে’ জানিয়েছে, ‘আমি আমার ছেলেদের পাঠিয়েছি স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে। আমি তাদের উৎসর্গ করেছি, স্বাধীন আরাকানের জন্য।’ এমন দৃঢ় উচ্চারণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা, আমাদের ইতিহাসও তো তাই। পিঠ যখন ঠেকে যায় তখন ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। সুতরাং এমন স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনকে যারা সন্ত্রাসবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করতে চান, ধর্মীয় পরিচয়ে আবদ্ধ করতে চান, তাদের প্রতি করুণা ছাড়া আর কী-ইবা করা যায়। 

আরেকজন রোহিঙ্গা গৃহবধু গর্ভাবস্থায় তার স্বামীকে রেখে এসেছেন যুদ্ধের জন্য। তার স্বামী তাকে বলেছেন, ‘হয় স্বাধীন আরাকানে দেখা হবে, নয়তো বেহেশতে’। বুক জ্বালিয়ে, চোখ ভিজিয়ে দেওয়ার মতো কথা। এ যেন আমাদেরই প্রতিবিম্ব, আয়নায় নিজ মুখ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু ভারতে নয়, তৎকালীন বার্মার মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন প্রদেশেও আমরা শরণার্থী হয়েছিলাম। তখন আমরাও ছিলাম এখনকার তাদের মতোই অসহায়, বিপন্ন। আজ তারা বিপন্ন, অসহায়। সুতরাং তাদের আশ্রয় দেয়া শুধু মানবিক নয়, আমাদের নৈতিক দায়িত্বও। গত ক্রাইসিসের সময়ও এ কথা বলেছি, লিখেছি, এবারও বলছি, ঋণ শোধের সুযোগ খুব বেশি পাওয়া যায় না। 

গত ক্রাইসিসে ফিলিস্তিনিদের সাথে তুলনা করেছিলাম রোহিঙ্গাদের। ফিলিস্তিনিরা নিজ ভূখণ্ডে পরবাসী, তাদের কোনো দেশ ছিল না, এখন রোহিঙ্গারাও তাই। তারা নিজ ভূখণ্ডে পরবাসী, তাদেরও কোনো নাগরিকত্বের স্বীকৃতি নেই। সূচি’র সরকার দাবি করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে আসা ‘সেটলার’, তাদের নাগরিক নয়। সূচি’দের ভাষায় ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’। যেহেতু রোহিঙ্গাদের ভাষা আমাদের চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার মতো, বলা যায় বাংলাই, সেহেতু তারা ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’। দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমার সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো এমন কথাই বলে আসছে। ইদানিং কোনোরকম রাখঢাক না করে সরাসরিই রোহিঙ্গাদের আখ্যায়িত করছে ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ তকমায়, আঙুল তুলছে বাংলাদেশের দিকে। যারা কথায় কথায় রোহিঙ্গাদের দোষারোপ করেন, নিরাশ্রয় করাকে সমর্থন দেন, আশ্রয় দেয়াকে নিরুৎসাহিত করেন, তারা বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন। আমরা আশ্রয় দেই আর না-ইবা দেই, তারা কিন্তু রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ হিসেবেই চিহ্নিত করেছে এবং এটাকেই ‘এথিনিক ক্লিন্সিং’ এর অজুহাত হিসাবে দাঁড় করিয়েছে। সাথে বিশ্বের সমর্থন পাবার আশায় যোগ করেছে মুসলিম সন্ত্রাসবাদের বিষয়টিকে। 

আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন ঠেকাতে সিআইএ’র পরিকল্পনায় আল কায়েদা জন্ম নেয়ার পর থেকেই বিশ্বে মুসলিম সন্ত্রাসবাদের কথা উঠতে শুরু করে। মজার ব্যাপার এর অনেক আগে থেকেই কিন্তু রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের শুরু। ইতিহাসের দিকে যাই। স্বাধীন রাজ্য আরাকানে দুইশ বছরের মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে ১৬৩৫ খ্রিস্টাব্দের পর। সেখান থেকেই শুরু আরাকানি মুসলমান তথা রোহিঙ্গাদের ভাগ্য বিপর্যয়ের। ১৬৬০ সালে আরাকানের রাজা থান্দথুধর্মা নিজ রাজ্যে আশ্রিত মোঘল সম্রাট শাহজাদা সুজাকে হত্যা করে এবং মুসলমানদের ওপর শুরু করে অমানবিক নির্যাতন। ১৭৮০ সালে আরাকান স্বাধীনতা হারায়। বর্মী রাজা বোধাপোয়া আরাকান দখল করে নেন। ঘোর মুসলিম বিরোধী রাজা বোধাপোয়াও অসংখ্য মুসমানকে হত্যা করেন। এরপর ইংরেজ শাসনের অধীনে চলে যায় বার্মা। ১৯৩৭ সালে স্বায়ত্বশাসন দেওয়া হয় বার্মাকে। এ সময়টাতে সাম্প্রদায়িকতা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে, দাঙ্গায় নিহত হয় ৩০ লাখ মুসলিম। ১৯৪৮ সালে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভের পরও, রোহিঙ্গা তথা বার্মার মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বিড়ম্বনার শেষ হয়নি। তাদের দেওয়া হয়নি নাগরিকত্ব; এমনকি শিক্ষা, চিকিৎসার মতো মৌলিক সুযোগগুলো থেকেও বঞ্চিত হয়েছে তারা। যার ধারাবাহিকতা আজও চলছে রোহিঙ্গাদের নির্মূল প্রক্রিয়ায়। এই হলো ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত। 

ইতিহাসের এই ধারার বিপরীতে নিপীড়ণ, দাঙ্গা আর হত্যার শিকার রোহিঙ্গাদের যারা ‘মুসলিম সন্ত্রাসবাদী’ বলে আখ্যায়িত করেন, তারা হয় ইতিহাস জানেন না, না হয় নিজেদের ‘মগ’ ভাবেন এবং তাদের চারপাশকে ‘মগের মুল্লুক’ বলে পরিগণিত করেন। ‘মগ ও মগের মুল্লুক’ সম্পর্কে সরাসরি উইকিপিডিয়া’কে উদ্ধৃত করি, “রাখাইনে দুটি সম্প্রদায়ের বসবাস, দক্ষিণে বার্মার বংশোদ্ভুত ‘মগ’ ও উত্তরে ভারতীয় বংশোদ্ভুত ‘রোহিঙ্গা’। মগরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মগের মুল্লুক কথাটি বাংলাদেশে পরিচিত। দস্যুবৃত্তির কারণেই এমন নাম হয়েছে ‘মগ’দের। একসময় তাদের দৌরাত্ম্য ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। মোঘলরা তাদের তাড়া করে জঙ্গলে ফেরত পাঠায়।” আরও কী কিছু বলতে হবে মগদের সম্পর্কে?

‘মগ’দের দস্যুবৃত্তির নমুনা আমরা আজও দেখতে পাচ্ছি। তাদের দৌরাত্ম্যে অসহায়, বিপন্ন রোহিঙ্গা পরিচয়ের মানুষেরা নিজ দেশ ছেড়ে, ভিটা ছেড়ে কী কষ্ট-যাতনায় যে অন্য দেশে আশ্রয়প্রার্থী হচ্ছেন, কী করুণ বিপর্যস্ত অবস্থায় জঙ্গলে, নোম্যানসল্যান্ডে দিনযাপন করছেন, তা চোখে দেখার মতো নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যাচার নিপীড়নের যে চিত্র ও ভিডিও ক্লিপ ঘুরে বেড়াচ্ছে সেগুলো দেখে ধৈর্য ধারণ করা অনেকটাই অসম্ভব। 

অথচ এমন বিপন্ন, অসহায় মানুষদের প্রতি যখন আমাদের দু’হাত প্রসারিত করে দেওয়ার কথা, তখন আমরা দ্বিধায় ভুগছি। আমরা ভুলে গেছি আমাদের শরণার্থী জীবনের কথা, যখন আমরা ছিলাম সাহায্যপ্রার্থী! এটা কী অধঃপতন না ঊর্ধ্বারোহণ?

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]