(প্রিয়কম) একজন মানুষ যখন সম্পর্কের মধ্যে অবমাননার কথা শোনেন তখন তিনি ধরেই নেন যে সেখানে শারীরিক প্রহার এবং অত্যাচার রয়েছে। কিন্তু সত্যি কথা হলো, শুধুমাত্র শারীরিকভাবে অত্যাচার করলেই একজনকে অ্যাবিউজ করা হয় না। সম্পর্কে থাকা একজন মানুষকে মানসিকভাবে বিভিন্ন উপায়ে অত্যাচার করে, তাদের অনুভূতিকে আঘাত করেও অবমাননা করা যায়।

মনে রাখতে হবে, একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে দুইজন মানুষের মাঝে। সেটা হতে পারে ভালোবাসার সম্পর্ক, বন্ধুত্বের সম্পর্ক অথবা পারিবারিক সম্পর্ক। কিন্তু কোন সম্পর্কের মাঝে একজন যখন অন্যজনের উপর মানসিকভাবে অত্যাচার শুরু করেন তখন সেটা কোন সুস্থ সম্পর্ক থাকে না। যেটা হয়ে যায় সম্পূর্ণ বিষাক্ত একটি সম্পর্ক। এই বিষাক্ত সম্পর্কের মাঝে থেকেও অনেকেই বিষয়গুলো ধরতে পারেন না, বুঝতে পারেন না। অথবা তারা নিজেদের বুঝিয়ে উঠতে পারেন না যে তারা সঙ্গীর দ্বারা মানসিক অত্যাচারের শিকার! 

আপনি কি নিজের সঙ্গীর দ্বারা মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন? মিলিয়ে নিন... 

১/ সবসময় আপনাকে নিজের আয়ত্বে রাখতে চাইবে

অনেক ভালোবাসার সম্পর্কে সঙ্গী এমন হন যে আপনার জীবনের সকল ক্ষেত্রে, সকল সিদ্ধান্তের ব্যপারে সে হস্তক্ষেপ করতে চান। আপনি কার সাথে কথা বলছেন, কার সাথে মিশছেন, কার সাথে বেড়াতে যাচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন- এমন হাজারো সাধারণ ব্যাপারে তারা প্রতিনিয়ত হস্তক্ষেপ করে থাকবেন। এমনকি অনেক সময় অত্যাচারকারী ঠিক করে দেন কোন কোন মানুষের সাথে আপনি কথা বলতে পারবেন এবং কোন কোন মানুষের সাথে আপনি কথা বলতে পারবেন না। অনেক সময় খুবই নগন্য এবং তুচ্ছ কারণেই আপনাকে বাধ্য করবে আপনার কিছু পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। এর সাথে আপনি কেমন মেকআপ করবেন, কীভাবে মেকআপ করবেন, মেকআপ আদৌ করবেন কিনা, কী পড়বেন, কী পড়বেন না- সকল কিছুই সে ঠিক করে দিবেন এবং আপনাকেও ঠিক তার মনের মতোই চলতে হবে।

২/ আপনাকে অপমান করবে  

মানুষজনের সামনে সে আপনার সাথে এমন আচরণ করবে যা সকলের সামনে আপনাকে অপমানিত করে, যে আচরণ ছোট করে ফেলে! হয়তো তার বন্ধুদের সামনে অথবা তার পরিচিত মানুষদের সামনে সে আপনার সাথে এমনভাবে আচরণ করবে যাতে করে আপনাকে সকলের সামনে ছোট দেখায়। এতে করে সম্পর্ক অবমাননাকারী চান যে আপনি যেন নিজেকে খুব দূর্বল ভাবেন, নিজেকে খুব ছোট মনে করেন এবং আপনি যেন নিজের পক্ষে দাঁড়ানোর মতো মানসিক শক্তি না পান। তিনি ইচ্ছা করেই অন্যের সামনে আপনার সাথে এমন আচরণ করবেন, যেন আপনি বুঝতে পারেন আপনার স্থান খুব উঁচুতে নয় এবং সে যে সকল কথা বলছেন সকলই সত্য!

৩/ আপনার মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করাতে চাইবে

তিনি সবসময় আপনার সাথে এমন আচরণ প্রকাশ করবেন এবং আপনার কাছ থেকে কিছু পাওয়ার জন্যে এমন সকল কথা বলবে, যা আপনার মধ্যে অপরাধবোধ জাগিয়ে তুলবে। তার কাঙ্ক্ষিত কাজটি আপনার কাছ থেকে উশুল করার জন্যে সে এমনভাবে বলে থাকবেন- “আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ভালোবাসো কিন্তু মনে হয় আমি ভুল” অথবা, “তুমি যদি আমাকে ভালোবেসে থাকো তাহলে তুমি অবশ্যই এই কাজটা করবে”! এই সকল কথা বলে মানসিকভাবে আপনাকে দূর্বল করে সে আপনার কাছ থেকে তার আকাঙ্ক্ষিত কাজটি উশুল করে নেবে।

৪/ তার অনুভূতির জন্য আপনাকে দায়ী করবে

সে খুব নিপুণভাবে এবং কৌশলের সাথে তার সকল খারাপ অনুভূতির জন্য আপনাকে দায়ী করবে সবসময়! সে বলবেন, “তোমার জন্যে আমি রেগে যাচ্ছি” অথবা, “তুমি এমন করেছো বলেই আমি রেগে গেছি”! সে সবসময় আপনাকে দায়ী করতে চাইবে যে কোন পরিস্থিতিতে এবং যে কোন কিছুর জন্যে আপনাকেও অপরাধবোধের মধ্যে ফেলে দিতে। আপনাকে এইভাবে মানসিক অশান্তির মাঝে ফেলে দিয়ে সে নিজে আনন্দ উপভোগ করে থাকে। এমন ধরণের আচরণ এবং কথা বলে সঙ্গী সবসময় বোঝাতে চাইবে যে সে নিজে সঠিক এবং সকল ভুল শুধুই আপনার।

৫/ শর্ত প্রদান করবে

 অত্যাচারিত হওয়া মানুষটার উপর নানাবিধ শর্ত আরোপ করে দেয় সঙ্গী, যা সকলই হয়ে থাকে অত্যাচারিতকে মানসিকভাবে পর্যদুস্থ করার জন্য।  এইভাবে সে নিজের কাজ, নিজের ইচ্ছা এবং নিজের আকাঙ্ক্ষিত কিছু পাওয়ার চেষ্টা করে থাকে খুবই বুদ্ধিমত্বার সাথে। সে হয়তো আপনাকে বলবে- “তুমি এইখানে গেলে তোমার সাথে আমি আর কথা বলবো না” অথবা, “তুমি যদি আমার কথা না শোনো তাহলে আমি আত্মহত্যা করে ফেলবো”!  মানসিকভাবে আপনাকে দূর্বল করে দিয়ে এবং এমন ‘মাইন্ড গেইম’ খেলে সে চেষ্টা করবে নিজে জিতে যেতে।

৬/ শারীরিক অত্যাচার করবে

মুখের কথায় যখন সম্পর্ক অবমাননাকারী তার উদ্দেশ্য পূরণে সফল হতে পারবে না, তখন তিনি শারীরিকভাবে আপনাকে অত্যাচার করা শুরু করবে। এই শারীরিক অত্যাচারের শুরুটা হবে কোন একটা ঝগড়া কিংবা তর্কের সময়ে খুব শক্ত করে আপনার হাত ধরা দিয়ে। এরপর সেখান থেকে শারীরিক এই অত্যাচার রূপ নিয়ে ভীতিকর অবস্থায়। যেমন: জোরে করে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া, গলা টিপ দিয়ে ধরা, আপনার দিকে লক্ষ্য করে কোন কিছু ছুঁড়ে মারা। একটা সম্পর্কের মাঝে যখন শারীরিক অত্যাচারের বিষয়গুলো চলে আসে, তখন সেই সম্পর্ক অতিমাত্রায় বিষাক্ত একটা সম্পর্কে পরিণত হয়ে যায়।

৭/ খুব অল্পতেই রেগে যাবে

হয়তো কোন বড় ব্যপার নয় বা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার নয়, কিন্তু সেটা নিয়েও সে খুব রাগারাগি করবে এবং রেগে যাবে। আপনার আবেগ এবং অনুভূতিগুলো নিয়ে খুব নিপুণভাবে খেলা করার এটা খুবই মোক্ষম একটি কৌশল। এমন নয় যে সে অনেক রগচটা বা অল্পতে রেগে যাবার ব্যাপার আছে। সে এই কাজ শুধুমাত্র আপনার সাথে করবে যখন দেখবে আপনি তার কথামতো কাজ করছেন না! আপনাকে সবসময় তার বাধ্যগত রাখার জন্যে এবং আপনার ইচ্ছাকে প্রাধান্য না দেয়ার জন্য সে এই কাজটি করে থাকবেন প্রায় সময়েই। যাতে করে আপনি তার সামনে ছোট হয়ে থাকেন এবং আপনার ইচ্ছা প্রকাশ না করতে পারেন।

৮/ আপনার অনিচ্ছা স্বত্বেও আপনাকে জোর করবে কোন কিছু করতে

এক্ষেত্রে যেকোন কিছুই হতে পারে, যা আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাবে সেটাই সে জোরপূর্বক আপনাকে দিয়ে করাতে চাইবে। সেটা হতে পারে আপনাকে জোর করে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাওয়া, যখন কিনা আপনি একেবারেই বাসা থেকে বের হতে চাচ্ছেন না! আবার হতে পারে আপনাকে বাসাতে থাকতে বাধ্য করা যখন কিনা আপনার পরিবারের সাথে অথবা আপনার বন্ধুদের সাথে বাইরে খেতে যাবার কথা। আপনাকে তার অনুগত করে সে মানসিকভাবে শান্তি খুঁজে পেতে চায়।

৯/ প্রতিনিয়ত আপনার খোঁজ নিতে থাকবে

শুধুমাত্র উপরের লাইনটা পড়ে মনে হতেই পারে যে, ভালোবাসার মানুষ তো খোঁজ নিতেই পারে এখানে খারাপের কী হলো! কিন্তু সম্পর্ক অবমাননাকারী আপনার খোঁজ জানার উদ্দেশ্যে আপনার খোঁজ নিতে চাইবেন না। তিনি আপনাকে সন্দেহ করেন বিধায় আপনার খোঁজ নিতে চাইবেন। আপনি কখন কোথায় যাবেন সকল কিছু তাকে জানিয়ে রাখতে তো হবেই, কেন যাবেন, কতক্ষণ থাকবেন সকল কিছুও জানা থাকা চাই তার। আপনি যেখানেই যান না কেন তাকে সমসময় জানাতে হবে কল দিয়ে বা মেসেজ দিয়ে। অনেক সময় এমনও হতে পারে, সে আপনার সাথে তাৎক্ষণিক ছবি চাইবে আপনি কোথায় আছেন এই মুহুর্তে সেটা জানার জন্যে!

১০/ প্রতিনিয়ত ঝগড়া করতে থাকবে

অত্যাচারী সঙ্গী এই কাজটি করে থাকবে আপনার ধৈর্য পরিক্ষা করার জন্য! খুব তুচ্ছ কারণে অথবা একেবারেই অকারণে সে আপনার ঝগড়া করা শুরু করবে এবং দেখতে চাইবে আপনি কতদূর পর্যন্ত এই ঝগড়া টেনে নিয়ে যেতে পারেন এবং একদম শেষ পর্যায়ে গিয়ে কী করেন! ঝগড়ার কোন দায়দায়িত্ব কখনোই সে নেবে না এবং আপনাকেই তার কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করবে।  

বিষাক্ত একটা সম্পর্কে থেকে আপনি কখনোই মানসিকভাবে শান্তিতে থাকতে পারবেন না। এমন সঙ্গী আপনাকে কখনোই বুঝতে চাইবে না অথবা আপনাকে সমর্থন দেবে না। তাই নিজের ভালো বুঝে নিজেকেই এমন সম্পর্ক থেকে সরিয়ে নিতে হবে। দ্রুত! 

 সূত্র: Psych2Go

সম্পাদনা: রুমানা বৈশাখী