আমরা হয়ত অনেক মহৎ মানুষের গল্প জানি। কিন্তু কিছু কিছু মানুষের বেলায় এই মহত্তের সীমানা এতটা বিস্তৃত হতে পারে যা হয়ত আমরা কল্পনাও করতে পারি না।

আমার চাকরীর বয়স প্রায় নয় বছর। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক সহকর্মীর সাথে আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়েছে। তবে এই বন্ধুদের মধ্যে বার্নাবাসকে আমি সবার উপরে রাখব। ঘটনাটা ২০১৪ সালের। তখন আমি আর আমার ককেশিয়ান সহকর্মী বার্নাবাস একই প্রকল্পে হিউজটনে কাজ করতাম। বার্নাবাসের বয়স তখন ৪০ এর কাছাকাছি ছিল। আমাদের দুজনকেই পস্পরের সাথে অনেক ঘনিষ্টভাবে কাজ করতে হয়েছে। আমাদের একসাথে অনেক ভ্রমণও করতে হতো। এরই সুবাদে আমাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। সকাল ৬ টা থেকে ৯ টা আবার বিকেল ৪ টা থেকে ৭ টা পর্যন্ত সময়টা হিউজটনের রাস্তাঘাটে যানজট লেগেই থাকে। আমরা দুজনেই সকাল ৬ টায় কাজ শুরু করতাম আর ৩ টায় অফিসের কাজ শেষ করে বাসার জন্য রওনা দিয়ে দিতাম।

একদিন অফিসের কাজ শেষ করতে দুজনেরই দেরি হয়ে গেল। যানজট এড়ানোর জন্য অফিসে বসেই বার্নাবাসের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম। টার্গেট ছিল ঠিক ৭ টা বাজলেই আমরা বাসার উদ্দেশ্যে বের হয়ে যাব। কথায় কথায় আমাদের আলোচনার মাঝে পরিবার ও সন্তান লালন পালনের প্রসঙ্গ চলে আসে। আমাদের কথোপকথনটা ছিল অনেকটা এরকম-

প্রিন্সঃ (আমার ডাক নাম) আচ্ছা বার্নাবাস, তোমরা বাচ্চা নিচ্ছ না কেন?

বার্নাবাসঃ (হেসে) এই কথাটা তুমি জেনিকে বল না কেন? (জেনি হল বার্নাবাসের প্রেমিকা। বার্নাবাস আর জেনি খুব সুন্দর একটা বাড়ীতে থাকত)

প্রিন্সঃ ঠিক বুঝলাম না।

বার্নাবাসঃ আমরা দুজনই চাই আমাদের বাসায় একটা ফুটফুটে বাবু আসুক।

প্রিন্সঃ তোমাদের যে বয়স তাতে তো আর দেরি করা ঠিক হবে না।

বার্নাবাসঃ হুম, কিন্তু জেনি চাচ্ছে একটা সন্তান দত্তক নিতে।

প্রিন্সঃ আমি দুঃখিত বার্নাবাস।

বার্নাবাসঃ দুঃখিত হচ্ছো কেন?

প্রিন্সঃ তোমরা অনেক চেষ্টা করেছো, কিন্তু কোন ফল পাওনি... সেই জন্য দুঃখিত বোধ হচ্ছে।

বার্নাবাসঃ না, ব্যাপারটা ঠিক তা না। আমরা আসলে কখনও বায়োলজিকল বাবা মা হবার চেষ্টাই করিনি।

প্রিন্সঃ তুমি কি আমার সাথে মশকরা করছ?

বার্নাবাসঃ না না, আমি মোটেও মশকরা করছি না।

প্রিন্সঃ তোমরা বায়োলজিকল বাবা মা না হয়ে, এক অপরিচিত বাচ্চার দায়িত্ব নিবে এটা অদ্ভুত শোনাচ্ছে।

বার্নাবাস তখন অনেক গম্ভীর হয়ে গেল এবং সব সময় বায়োলজিকেল বাবা মা হয়েই কেন সন্তান লালন পালন করতে হবে সে ব্যাপারে দার্শনিক প্রশ্ন করতে শুরু করল। ঐদিন সে বেশ গভীর কিছু কথা বলেছিল। কিন্তু, একে তো আমি ছিলাম খুব পরিশ্রান্ত, অন্যদিকে পেটেও ছিল ক্ষুধা। তাই খুব বেশি মনোযোগও দিতে পারিনি। তাছাড়া আমার তখন চিন্তা শক্তিও ছিল না তা উপলব্ধি করার মত। শুধু শোনার জন্যই শুনে যাচ্ছিলাম।

যাইহোক, আমরা আমাদের আলাপ শেষ করে, বাড়ির দিকে রওনা হলাম। এখন বার্নাবাস মিশিগানে আর আমি হিউস্টনে কাজ করি। আমাদের মধ্যে এখনও মাঝে মাঝে কথা হয়। কিছু দিন আগে ত্বিষা (আমার বউ) আর আমি মিলে ‘Lion’ চলচ্চিত্রটা দেখছিলাম। চলচ্চিত্রটা একটা সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি। চলচ্চিত্রটিতে দেখানো হয় ভারতে শেরু নামের পাঁচ বছর বয়সের এক বালক হারিয়ে যায়। হারিয়ে যাবার পর ভারতেরই এক শিশু আশ্রয় কেন্দ্রে তার জায়গা হয়। পরে এক অস্ট্রলিয়ান দম্পতি শেরুকে দত্তক হিসেবে অস্ট্রলিয়াতে নিয়ে যায়। শেরু বড় হবার পর তাঁর আসল মা আর বড় ভাইকে ফিরে পেতে ব্যাকুল হয়ে গেল। পঁচিশ বছর অস্ট্রেলিয়ায় কাটাবার পর সে ভারতে ফিরে আসে। ভারতে ফিরে আসার পর সে তার হারিয়ে যাওয়া মাকে ফিরে পায়। ৩০ বছরের শেরু একবার তার অস্ট্রেলিয়ান দত্তক মায়ের সাথে আলোচনা করার সময় বলে বসে, বায়োলজিকাল মা হওয়ার সক্ষমতা ছিল না বলেই তারা তাকে দত্তক নিয়েছিল। কিছুটা রাগান্বিত আর কিছুটা অবাক হয়ে সেই অস্ট্রেলিয়ান মা শেরুকে জানিয়ে দিলো যে, তার এবং তার স্বামীর দুইজনেরই বায়োলজিকালি বাবা মা হবার ক্ষমতা ছিল। বায়োলজিকাল বাবা মা হওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা দুইজনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত সন্তানদের দত্তক নিয়ে তাদের মুখে হাসি ফুটানোর চেষ্টা করার। শুধু শেরুকে নয় ঐ অস্ট্রেলিয়ান দম্পতি আরও এক মানোরোগী ছেলেকেও দত্তক নিয়েছিল।

চলচ্চিত্রটা দেখার এক পর্যায় আমার দু’চোখ ভরে কান্না চলে আসল। বার্নাবাস আর তাঁর স্ত্রী জেনি যে ঐ পর্যায়ের মহৎ মানুষ ছিল সেটা বুঝতে আমার এত সময় লেগে যাবার কারণে; আবার সেটাও বুঝলাম এই ‘লায়ন’ চলচ্চিত্রটা দেখে! বুঝে নিলাম যে আমাকে আমার কল্পনার সীমানাটাকে বড় করার জন্য আরোও অনেক কাজ করে যেতে হবে। 

[প্রবাসী যে কেউ তাদের যেকোন প্রবাস অভিজ্ঞতা লিখতে পারেন প্রিয়তে। আপনাদের লেখা আমরা গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করব। আপনার যেকোন লেখা আমাদের সাইটে পোস্ট করতে ক্লিক করুন এই লিংকে ]