(প্রিয়.কম) আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান এর আজ ১১তম প্রয়াণ দিবস। ২০০৬ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কবির প্রয়াণ দিবসে প্রিয়.কমে তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন সাহিত্য জগতে তার স্নেহধন্য অনুজ খ্যাতিমান আধুনিক কবি আবু হাসান শাহরিয়ার।

প্রিয়.কম: কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে আপনার ঘনিষ্ঠতা ছিল। অগ্রজ এই কবিকে নিয়ে আপনার স্মৃতি জানতে চাই।

আবু হাসান শাহরিয়ার: রাহমান ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল পরিচয়ের পাঁচ-দশ বছর পরে। পুরোনো ঢাকার লায়ন সিনেমা হলের পাশে তিনি যখন থাকতেন তখন থেকেই তার সঙ্গে পরিচয়ের সূচনা। দৈনিক বাংলা বিচিত্রার সম্পাদক থাকাকালীন তার ঘরে আমি আড্ডা দিয়েছি। মাঝখানে তিনি সোবহানবাগের একটা ভাড়া বাসায় থাকতেন, সেখানেও আমি গিয়েছি। তারপরে তিনি শ্যামলীতে নিজের বাসায় গিয়েছিলেন। শ্যামলীতে থাকার সময় তো প্রায় প্রতিদিন সকালে তার সাথে আমার ল্যান্ডফোনে কথা হতো, হয় তিনি ফোন দিতেন না হয় আমি।

প্রিয়.কম: তার শ্যমলীর বাড়িতে আপনার অনেক স্মৃতি আছে বলে জানি।

আবু হাসান শাহরিয়ার: শ্যামলীতে নিজের বাড়িতে উঠার পর তিনি প্রায়ই ডাকতেন, আমিও যেতাম। শীতের পিঠা তার খুব পছন্দের ছিল, শীতকালে ফোন করে পিঠা খেতে ডাকতেন- চলে আসো শাহরিয়ার শুধু তার সাথেই নয়, তার পরিবারের সবার সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক ছিল। জোহরা ভাবীর সঙ্গে ছিল, তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তার বড় ছেলে ফাইয়ায, পুত্রবধূ টিয়া, নাতনি নয়নাদিপিতা- সবার সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল।

প্রিয়.কম: তার সাথে নিশ্চয় অনেক বিষয়ে আড্ডা হতো?

আবু হাসান শাহরিয়ার: অবশ্যই তার বাড়িতে নিয়মিত যাওয়ার কারণে অনেক বিষয়ে আমাদের কথা হতো। তিনি আমার কাছে বই নিতেন, আমিও তার কাছ থেকে বই নিতাম। কবিতা নিয়ে গহন আলোচনার ফাঁকে তার সঙ্গে অনেক রসিকতাপূর্ণ কথাও হতো।  

প্রিয়.কম: আজকাল এই ধরণের আড্ডাগুলো কমে গেছে, নেই বললেই চলে...

আবু হাসান শাহরিয়ার: অগ্রজ আর অনুজর এই সম্পর্কটা খুব জরুরি। তার সঙ্গে আমার বয়সের ব্যবধান ত্রিশ বছর হলেও, আমরা এক সময় অসম বয়সী বন্ধুত্বে রূপান্তরিত হয়েছি এবং তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই সম্পর্ক অটুট ছিল। তার মৃত্যুর দিনও বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি তার সাথে ছিলাম। শেষের দিনগুলো প্রায় প্রতিদিনই তাকে দেখতে যেতাম। মজার বিষয়- তার সঙ্গে আমার বয়সের ব্যবধান যেমন ত্রিশ, আমাদের সম্পর্ক সময়কালও তাই। এই সম্পর্কের জন্য আমি তার কাছে ঋণী।

প্রিয়.কম: তিনি তার একটি প্রবন্ধের বই আপনাকে উৎসর্গ করেছিলেন, আবার আপনিও তাকে নিয়ে একটি বই লিখেছেনআমরা একসঙ্গে হেঁটেছিলাম”।

আবু হাসান শাহরিয়ার: রাহমান ভাইয়ের সঙ্গে তুমি যে বইয়ের কথা বলছো, সেটা ছাড়াও আমরা যৌথভাবে আরেকটি বই করেছিলাম ১৯৮৪ সালে- "প্রামাণ্য শামসুর রাহমান" নামে তারও বহু আগে থেকে রাহমান ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয়দীর্ঘ ত্রিশ বছরের ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ হয়েছে আমার। সেগুলোই উঠে এসেছে আমরা একসঙ্গে হেঁটেছিলাম বইটিতে।

শামসুর রাহমান ও আবু হাসান শাহরিয়ার

প্রিয়.কম: চিন্তার ক্ষেত্রে অনেক সময় নিশ্চয় তার সাথে আপনার মতের অমিল হতো?

আবু হাসান শাহরিয়ার: অনেক সময়-ই তা হয়েছে। একবার তিনি এক রাজনৈতিক গদ্যে লিখলেন- পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারা হচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম- পাখির মতো গুলি করে লিখলেন যে? পাখির প্রাণের কি মূল্য নেই? আমার কথায় তিনি কিছুটা ক্ষেপে ফিয়ে বলেছিলেন- পাখি আর মানুষ কি সমান? আমিও তাকে উত্তরে বললাম- আমি কি বলেছি সমান? মানুষের চেয়ে পাখি অনেক ভালো। তিনি হেসে দিলেন। আমার সঙ্গে অনেক বিষয়ে তার মতদ্বৈধতা থাকলেও কখনোই সেটা মতবিরোধে পরিণত হয়নি। যারা আমার আমরা একসঙ্গে হেঁটেছিলাম পড়েছেন, তারা বিষয়টি জানবেন।

প্রিয়.কম: তিনি তো পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন। আহসান হাবীব যে পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক, তিনি ছিলেন সেই পত্রিকার সম্পাদক। তাদের সময়ের কবিদের মধ্যে কাব্যহিংসা থাকলেও পারস্পরিক সম্মান কাজ করতো...

আবু হাসান শাহরিয়ার: আহসান হাবীব যে পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন, শামসুর রাহমান ছিলেন সেই পত্রিকার প্রধান সম্পাদক। শামসুর রাহমানকে কোনো লেখা দিতে হলে হেঁটে হাবীব ভাইয়ের রুমে গিয়ে দিয়ে আসতে হতো। সম্পাদক সাহিত্য সম্পাদকের রুমে হেঁটে যাচ্ছেন কবিতা ছাপাতে, এটা তো আজকের দিনে কেউ ভাবতেও পারবেন না। 

প্রিয় সাহিত্য/গোরা